ইসলামের আলোকে রোগীর সেবা

আব্দুল হান্নান তুরুকখলী :: সৃষ্টজীব মাত্রই রোগে আক্রান্ত হয়। মানুষ, পশুপক্ষী, তরুলতা যারই দেহ আছে, প্রাণ আছে, ক্ষয় বৃদ্ধি আছে তারই শত্রু আছে। এ শত্রু হচ্ছে তার রোগ। রোগ কত প্রকারÑএর নিশ্চিত হিসাব কেউ দিতে পারেনি। কেননা পূর্বে যে রোগ ছিল না এক বছর পর সেই রোগের উৎপত্তি দেখা দেয়। শরীর বিজ্ঞানীরা তাই রোগের সঠিক হিসাব দিতে পারেননি। তবে কোন কোন শরীর বিজ্ঞানীর মতে দুলক্ষের বেশি রোগ মানবদেহকে আক্রমণ করে থাকে।
রোগ হলে মানুষ সাধারণতঃ অস্থির হয়ে ওঠে। রোগ হলে যে রোগীর সীমাহীন কষ্ট হয় তা রোগী ছাড়া আর কেউ উপলব্ধি করতে পারে না। আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণও কঠিন রোগ থেকে রেহাই পাননি। আল্লাহর নবী হযরত আইয়ুব (আ.) কুষ্ঠরোগে দীর্ঘ ১৮ বছর কষ্ট করেছিলেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘স্মরণ কর আইয়ুবের কথা, যখন সে তাঁর প্রতিপালককে আহবান করে বলেছিল, আমি দুঃখ-কষ্টে পড়েছি। তুমি তো দয়ালুদিগের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু’ (সূরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৮৩)।
রোগ হলে সীমাহীন কষ্ট হয়। এ জন্য নবী (সা.) হাত তুলে এই দোয়া করতেনÑ‘হে আল্লাহ! আমাকে অপ্রিয় ব্যবহার, কার্য ও বাসনা এবং অনিষ্টকর পীড়া হতে আশ্রয় দাও’ (তিরমিজি)। রোগ হলে মানুষ অসহায় হয়ে যায়। রোগ হলে চিকিৎসা করতে হবে এবং এজন্য চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে হবে। অর্থ ছাড়া তো চিকিৎসা করা যাবে না। চিকিৎসা সেবার অভাবে রোগ থেকে অনেকে মুক্তি লাভ করতে পারে না।
বিশেষ করে চিকিৎসকদের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থা আজ বিপর্যস্ত। চিকিৎসা করতে গেলে রোগীরা কোন সেবা পান না। দুর্নীতিবাজ চিকিৎসকদের কারণে আজ চিকিৎসা সেবা নামক সেই মহিমান্বিত বিষয়টি চিকিৎসা ব্যবসায় পরিণত হয়ে গেছে। চিকিৎসকরা ব্যবসায়ী মন নিয়ে চিকিৎসা করেন। তারা গরিব দুঃখীদের কাছ থেকে নানা কৌশলে টাকা গ্রহণ করেন। অর্থাৎ আজ রোগীর সেবা নেই বলেলেই চলে। প্রশ্ন হচ্ছেÑঅসহায় রোগীরা সেবা পাবার জন্য যাবে কেথায়? চিকিৎসকরা তো উচ্চ শিক্ষিত। চিকিৎসা সেবার জন্য তাদের দ্বারস্থ হলে তারা ব্যবসায়ী মন নিয়ে কথা বলেন কেন? চিকিৎসা সেবার নামে তারা ব্যবসা করেন কেন? অসহায় রোগীর কাছ থেকে অন্যায়ভাবে রোগীকে জিম্মি করে টাকা গ্রহণ করেন কেন? আমি এর জবাবে বলবো ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাবের কারণে তারা চিকিৎসা সেবা নামক মহিমান্বিত নীতিটি বাদ দিয়ে চিকিৎসার নামে এরা ব্যবসা করে থাকেন এবং রোগীকে জিম্মি করে টাকা গ্রহণ করে থাকেন। চিকিৎসা সেবার গুরুত্বটি আমাদেরকে ধর্মীয় দৃষ্টিতে বুঝতে হবে। তাহলেই আমরা নিঃস্বার্থভাবে রোগীর সেবায় এগিয়ে আসতে পারবো।
ইসলামে রোগীর সেবার গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুল (সা.) রোগীর সেবা করার জন্য বারবার উৎসাহ দিয়েছেন। হযরত জাবির (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেনÑ‘যে কোন রোগীকে দেখার জন্য রওয়ানা হল সে যেন আল্লাহর রহমতের দরিয়ায় সাঁতার কাটতে রইল, যতক্ষণ না সে সেখানে গিয়ে বসে। যখন সে গিয়ে বসল, তখন সে দরিয়ায় ডুব দিল’ (মালিক ও আহমদ)। রোগীর সেবা করার নির্দেশ দিয়ে হযরত আবু মুসা আশআরী (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেনÑ‘তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান কর, রোগীর সেবা কর এবং বন্দীকে মুক্ত কর’ (বুখারী)। রোগীর সেবা করার গুরুত্ব বর্ণনা করে হযরত সওবান (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেনÑ‘যখন কোনো মুসলমান অন্য কোন রোগী মুসলমান ভাইকে দেখতে যেতে থাকে, তখন যেন সে জান্নাতের ফল আহরণ করতে থাকে। যতক্ষণ না সে প্রত্যাবর্তন করে’ (মুসলিম)। একজন রোগী যদি রোগ যন্ত্রণার কারণে কারো নিকটে কষ্ট করে এবং তার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ঐ রোগীর সেবা না করে তবে তাকে আল্লাহর দরবারে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেনÑকিয়ামতের দিন মহান আল্লাহপাক বলবেনÑ‘হে আদম সন্তান! আমি পীড়িত ছিলাম, তুমি আমার সেবা করনি। সে বলবে হে আমার প্রতিপালক! আমি কিভাবে তোমার সেবা করতাম অথচ তুমি সব জগতের প্রতিপালক। আল্লাহ বলবেনÑতুমি কি জানতে না আমার অমুক বান্দা পীড়িত ছিল, তুমি তার সেবা কর নি। যদি তার সেবা করতে তাহলে অবশ্যই তার কাছে আমাকে পেতে। হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে খাদ্য দান করনি। সে বলবে-হে আমার প্রতিপালক! আমি কিভাবে তোমাকে খাদ্য দেব অথচ তুমিই সব জগতের প্রভু। আল্লাহ বলবেনÑতুমি জাননা আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিল কিন্তু তুমি তাকে খাদ্য দান করনি। যদি তুমি তাকে খাদ্য দিতে তাহলে নিশ্চয়ই তার কাছে আমাকে পেতে। আল্লাহ বলবেনÑ হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে পানি চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি আমাকে পানি পান করাও নি। সে বলবেÑহে আমার প্রতিপালক! আমি কিভাবে তোমাকে পানি পান করাব অথচ তুমি সব জগতের প্রভু। আল্লাহ বলবেনÑআমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি চেয়েছিল কিন্তু তুমি তাকে পানি পান করাও নি। যদি তুমি তাকে পানি পান করাতে তাহলে আমাকে নিশ্চয়ই তার কাছে পেতে’ (মুসলিম)।
রোগীকে চিকিৎসা সেবার নামে জিম্মি করা বা কোন প্রকারে কষ্ট দেয়া যাবে না। বিশুদ্ধ নিয়তে রোগীর সেবা করতে হবে। এ ব্যাপারে চিকিৎসকদেরকে সদা সতর্ক থাকতে হবে। কারণ সেবা পাবার জন্য ও শান্তি লাভের জন্যই রোগীরা চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন। রোগীর সেবার ফজিলত সম্পর্কে হযরত আলী (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেনÑ‘কোন রোগী মুসলমানকে অন্য কোন মুসলমান সেবা করার জন্য সকাল বেলা গেলে সত্তর হাজার ফেরেস্তা সন্ধ্যা পর্যন্ত তার জন্য দোয়া করতে থাকেন এবং সন্ধ্যা বেলা গেলে ফজর পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেস্তা তার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করতে থাকেন এবং জান্নাতে তার জন্য একটি বাগান তৈরি করা হয়’ (তিরমিজি, আবু দাউদ, মিশকাত শরিফ : পৃষ্ঠা-১৩৫)।
ঘরবাড়ি, হাসপাতালে, রাস্তাঘাটে অগণিত রোগী দেখা যায়। যাদের আর্তনাদে আমাদের মন কেপে ওঠে। এদের অনেকে অর্থের অভাবে চিকিৎসা করতে পারে না। এরা অন্যের সাহায্যের দিকে চেয়ে থাকে, এরা সেবা চায়। বিজ্ঞ চিকিৎসক ও সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিগণ আন্তরিক হলেই এই অসহায় লোকেরা চিকিৎসা সেবা পেয়ে যেত। বিশেষ করে ধনাঢ্য লোকেরা ফ্রি চিকিৎসা সেবার জন্য হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করলে গরিব-দুঃখীরা চিকিৎসা সেবায় হয়রানির শিকার হতেন না। চিকিৎসকরা বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানীর সাথে কমিশন-বাণিজ্যে জড়িত। এজন্য চিকিৎসকরা রোগীর সেবা না করে কোম্পানীর ঔষধ বিক্রির জন্য হন্যে হয়ে পড়েন। ফলে অসহায় রোগীরা কোন সেবা পান না। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। রোগীর সেবা করাই চিকিৎসকদের আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে রোগীকে ঠকিয়ে, রোগীকে হয়রানি করে নানাভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুললে সেই টাকা দ্বারা ঐ চিকিৎসকের দুনিয়া-আখেরাতে কোন উপকার হবে না। এক মুসলমান রোগাক্রান্ত হলে তার সেবা করা অন্য মুসলমানের উপর অপরিহার্য দায়িত্ব। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেনÑএকজন মুসলমানের উপর আরেক জন মুসলমানের পাঁচটি হক রয়েছেÑ১. তার সালামের জবাব দেয়া। ২. রোগীকে দেখতে যাওয়া বা সেবা করা। ৩. জানাযায় যোগদান করা। ৪. দাওয়াত কবুল করা। ৫. হাঁচির জবাব দেয়া। (বুখারী ও মুসলিম)।