অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষায় নানা চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত:সোমবার, ১৯ অক্টো ২০২০ ০১:১০

অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষায় নানা চ্যালেঞ্জ

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ভর্তি পরীক্ষা অনলাইনে নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন উপাচার্যরা। তাদের মতে, যেহেতু এবার এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি—সে কারণে শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা নিতে হবে। কোনোভাবেই পরীক্ষা ছাড়া শিক্ষার্থী ভর্তিতে ইচ্ছুক নন উপাচার্যরা। আর পরীক্ষা না নেওয়ার বিকল্প হলো—এইচএসসি ও এসএসসির ফলের ভিত্তিতে ভর্তি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিগত বছরগুলোর মতো এবারও এই দুই পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই ভর্তি করবে। কিন্তু অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা এই পদ্ধতিতে যেতে চাইছেন না।

 

তবে অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা হলে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে কর্তৃপক্ষকে। যদি এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাহলে মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে গ্রামের ও দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা। আর প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে নকল করে অনেকে পূর্ণ মার্ক পেয়ে যেতে পারেন। এ কারণেই অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা কিছুটায় শঙ্কায় রয়েছেন। জানা গেছে, যে অ্যাপসের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়া হবে সেটি তৈরি করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূর। যার নাম ‘প্রক্টরড রিমোট এক্সামিনেশন’। তিনি বলেন, এ সফটওয়্যারটি মোবাইল বেইজড একটি অ্যাপস, এটি এখন অনলাইনে কাজ করে। তবে অফলাইনেও যাতে কাজ করে সে জন্য সফটওয়্যার ডেভেলপ করা হচ্ছে। এই সফটওয়্যারে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রথম ও শেষ ১০ মিনিট ইন্টারনেট সংযোগের মধ্যে থাকতে হবে। অ্যাপসটি ওপেন করার পর শিক্ষার্থীর মোবাইলের ক্যামরার কন্ট্রোল এবং সঙ্গে সাউন্ডেরও কন্ট্রোল এডমিন নিয়ে নেবে। মোবাইলের স্ক্রিন কন্ট্রোলও থাকবে এডমিনের হাতে।

উপাচার্য বলেন, শিক্ষার্থীরা অনলাইনে থেকে যখন অ্যাপসটি অন করবে তখন আমরা তাদের লাইভ মনিটরিং করতে পারব। অফলাইনে থাকলে ছবি এবং সাউন্ড রেকর্ড করা থাকবে। এটা পরবর্তী সময়ে আমাদের সার্ভারে চলে আসবে। তখন আমরা বুঝতে পারব তিনি নকল করেছে কি না। এই অ্যাপসের মাধ্যমে এমসিকিউ ও লিখিত দুই ভাবেই পরীক্ষা নেওয়া যাবে বলে জানান অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূর।

তিনি আরো বলেন, স্ক্রিন শট নিয়ে মেসেঞ্জার, হোয়াটস আপ বা ভাইভার বা অন্য কোনো অ্যাপে পরীক্ষার্থী প্রশ্নগুলো পাঠিয়ে দিলে সেটা ধরা যাবে। কোনোভাবে ঐ সফটওয়্যার মিনিমাইজ করার চেষ্টা করলে তাকে ওয়ার্নিং দেওয়া হবে। বন্ধ করে দিলে পরীক্ষা শেষ হবে। আর সে পরীক্ষায় প্রবেশ করতে পারবে না। অন্য ডিভাইসেও করতে পারবে না। যেহেতু তাকে প্রতিটি মুহূর্তে মনিটরিং করা হচ্ছে। এ কারণে সব কিছু সার্ভারে রেকর্ড হয়ে থাকবে।

তবে এই পদ্ধতির নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে এমনটি মনে করছেন আইটি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত মেধাবী খুঁজতে গিয়ে যাতে উলটো ফল না হয়, সেদিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অভিভাবকরা। তারা বলছেন, ইন্টারনেট যোগাযোগ এখনো গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি বিশাল সমস্যা। একযোগে অনেক পরীক্ষার্থী এবং অবাধ ইন্টারনেট সংযোগ একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হতে পারে। প্রথমে ১০ মিনিটও যদি কোনো কারণে ইন্টারনেট সংযোগের মধ্যে পরীক্ষার্থী না থাকতে পারে তাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আজিজুল ইসলাম নামে এক অভিভাবক বলেন, এইচএসসিতে উত্তীর্ণ ১৩ লাখ ৬৫ হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে কত ভাগের স্মার্ট ডিভাইস আছে—এ নিয়ে কোনো জরিপ নেই। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের এক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর ১৪ শতাংশের কোনো স্মার্ট ফোন নেই। এ থেকেও অনেকটা ধারণা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, উন্নত দেশে অনলাইনের মাধ্যমে পরীক্ষা হয়। কিন্তু উন্নত দেশে বিদ্যুতের সমস্যা নেই, প্রায় সবার পিসি বা ল্যাপটপ আছে, আর সেখানে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট খুবই সহজলভ্য। তবে বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। এখানে প্রযুক্তি ব্যবহারের জ্ঞানও কম। বিশেষত এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের এ ধরনের জ্ঞান আরো সীমিত।

এছাড়া এই পরীক্ষায় অন্যতম প্রধান সমস্যা নকল করার সুযোগ। মোবাইল ক্যামেরার সীমানার বাইরে কাছে থেকে মোবাইল স্ক্রিন দেখে প্রশ্নের উত্তর বলে দেওয়া সম্ভব। উত্তরগুলো লিখে মোবাইলের পাশ ঘেঁষে রেখে দিলেও এডমিন কোনোভাবেই এই নকল ধরতে পারবে না। এভাবে কয়েক জন মেধাবীকে পাশে বসিয়ে রেখে পরীক্ষার শতভাগ উত্তর দেওয়া সম্ভব। এতে প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হবে।

সাইমুল হাসান নামের এক অভিভাবক জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সরাসরি নেওয়া যায় কি না, সেটা নিয়ে ভাবা যেতে পারে। প্রয়োজনে সারাদেশকে ব্যবহার করা হোক। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস নয়, দেশের সবগুলো স্কুল বা কলেজ কেন্দ্র ব্যবহার করা যেতে পারে।

অন্যরকম সফটওয়্যারের প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদুল হাসান সোহাগ বলেন, ‘অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়া ভালো পদ্ধতি। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা কতটা কার্যকর হবে এটা বলা যাচ্ছে না। এ বিষয়টি বাস্তবায়ন করার আগে একাধিক পাইলটিং করতে হবে।’

আদিবুর রহমান নামে এক ভর্তিচ্ছুর মতে, বিষয়টি নিয়ে আমরা খুবই শঙ্কিত। তবে আগে থেকেই এই সফটওয়্যার সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা না দিলে পরীক্ষার দিন নার্ভাস লাগবে। ভালো প্রস্তুতি থাকলেও খারাপ করার আশঙ্কা থাকবে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুন অর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা গুচ্ছ করে এই ভর্তি পরীক্ষা হবে। তবে সবকিছুই চূড়ান্ত হবে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে। আর ভর্তি পরীক্ষাটি হবে এমসিকিউ প্রশ্নের ভিত্তিতে। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কোনো পরীক্ষা নেবে না। এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই কলেজগুলোতে ভর্তি করা হবে বলে তিনি জানান। প্রসঙ্গত, এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল ১৩ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি।

এই সংবাদটি 1,230 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ