Sun. Nov 17th, 2019

BANGLANEWSUS.COM

-ONLINE PORTAL

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শিক্ষা-সমাজ-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে শ্রীহট্ট ব্রাহ্মসমাজের ভূমিকা

1 min read

একথা প্রায় সর্বজনসম্মত যে, আধুনিক বাঙালি সমাজের চিন্তা-চেতনার অরুণোদয়ের দ্বার খুলে দিয়েছিল ব্রাহ্ম সমাজ। ‘ভারত পথিক’ রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩) যেভাবে বদ্ধ সমাজে প্রথা ভাঙার সূচনা করেছিলেন, তার ঢেউ বাংলার পূবসীমানার শ্রীহট্টের জনপদে আছড়ে পড়েছিল। এই জোয়ার একশ্রেণির তরুণ ও শিক্ষিত সমাজকে প্রণোদিত করেছিল। আবার প্রথাবাদী সাধারণ মানুষ ভেবেছিল যে ওটা অন্য কোনো ধর্ম, অতএব  সে-ধর্ম সমর্থকদের মর্যাদা লাভ করতে পারেনি।

 

 

 

সনাতন হিন্দুরা ভাবেনি যে, ব্রাহ্ম ধর্ম আসলে বৈদিক দর্শনে উল্লিখিত নিরাকার উপাসনার একটি দার্শনিক ও ভাবগত বিষয়। ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রভাবে মানুষ তার প্রাত্যহিক জীবনে ঠুনকো কৃষিপ্রথা, সমাজের স্তর-মান্যতা, লৌকিক পূজা-পার্বণ চালানো ও আচারমূলক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। মানুষ পুরুষানুক্রমে নারীকে অন্ধকার ঘরে রাখা, ছুঁতমার্গ পালন, অন্নদোষ খোঁজা ইত্যাদি বিষয়কে অতি আবশ্যক ধর্মা-অনুষঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। আরেক দল লোক অনার্য আচারে ডুবে থাকে-তারা শৈব। শিক্ষাগ্রহণের চেয়ে গাঁজার কলকিকে শিবঠাকুরের নামে নিবেদন করাকে মোক্ষ ভেবেছিল।

 

তাদের সঙ্গে উচ্চদের কোনো সংশ্রব ছিল না। বৈষ্ণবদের ছিল রাধাভাবের বিষয়হীন কান্না। তারও লেখাপড়ার চেয়ে ভাবের ঘোর বেশি দেখেছেন। অন্যদিকে সামান্যসংখ্যক ব্রাহ্মণ অসামান্য হয়ে ওঠে। সমাজ সংস্কার হোক তা তারা মনেপ্রাণে চায়নি। এই অবস্থা সিলেটেও ব্যতিক্রম ছিল না। ব্রাহ্মরা  সে-সকল দুর্গে যৌক্তিক আঘাত হেনে ‘আধুনিকতা’র বিস্তৃতি ঘটায়।

 

সেকালে পুরো বঙ্গীয় অঞ্চলের মতো সিলেটেও চোদ্দপুরুষের প্রথা সংরক্ষণ ও রক্ষণশীলতার নীতি ঐতিহ্যের পরম্পরায় প্রবহমান ছিল। তবে পার্থক্য এই যে, বঙ্গীয় অঞ্চলে চালু ছিল রঘুনন্দন স্মৃতি এবং সিলেটে মৈথিলী স্মৃতি শাস্ত্র। যে-কারণে সিলেটের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান দীর্ঘ হয়ে থাকে। আবার এ-জনপদে হজরত শাহজালাল ও চৈতন্য দেবের প্রভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে কেবলমাত্র ধর্মীয় শিক্ষার জোর ছিল। আধুনিক শিক্ষা গ্রহণে অধিকাংশই দ্বিধাগ্রস্ত ছিল।

 

ইংরেজ আগমনের অনেক পরেও অর্থকরী শিক্ষা এই অঞ্চলে কার্যকর হতে পারেনি। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পনি প্রথম অবস্থায় ঢাকা বিভাগ থেকে সমস্ত পূর্বাঞ্চলের প্রশাসনিক ইউনিট চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সিলেটি চাকরজীবী খুঁজে পায়নি। এমনকি ‘শ্রীহট্ট জেলা’ সৃষ্টির পর থেকে উনিশ শতকের ষাটের দশক পর্যন্ত বহিরাগত জেলার লোকজন দিয়ে শ্রীহট্টের প্রশাসন চালাতে দেখা যায়। মূলত বহিরাগত কয়েকজন বাঙালি আমলার মাধ্যমে ‘শ্রীহট্ট ব্রাহ্ম সমাজ’-এর সূচনা হয়।

 

১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট কলকাতায় প্রথম ‘ব্রাহ্ম সভা’ অনুষ্ঠিত হয়। ১৮৩০ সালের ২৩ জানুয়ারি (১১মাঘ) রাজা রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে এবং দ্বারকানাথ ঠাকুরের বদান্যতায় আনুষ্ঠানিক ‘আদি ব্রাহ্ম সমাজ’ গড়ে ওঠে। তারা সমবেত হয়ে অন্তরের মধ্যে বিশ্বপতির ছায়া খোঁজে কায়মনোবাক্যে নিরাকার ব্রহ্ম সাধনা করতেন। তার সাথে ছিল বেদ-উপনিষদের একেশ্বরবাদী মন্ত্রোচ্চারণ।

 

এই সময়ে ‘ইয়ং বেঙ্গল’ গোষ্ঠীর ছাত্ররা প্রথাকে একেবারে শেষ করে দেওয়ার আন্দোলন চালিয়েছিল। ফলে শিক্ষিত, উদার ও যুক্তিবাদী ধার্মিক জন ‘ব্রাহ্ম সমাজ’-এর দিকে অগ্রসর হয়। এই টালমাটাল সময়ে ব্রাহ্মদের নেতৃত্বে অনেক সংস্কারবাদী আন্দোলন চলেছিল। তখন সিলেট তথা মৌলভীবাজারের এক টোলে পড়ুয়া ব্রাহ্মণ সংরক্ষণবাদী নীতি নিয়ে রামমোহন রায়ের ‘দক্ষিণহস্ত’রূপে কাজ করেছিলেন। তিনি হলেন গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য (১৭৯৯-১৮৫৯)। গৌরীশঙ্কর একদিকে ইয়ং বেঙ্গলের জ্ঞানান্বেষণ পত্রিকা চালাতেন; আবার রামমোহনের সতীদাহ নিবারণ আন্দোলনে ছিলেন প্রথম সারিতে। তাঁর নিজের পত্রিকা ছিল সম্বাদভাস্কর। তিনি ব্রাহ্ম না হলেও কিছুটা ব্রাহ্মপ্রভাবিত হয়েছিরেন। তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে অনেক খবর পূর্বাঞ্চলে চলে আসে। গৌরীশঙ্করের সাথে কলকাতায় চাকরিরত সিলেটিদের সম্পর্ক ছিল।

 

 

 

বিশ্বনাথের দিঘলী গ্রামের দেওয়ান স্বরূপচন্দ্র দাসের সাথে তাঁর যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যায়। স্বরূপচন্দ্র দাসের দুই ছেলে সারদামোহন দাস (যৌবনে প্রয়াত) ও প্রখ্যাত সুন্দরীমোহন দাস (১৮৫৭-১৯৫০) ব্রাহ্ম হয়েছিলেন। সেকালে সিলেটি যুবকদের কলকাতা পড়তে পাঠানো কিংবা শিলং-শিলচরে চাকরিতে পাঠানোর পর অভিভাবকরা আতঙ্কিত হয়ে থাকতেন। কারণ অনেকে  ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেছিলেন বা প্রভাবিত ছিলেন। হবিগঞ্জের লাখাই দত্ত বংশের শ্রীনাথ দত্ত, রামকুমার দত্ত প্রমুখ ব্যাবসায়িক সূত্রে কলকাতায় ব্রাহ্মমত গ্রহণে করলে সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। বিপিন পালের বেলায় তেমনি সারা সিলেটজুড়ে আলোড়ন ওঠে; তারা সমাজচ্যুত হয়েছিলেন।

Copyright © Banglanewsus.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.