অণুজীব ও মানবসভ্যতা :চলছে অস্তিত্বের সংকট

প্রকাশিত:বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলা ২০২০ ০৯:০৭

অণুজীব ও মানবসভ্যতা :চলছে অস্তিত্বের সংকট

ড. মো. মজিবুর রহমান
একবিংশ শতাব্দীতে মানবসভ্যতা যখন জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম শিখরে তখনই হঠাত্ করে সারা বিশ্বে আঘাত হানে এক অতিশয় ক্ষুদ্র অণুজীব যা সার্স করোনা ভাইরাস-২ নামে পরিচিত। এই ধরনের প্রাণঘাতী মহামারি এবারই প্রথম নয়। অতীতেও ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসজনিত মহামারিতে অনেক সভ্যতায় বিপুল প্রাণহানি হয়েছে। অবশ্য এখানে উল্লেখ্য যে, ভাইরাসই বেশির ভাগ ধ্বংসাত্মক মহামারির জন্য দায়ী।
মানুষের সঙ্গে অণুজীবের সম্পর্ক স্মরণাতীতকাল থেকে। এই সম্পর্ক অনেকটা পরস্পর নির্ভরশীলতার। গুটিকয়েক ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস আমাদের মারাত্মক শত্রু আর বাকিরা কিন্তু খুবই উপকারী বন্ধু যারা বিভিন্নভাবে আমাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। এই ভাইরাস না থাকলে আমরা এক বা দেড় দিনের বেশি বেঁচে থাকতে পারব না—এমনটাই ধারণা দেন উইসকনসিন-মেডিসন (Wisconsin-Madison) বিশ্ববিদ্যালয়ের রোগতত্ত্ব বিশারদ ড. টনি গোল্ডবার্গ।
বিজ্ঞানীদের ধারণা—পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪ বিলিয়ন বছর আর পৃথিবীতে অণুজীবের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন বছর আগে। সায়ানোব্যাকটেরিয়া বা নীলাভ সবুজ শৈবাল (যাকে পৃথিবীর প্রাথমিক জীবরূপে ধরা হয়) নামের এক অণুজীব পৃথিবীতে প্রথম অক্সিজেন তৈরি করে। তারপর ধীরে ধীরে অন্যান্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবির্ভাব ঘটে এমনটাই ধারণা বিজ্ঞানীদের। কার্বন চক্র, নাইট্রোজেন চক্র, ফসফরাস ও সালফার চক্রসহ এমন অনেক জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ার কথা আমরা জানি যাদের চালিকা শক্তি হচ্ছে অণুজীবরা। এই চক্রগুলো থেমে গেলে শুধু মানুষ কেন কোনো প্রাণীই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারবে না। কৃষি, খাদ্য, ওষুধ ও বিভিন্ন রাসায়নিক শিল্পে অণুজীবের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। আমরা দৈনিক যে পরিমাণ বর্জ্য পরিত্যাগ বা উত্পাদন করি অণুজীবরা যদি সেই বর্জ্যগুলো নিজেদের খাদ্যের জন্য বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত না করত তাহলে সারা পৃথিবী বর্জ্যের স্তূপে ভরে যেত আর দুর্গন্ধ ও দূষণে মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে যেত। বিজ্ঞানীরা বলেন, শতকরা ৯৯ ভাগ অণুজীব কোনো না কোনোভাবে মানুষের উপকার করে থাকে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন অণুজীব থাকে। মানুষের অন্ত্রের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অণুজীবে ভর্তি এবং এরা বিভিন্নভাবে আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা বাড়িয়ে চলে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো—মাত্র এক শতাংশ বা তারও চেয়ে কম অণুজীব আছে যারা মানুষের জন্য ক্ষতিকর বা বিভিন্ন ধরনের অসুখ-বিসুখের জন্য দায়ী। অনেক অণুজীব আছে যারা আমাদের শরীরে বসবাস করছে এবং আমাদের জন্য অনেক উপকারী ভিটামিন বা অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য তৈরি করছে। আমরা যখন বিভিন্ন ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটাই তখনই তারা মাঝেমধ্যে বেশ ক্ষেপে ওঠে এবং অনেক সময় বিভিন্ন রোগ প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে। আমরা প্রায়শই অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্সের কথা বা সুপার বাগেসর (Super bugs) কথা শুনি। এর মানে হচ্ছে এই অণুজীবগুলোর বিরুদ্ধে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই কাজ করে না। ১৯২৮ সালে আলেকজাণ্ডার ফ্লেমিং এই অণুজীব থেকেই কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেন। এজপারজিলাস (Aspergillus) নামক ছত্রাক থেকে তিনি পেনিসিলিন আবিষ্কার করেন। ফ্লেমিংয়ের আবিষ্কারের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। পরবর্তীকালে স্ট্রেপটোমাইসিস (Streptomyces) জাতীয় অণুজীব থেকে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করা হয়েছে। মানুষ ও পশু-পাখির চিকিত্সায় এসব অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাপক হারে ব্যবহার হচ্ছে। বস্তুত আমাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে অণুজীবরা; বিশেষ করে ভাইরাসরা। বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাইঅক্সাইড কমানোর ক্ষেত্রে ভাইরাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সমুদ্রের ইকোসিস্টেম রক্ষার মধ্যমে। এরা সমুদ্রের প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যাকটেরিয়া মেরে অক্সিজেন উত্পাদনকারী প্ল্যাংকটন্সকে (Planktons) বেঁচে থাকতে সাহায্য করছে এবং খাদ্য শৃঙ্খলে রাখছে বিশেষ ভূমিকা। অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়া যখন বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে বিজ্ঞানীরা তখন ব্যাকটেরিয়া মারার জন্য ভাইরাসকে ব্যবহার করার কথা চিন্তা করছেন। একে ফাজ (Phage) থেরাপি বলা হয়।
বিশ্বে এ পর্যন্ত অনেকগুলো মহামারি দেখা দিয়েছে যাতে কোটি কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। প্লেগ বা ব্ল্যাক ডেথ বারবার পৃথিবীতে হানা দিয়েছে। ৬ষ্ঠ শতাব্দী থেকে শুরু করে ত্রয়োদশ, ষোড়ষ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে প্লেগ কেড়ে নিয়েছে ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন মানুষের প্রাণ। ইউরোপের প্রায় অর্ধেক মানুষ এসব মহামারিতে মারা যায় বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। বিংশ শতাব্দীতে গুটিবসন্তে (Smallpox) মারা যায় প্রায় ২০০-৩০০ মিলিয়ন মানুষ। এরপর ১৯১৮-১৯১৯ সালের স্প্যানিস ফ্লুতে ( Spanish flu) মারা যায় প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষ। ১৯৮১ সালে আঘাত হানে হিউম্যান ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস (HIV) যা এইডস (AIDS) রোগের কারণ। এই রোগে অদ্যাবধি মারা গেছে প্রায় ৩২ মিলিয়ন মানুষ। এরপর সোয়াইন ফ্লু (Swine flu), সার্স (SARS), মার্স (MERS), ইবোলা (Ebola) ও সম্প্রতি কোভিড-১৯ লাখ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো—ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসগুলো কখনো কখনো কেন অতিমাত্রায় আক্রমণাত্মক হয়ে মানুষের প্রাণ সংহারে মেতে ওঠে? মানবসভ্যতা আজ উন্নতির চরম শিখরে। নিউক্লিয়ার বোমা থেকে আধুনিক মারণাস্ত্র কোনো কিছুরই কমতি নেই বিশ্বের পরাশক্তিধর দেশগুলোর। জ্ঞানবিজ্ঞান ও চিকিত্সাশাস্ত্রে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। শিল্পায়ন ও নগরায়ণের নামে আধুনিক মানুষ একের পর এক ধ্বংস করেছে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ। প্রত্যেকটি উদ্ভিদ কিংবা প্রাণী সে যতই ছোট হোক না কেন আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। অণুজীবরাও কিন্তু এর বাইরে নয়। যে অণুজীব আগে ছিল বন্যপ্রাণী ও পশু-পাখির মধ্যে—বন উজাড় করে ফেলার কারণে সেই জীবজন্তু এখন মানুষের সংস্পর্শে এসে যাচ্ছে। মানুষ এখন অনেক বন্যপ্রাণী তাদের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করছে। এখানে উল্লেখ্য যে, বেশির ভাগ মহামারি বন্যপ্রাণী থেকে সংক্রমিত হয়েছে। যেমন : ইঁদুর, বাদুর, শূকর ও শিম্পানিজ ইত্যাদি। তাদের আবাসস্থল একের পর এক ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। শুধু বিবর্তনের কৌশল অনুযায়ী টিকে থাকার জন্য এই অণুজীবরা নতুন নতুন আবাসস্থল অথবা হোস্ট খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাইতো প্রাণী থেকে মানুষে এসে শুধু বাঁচার তাগিদে ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। সেই সঙ্গে রয়েছে বায়ুদূষণ, গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও ক্লাইমেট চেঞ্জসহ অন্যান্য কারণ। মানুষ অবশ্যই খুব স্মার্ট কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলেন, অণুজীবরা আরো বেশি স্মার্ট। আমরা তাদের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক ও ভ্যাকসিন যে ধরনের মারণাস্ত্রই ব্যবহার করি না কেন কিছুদিনের মধ্যেই তারা এগুলোর বিরুদ্ধে তাদের জিনগত কাঠামোতে পরিবর্তন এনে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং মনুষ্য উদ্ভাবিত সব কলাকৌশলকে অকার্যকর করে ফেলে।
এমতাবস্থায় সময় এসেছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার। তা না হলে আধুনিক মানবসভ্যতা আরো বিপর্যয়ের মুখে পড়বে এবং ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হবে। অতি সংক্রমণশীল এই অণুজীবগুলো কী ধরনের আচরণ করবে এবং কতটা মানব বিধ্বংসী হতে পারে তা জানার জন্য অণুজীব বিজ্ঞানবিষয়ক শিক্ষা ও গবেষণা আরো সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন।
n লেখক : অধ্যাপক, অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই সংবাদটি 1,228 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •