অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনের নতুন ঠিকানা

প্রকাশিত:বৃহস্পতিবার, ০৫ নভে ২০২০ ১২:১১

অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনের নতুন ঠিকানা

বাংলাদেশের দু’পাশে দুই পরাক্রমশালী প্রতিবেশী ভারত ও চীন। অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা উভয় ক্ষেত্রেই তারা আঞ্চলিক মহাশক্তি। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুসারে বাংলাদেশের জাতীয় গড় আয় ১ হাজার ৯৭০ মার্কিন ডলার, পাকিস্তানের ১ হাজার ১৩০ মার্কিন ডলার, মিয়ানমারের ১ হাজার ৫৮০ মার্কিন ডলার, ভারতের ২ হাজার ১০০ মার্কিন ডলার এবং চীনের ৮ হাজার ১৩০ মার্কিন ডলার। তিন দশক আগে ভারতের গড় আয় ছিল ৩৫০ মার্কিন ডলার আর বাংলাদেশের ছিল ৩০৬ মার্কিন ডলার। ২০০৫ সালে চীনের জাতীয় গড় আয় ছিল ২ হাজার মার্কিন ডলার। ২০০৫ সালে ভারতের ছিল ৭১৫ মার্কিন ডলার এবং বাংলাদেশের ছিল ৫০০ মার্কিন ডলার।

অর্থাৎ চীন ২০০৫ সালে অর্থনৈতিকভাবে যে জায়গায় ছিল, ভারত ২০১৯ সালে এবং বাংলাদেশ ২০২০ সালে সেই জায়গায় আসতে পেরেছে। কিন্তু ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চীনের অর্থনৈতিক উন্নতি অভাবনীয়। এ ১০ বছরে চীনের গড় আর্থিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল বার্ষিক ১০ শতাংশ। ফলস্বরূপ চীনে ২০১৫ সালেই জাতীয় গড় আয় দাঁড়িয়ে যায় ৮ হাজার মার্কিন ডলারের ঘরে। অর্থাৎ ১০ বছরে চীন জাতীয় গড় আয় চারগুণ করতে সমর্থ হয়। ভারত কিংবা বাংলাদেশ কেউই ততখানি লাফিয়ে উঠতে পারেনি। ২০১৫ সালে ভারতের গড় আয় ছিল ১ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলার আর বাংলাদেশের ১ হাজার ২৫০ মার্কিন ডলার।

 

চীনের এ অগ্রগতির কয়েকটি প্রধান কারণের একটি হল- এ ১০ বছরে দেশটির সার্বিক পরিকাঠামোর অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। যার অন্তর্গত ছিল রাস্তাঘাট, রেল যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ। আরেকটি প্রধান কারণ ছিল অনাবাসী চীনা ব্যবসায়ীরা। এ সময় অনাবাসী চীনা ব্যবসায়ীদের ব্যাপক বিনিয়োগ ঘটেছিল চীনে। আকর্ষণ ছিল সুলভ শ্রমিক এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। ফলে তাদের বাধাহীন উৎপাদন চীনকে বিশ্ববাজারে অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তাদের দেশের শ্রমিকরা কিছুটা শ্রমের অপব্যবহার আর শোষণের শিকার হয়েছে ঠিকই; কিন্তু এর ফলে চীনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক লাভ হয়েছে অনেক বেশি। এ লাভের সুফল শ্রমিক, তাদের পরিবার এবং পরবর্তী প্রজন্ম সবার হাতেই পৌঁছেছে। চীনে কমিউনিস্ট সরকার থাকলেও বেসরকারি পুঁজি ও বাজারব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে পিছপা হয়নি কখনও। তাই তারা তরতর করে উপরের দিকে ওঠে গেছে। চীন, বাংলাদেশ বা ভারতের জাতীয় গড় আয় কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, ফ্রান্স কিংবা অন্য কোনো উন্নত দেশের জাতীয় গড় আয়ের সঙ্গে তুলনীয় নয়। কিন্তু জনসংখ্যার বিচারে এ তিনটি দেশের জাতীয় গড় আয় তুলনামূলক কম হলেও বিশাল এক অর্থনীতির সোপানে পৌঁছে যেতে পেরেছে। এর মধ্যে অবশ্য চীন সবচেয়ে এগিয়ে আছে।

বাংলাদেশ ও ভারত আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণে উপস্থিত হয়েছে; চীন থেকে ঠিক ১০ বছর পেছনে হাঁটলেও আজই তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। চীন ২০০৫ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত যা করেছে, যেভাবে করেছে- আজ তা-ই করতে পারে বাংলাদেশ ও ভারত। তবে বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুটো বিষয়- বিশ্ববাজারের হঠাৎ মন্দাবস্থা এবং কোভিড-১৯ পরিস্থিতি। এর ফলে এ দুটি দেশেই বর্তমানে চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। কেননা মানুষের হাতে নগদ অর্থ নেই। কারও কারও কাছে তা থাকলেও খরচ করার তাগিদ নেই। জরুরি বিষয় হল, অর্থের জোগান দিতে হবে এ সময়েই। সরকারকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ করে দিতে হবে; ক্রয়ক্ষমতা যেন বৃদ্ধি পায় সে ব্যাপারে জাতীয়ভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

অধুনা করোনার বাড়বাড়ন্ত, গালওয়ান অঞ্চলে ভারতীয় জওয়ানদের হত্যা, লাদাখে সৈন্য সমাবেশ ইত্যাদি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের মনে হয়েছে, চীন ভারতবাসীর শত্রু দেশ। বাংলাদেশের অবশ্য তেমন সমস্যা নেই। বাংলাদেশ চীন ও ভারত উভয়ের সঙ্গেই চমৎকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। পুরনো দিনের ভারতবর্ষের (যার মধ্যে বাংলাদেশও ছিল একটি অংশ) সঙ্গে কিন্তু চীনের ঐতিহাসিকভাবে ভালো সম্পর্ক ছিল।

প্রাচীন সময়ে ভারতীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা চীন দেশে বুদ্ধের বাণীসংবলিত পাণ্ডুলিপি নিয়ে পৌঁছেছিলেন। সেখান থেকেই দুই দেশের সঙ্গে প্রীতির একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সময়ে চীনে প্রচলিত কনফুসীয় ও তা-ও মতবাদে অভ্যস্ত চীনবাসীর কাছে ভারত থেকে আগত ভিক্ষুদের গ্রহণ করা সহজ কাজ ছিল না। অন্যদিকে ছিল ভাষাগত সমস্যা। বৌদ্ধ ধর্মের পাণ্ডুলিপি ছিল সংস্কৃত ভাষায় লেখা। কিন্তু হান সাম্রাজ্যের সম্রাট মিংতির উৎসাহে অবস্থার প্রভূত উন্নতি ঘটে।

রাজানুগ্রহের ফলে খ্রিস্টীয় প্রথম শতক থেকেই চীন দেশে বৌদ্ধ ধর্মের সূচনা হয়। ধীরে ধীরে বৌদ্ধ শাস্ত্রগ্রন্থগুলো চীনা ভাষায় অনূদিত হতে শুরু করে। পঞ্চম খ্রিস্টাব্দের সূচনাকাল থেকে নানা চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে চীনে বৌদ্ধ ধর্মের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। সেখানে গড়ে ওঠে নানা বৌদ্ধ সম্প্রদায়। স্বাভাবিক নিয়মেই বৌদ্ধ ধর্ম সেখানে আগ্রহের সৃষ্টি করে। বৌদ্ধ দর্শনকে আরও গভীরভাবে জানার আগ্রহের ফলে একদিকে ভারত থেকে পণ্ডিতদের আহ্বান করা হয়, অন্যদিকে চীন থেকেও ভারতে আসতে থাকে ছাত্রের দল। পরবর্তীকালে কমিউনিজম চীনের জাতীয় বিশ্বাস হিসেবে গৃহীত হলে সেখানে বৌদ্ধ ধর্ম পালনও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। ১৯৬৬ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় মাওয়ের লাল ফৌজ বৌদ্ধ মন্দির ও সংঘগুলোর অপূরণীয় ক্ষতি করে।

কিন্তু ১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যুর পর সরকারের ধর্ম-দমননীতি শিথিল হলে বৌদ্ধ ধর্ম ও বৌদ্ধ দর্শনচর্চার নতুন করে সূচনা ঘটে। আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ দর্শনচর্চার ক্ষেত্রে চীনে নতুন এক প্রয়াস পরিলক্ষিত হচ্ছে। গৌতম বুদ্ধের দেশ ভারতবর্ষ এবং সেই দেশের মানুষের প্রতি চীনা জনসাধারণের একটা শ্রদ্ধা, একটা সম্ভ্রম কাজ করে। ভারতকে আরও জানার আগ্রহ চীনের অনেক মানুষের মধ্যেই দেখা যায়। দু’দেশের রাজনীতি দু’দেশের মধ্যে যুদ্ধের আবহাওয়া তৈরি করে রাখলেও দু’দেশের মানুষ একটি বন্ধনসূত্রে আবদ্ধ। সেই বন্ধনসূত্র হল বুদ্ধ প্রদর্শিত পথ।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটেনি কখনও। সম্পর্ক ভালো রাখার পাশাপাশি তাদের অর্থনৈতিক পথ চলার উদাহরণ যদি বাংলাদেশ গ্রহণ করতে পারে, তবে বাংলাদেশের সামনের দিনগুলোও সম্ভাবনাময় হতে বাধ্য। ভারতের ব্যাপারেও একই কথা বলা যায়। বাংলাদেশ ও ভারত এ দুটি প্রতিবেশী দেশই তাদের আরেক প্রতিবেশী দেশ চীনকে অনুসরণ করতে পারলে একদিন তারাও চীনের মতো করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তবে পার্থক্য এখানে যে, চীন যা শুরু করেছিল ২০০৫ সালে, বাংলাদেশ বা ভারতকে তা শুরু করতে হবে ২০২১ সালে। সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখতে হবে ভারত ও বাংলাদেশকে। এটি সম্ভব হবে তখনই, যখন এ দুটি দেশ দীর্ঘমেয়াদি জোগানভিত্তিক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

মাঝারি ধরনের ব্যবসা ও ছোট ব্যবসার জন্য একগুচ্ছ ব্যবস্থা হাতে নিতে হবে; সহজে তাদের ঋণের ব্যবস্থা করে দিতে হবে এবং ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়ানোর সব সুযোগ বিদ্যমান রাখতে হবে। কৃষকের জন্য সহজ ঋণ এবং তার সঙ্গে পরিকাঠামো উন্নত করে দিতে সরকারকে অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, বিশেষ করে উৎপাদনশীল শিল্পে। পরিকাঠামোতে বরাদ্দ একদিকে যেমন কর্মসংস্থান ও চাহিদা বাড়ায়, অন্যদিকে বাজারের কার্যক্ষমতাও বাড়ায় এবং জোগানের সমস্যা মেটায়। চাহিদা ও জোগানের মধ্যে একটি যোগসূত্র আছে। চাহিদা বাড়লে জোগান বাড়ে, জোগান বাড়লে জাতীয় আয় বাড়ে।

জাতীয় গড় আয় বৃদ্ধি পেলে এর সঙ্গে বেশকিছু সামাজিক সমস্যাও হ্রাস পায়। আর এতে অসাম্য কিছুটা হলেও দূরীভূত হওয়ার রাস্তা খুঁজে পায়; যা হয়েছে চীনে। ২ হাজার মার্কিন ডলার গড় আয়ের অর্থনীতির অসাম্যের চেয়ে ৮ হাজার মার্কিন ডলার গড় আয়ের অর্থনীতির অসাম্য খারাপ হওয়ার সুযোগ কম। তবে এ কথা মানতেই হবে, চীনের মতো দেশের পক্ষে যে কোনো প্রকল্পের বাস্তবায়ন যতটা সহজ, বাংলাদেশ ও ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে তা ততটা সহজ নয়। তাই চীন স্বল্প সময়ে যে চমক দেখাতে পেরেছে, বাংলাদেশ বা ভারত হয়তো ততটা পারবে না।

গণতান্ত্রিক দেশে প্রতি পাঁচ বছর পরপর জনগণের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। এটি অবশ্যই গণতন্ত্রের একটি সৌন্দর্য। কিন্তু এটি আবার তার দুর্বলতাও বটে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, চীনের গতি হয়তো বাংলাদেশ ও ভারত ধরে রাখতে না-ও পারে। তবে চেষ্টা করার মতো শুভ মুহূর্ত এখন ভারত ও বাংলাদেশ উভয় প্রতিবেশী দেশেই বিদ্যমান।

চীনের মতো ৮ হাজার মার্কিন ডলার না হলেও ভারত ও বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখতে পারে আগামী ১০ বছরে অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় গড় আয় অন্তত ৬ হাজার মার্কিন ডলারে উন্নীত করার। তাহলেই তিন প্রতিবেশী দেশে স্বস্তিদায়ক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করবে। যুদ্ধ নয়, বিদ্বেষ নয়- সুস্থ অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা চলতে পারে চীনের সঙ্গে। আর তাতেই সহাবস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে এ তিনটি দেশের জন্য। এর ফলে অঞ্চল ছাপিয়ে সমগ্র বিশ্বে এ তিন প্রতিবেশী দেশ হয়ে উঠতে পারে অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনের নতুন ঠিকানা।

 

 

এই সংবাদটি 1,227 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ