ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়েছে ১০৯ গুণ

বিচার না হওয়া, সীমাহীন দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার কারণে প্রতি বছর বাড়ছে ঋণখেলাপির সংখ্যা ও পরিমাণ। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে ঋণখেলাপির সংখ্যা ছিল দুই লাখ ৩০ হাজার ৬৫৮ জন। আর ১৯৯৭ সালে দেশে ঋণখেলাপির সংখ্যা ছিল মোট দুই হাজার ১১৭ জন। অর্থাৎ ২০ বছরের ব্যবধানে দেশে ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়েছে ১০৯ গুণ।
সম্প্রতি সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ঋণখেলাপির তথ্য প্রকাশ করেছে। এ সময় তিনি বলেন, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে ঋণখেলাপির সংখ্যা ছিল দুই লাখ ৩০ হাজার ৬৫৮ জন; তাদের কাছে অনাদায়ী অর্থের পরিমাণ এক লাখ ৩১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। আর ১৯৯৭ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী শাহ এমএস কিবরিয়া সংসদে ঋণখেলাপির তথ্য প্রকাশ করেছিলেন। তাদের দেখা যায়, সেই সময়ের দেশে মোট দুই হাজার ১১৭ জন ঋণখেলাপি ছিল। আর সে সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার কোটি টাকা। এটি বিস্ময়কর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিচার না হওয়া, সীমাহীন দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে ঋণখেলাপির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণের পরিমাণও প্রতি বছর বাড়ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক প্রফেসর ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে খেলাপি ঋণের যে হিসাব দেওয়া হয়, তা আসলে জনগণের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা। কেননা এর মধ্যে অবলোপন (রাইট অফ) করা ঋণের হিসাব থাকে না। অবলোপন করা মন্দ ঋণের সুদ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। তাই সুদাসলে ওই মন্দ ঋণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু অবলোপন করা ঋণের সুদাসলে হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলো জনগণের কাছে লুকাচ্ছে কেন? ওই আসল হিসাবটা জানা গেলে বেরিয়ে যেত যে, শুধু অবলোপন করা খেলাপি ঋণের সুদাসলে বর্তমান স্থিতি হয়তো দুই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আর নানাভাবে বারবার রিশিডিউলিং করে এবং নতুন ঋণের মাধ্যমে মন্দ ঋণ সমন্বয় করে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ কমিয়ে ফেলার ‘কালচার বা ক্যান্সার’ বিবেচনায় নিলে বোঝা যাবে খেলাপি ঋণ সমস্যাটা এখন মহাসংকটে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন ব্যাংকের কর্তাব্যক্তিদের নীরবতা, নিষ্ক্রিয়তা কিংবা সুপরিকল্পিত যোগসাজশে দেশের কয়েক হাজার রাঘববোয়াল ঋণখেলাপি নানাভাবে খেলাপি ঋণ হজম করে ফেলার ব্যাপারটি কোনো যুক্তিতেই মেনে নেওয়া যায় না।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী সংসদে জানান, খেলাপি ঋণের সঙ্গে জড়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮৮টি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের ১৮ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকের ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের ৯ হাজার ২৮৪ কোটি, রূপালী ব্যাংকের চার হাজার ৯০১ কোটি, বেসিক ব্যাংকের আট হাজার ৫৭৬ কোটি, কৃষি ব্যাংকের দুই হাজার ১৭৮ কোটি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের দুই হাজার ৩৩২ কোটি টাকা অনাদায়ী ঋণ রয়েছে। বেসরকারি পূবালী ব্যাংকের দুই হাজার ১১৬ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের পাঁচ হাজার ৭৬ কোটি, ইসলামী ব্যাংকের তিন হাজার ৫২০ কোটি, প্রাইম ব্যাংকের তিন হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা রয়েছে অনাদায়ী।