আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীমাসুদ আজহার প্রশ্নে চীনের অবস্থান বদল কেন?

প্রকাশিত: ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ, মে ৯, ২০১৯

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীমাসুদ আজহার প্রশ্নে চীনের অবস্থান বদল কেন?
অবশেষে পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মুহম্মদের শীর্ষ নেতা মাসুদ আজহারকে ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী’ হিসেবে ঘোষণা করল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। ভারত প্রায় এক দশক ধরে মাসুদ আজহারকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ঘোষণার জন্য দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু চীনের আপত্তিতে তা হতে পারেনি। এর আগে মাসুদ আজহারকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ঘোষণার জন্য চারবার উদ্যোগ নেওয়া হয় নিরাপত্তা পরিষদে। তবে প্রতিবারই চীনের আপত্তিতে তা ভেস্তে যায়। এবার চীন সেই আপত্তি সরিয়ে নেওয়ার পর ১ মে নিরাপত্তা পরিষদ মাসুদ আজহারকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ঘোষণা করে। এখন কেন চীন এই আপত্তি তুলে নিল, তার পেছনের কারণ কিছুটা হলেও অনুমান করা যায়।
প্রথমত, এটা বোঝা উচিত যে মাসুদ আজহারের ব্যাপারে চীনের এই সিদ্ধান্তের কারণে দেশটির নিজস্ব মৌলিক জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করতে হয়নি বা জাতীয় স্বার্থে কোনো ধরনের আঘাত আসেনি। চীন মূলত পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষা করছিল ও প্রচারণা চালাচ্ছিল এবং এ কারণে চীন তার সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলতে পেরেছে। এ ছাড়া মাসুদ আজহারের পক্ষ নেওয়ায় চীনের সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি হচ্ছিল। এতে চীনের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছিল। এখন আমাদের সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে হবে যে মাসুদ আজহারকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে আপত্তি অব্যাহত রাখার জন্য চীনকে কেন খরচের মুখে পড়তে হচ্ছিল?
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১২৬৭ কমিটির প্রস্তাবে আজহারকে সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। যেহেতু ভারত বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নয়, তাই ভারত এখানে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। তবে যে তিনটি দেশ এটি করেছে, তারা সবাই ভারতের বন্ধু এবং অংশীদার। মাসুদ আজহারকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করার ব্যাপারে চীনের আপত্তির কারণে এই তিন দেশ ক্ষুব্ধ হয়ে চীনের ওপর চাপ তৈরি করে, যা সামাল দেওয়ার জন্য চীনকে ব্যাপক খরচের মুখে পড়তে হয়। বারবার চীন আপত্তি করায় যুক্তরাষ্ট্র এই হুমকিও দিয়েছিল যে নিরাপত্তা পরিষদে আরেকটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে, যেখানে মাসুদ আজহারের বিষয়ে উন্মুক্ত ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হবে এবং চীন কেন মাসুদ আজহারকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে চায় না, তার কারণ ব্যাখ্যা করতে বেইজিংকে বাধ্য করা হবে। এমন কিছু হলে তা চীনের জন্য খুবই লজ্জাজনক হতো, কারণ দেশটির সরকারি অবস্থান সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে।
নিরাপত্তা পরিষদের অন্যান্য সদস্যরাষ্ট্রও মাসুদ আজহারকে কালো তালিকাভুক্তির পক্ষে ছিল। নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্যদেশের মধ্যে চীনই ছিল একমাত্র দেশ, যে কিনা আজহারকে কালো তালিকাভুক্ত করার বিপক্ষে ছিল। বাকি চৌদ্দটি দেশ তাকে কালো তালিকাভুক্ত করার পক্ষে ছিল। ভারত তাদেরকে বোঝাতে পেরেছিল, কেন মাসুদ আজহারকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। এদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ভারতকে ব্যাপকভাবে সমর্থন করে। সবার বিরুদ্ধে যাওয়ার দাম চীনকে দিতে হয়েছে।
একসময় দেখা গেল, চীন একাকী হয়ে পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তার অবস্থানটা ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্কটা ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছিল। শুধু ভারত নয়, আফগানিস্তান ও ইরানও পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে তাদের ভূখণ্ডে হামলা চালানোর অভিযোগ করেছে। তাই পাকিস্তান ক্রমেই তার একমাত্র মিত্র চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছিল। এটা চীনকে মাসুদ আজহারের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে সহায়তা করেছে। যাহোক, আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে চীনের এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের জন্য প্রচণ্ড আঘাত ও বড় ধরনের হতাশা হয়ে দেখা দেবে।
মাসুদ আজহারকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণার জন্য ভারত প্রায় ১০ বছর ধরে চেষ্টা চালিয়েছে। এখন এটা সত্য যে আমাদের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। এটাকে ভারতে কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ভারতের এটা ভাবা ঠিক হবে না যে মাসুদ আজহারকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ঘোষণার মধ্য দিয়ে আমাদের সীমান্তে সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাবে। ভারত কেবল একটি যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। সীমান্তে সন্ত্রাস বন্ধের জন্য ভারত যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে জয়ী হওয়ার জন্য আমাদের সব ভারতীয়কে অবদান রাখতে হবে।
ডেক্কান হেরাল্ড থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
গৌতম বাম্বাওয়ালে: চীনে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •