একটি ব্যক্তিগত উড়োচিঠি..

হাসানুজ্জামান সাকী ::: মানুষের জীবন নানা নাটকীয়তায় ভরা। আমার ছোট ভাই ছোটবেলা থেকেই একজনকে বিশেষ পছন্দ করে। পাশের বাড়ির মেয়ে। পড়শি সেই মেয়েটির নাম প্রীতি। একই সীমানা লাগোয়া দুটি বাড়ি আমাদের। যাই হোক, সেই প্রেমের কাহিনী বলার জন্য এই লেখা নয়। তবে আমার গল্পটা বলার আগে আরেকটু ছোট ভাইয়ের প্রসঙ্গে বলতে হবে।

তো, আমার ছোট ভাইটি বড় হয়েছে। পড়াশোনা শেষ করে এইচএসবিসি ব্যাংকে চাকরি করছে। তারচেয়েও বড় হয়ে উঠেছে তার প্রেমিকা প্রীতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স কমপ্লিট করে ফেলেছে। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় পড়াশোনা শেষ করার অনেক আগেই বেশিরভাগ মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। পড়াশোনা শেষ হয়ে যাওয়া মানে তো মেয়েদের অনেক বয়স! তখন মেয়েকে আর কোন বাবা-মা বসিয়ে রাখেন? প্রীতিও বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকল। কিন্তু বেকায়দায় পড়েছে আমার ছোট ভাই। আমার আগে সে বিয়ে করতে পারছে না। বেকায়দায় আমার বাবা-মাও। কেননা, আমার বিয়ের তখনও কোনো খবর নেই।

 

এক পর্যায়ে আমার সিগনাল পেয়ে ছোট ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হলো- আগস্টের ১৭ তারিখ। প্রতি বছর সামারে ছোটখালা দুবাই থেকে দেশে বেড়াতে আসেন সপরিবারে। ছোটখালারাও তখন দেশে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি ছোট ভাইয়ের বিয়ের কেনাকাটা করতে ঢাকায় এলো আমার মা। উঠলো আগারগাঁয়ে বড় খালার বাসায়। আমি তখন হাতিরপুলে একটি ভাড়া বাসায় থাকি। চাকরি করি দেশের প্রথম চব্বিশ ঘণ্টার সংবাদভিত্তিক চ্যানেল সিএসবি নিউজে। উত্তরার সাত নম্বর সেক্টরে টেলিভিশনের হেড কোয়ার্টার, মেইন স্টুডিও।

 

দুজনের বাসা কাছাকাছি হওয়ায় চ্যানেলের নিউজ প্রেজেন্টার সাদিয়া খন্দকার আর আমার প্রায় প্রতিদিনই একসাথে অফিসে যাওয়া হতো, একসাথে বাসায় ফেরা হতো। একদিন সহকর্মী সাদিয়াকে নিয়ে যথারীতি বাসায় ফেরার উদ্দেশে অফিস থেকে বের হয়েছি। মাঝপথে বললাম- ‘আমার মা এসেছেন, তাকে দেখতে যাবেন?’ সাদিয়া একবার বলেন ‘যাব’, কিছুক্ষণ পরই বলেন ‘না’। এই ‘হ্যা-না’ করতে করতে তিনি শেষমেষ আম্মার সাথে দেখা করতে যেতে রাজী হলেন।

সাদিয়ার পরনে ছিল শার্ট-প্যান্ট। তিনি এই নিয়ে ইতস্তত করছিলেন। আমি জানতাম, আম্মা এতে একটুও অবাক হবে না। যাই হোক, আম্মা তার বড় ছেলের শার্ট-প্যান্ট পড়া সহকর্মীকে সেই প্রথম দেখল। আম্মা সাদিয়াকে দেখে সেদিন বলেছিল- ‘আরে তুমি তো দেখছি পিচ্ছি একটা মেয়ে। তোমাকে টিভি স্ক্রিনে অনেক বড় বড় লাগে।’

এই ঘটনার কিছু দিন আগে আরো একটি ঘটনা ঘটল। আমার খালাতো বোনের দেবরের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছিল। একদিন মুনা আপা আমাকে একটি মেয়ের সম্পর্কে জানতে চাইল। বলল, ‘জামানের জন্য একটি মেয়েকে পছন্দ হয়েছে। তার ফ্যামিলির সাথে কথাবার্তা হয়েছে। মেয়েটি তোদের অফিসে চাকরি করে।’ আমি নাম জিজ্ঞেস করতে সে বলল- সাদিয়া খন্দকার। এতদিন ‘মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া’ প্রবাদটি শুনে এসেছি। এই প্রথম বাস্তবে বুঝলাম, আকাশ ভেঙে পড়া কাকে বলে! আমি সাত-পাঁচ না ভেবে বলে দিলাম- ‘মুনা আপা, এই মেয়ে তো এংগেহজড। এর সাথে বিয়ের আলোচনা আর না এগোনোই ভাল।’ আমার কথা শুনে সে বিয়ে আর এগোলো না।

এদিকে আমার ছোট ভাইয়ের বিয়ের তারিখ এগিয়ে আসছে। কেনাকাটা চলছে। আমি সাদিয়াকে পছন্দ করি। না, শুধু পছন্দ নয়, ভালইবাসি। সে-ও যে আমাকে পছন্দ করে সেটা বুঝতে পারি। কিন্তু বিয়েতে রাজী হচ্ছে না কিছুতেই। এদিকে আমার তাড়া। ছোট ভাইয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। তারিখও ঠিকঠাক। বড় ভাইয়ের সামনে ছোট ভাইয়ের বিয়ে হবে এটা সবার জন্যই খুব বিব্রতকর।

হঠাৎ একদিন, সম্ভবত জুলাইয়ের ২৩ তারিখ- সাদিয়া বিয়েতে রাজী হলেন। আব্বা তখন নেত্রকোণায়। সন্ধ্যায় আব্বাকে পুরো ঘটনা জানানো হলো। আব্বা পরদিন সকালে তড়িঘড়ি করে ঢাকায় এলেন। সন্ধ্যায় আমরা সাদিয়ার বাসায় পারিবারিকভাবে প্রস্তাব নিয়ে গেলাম। এর একদিন আগে প্রথমে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল আলোকচিত্রী কাকলী প্রধানকে দিয়ে। কাকলী আপা আমার পুরনো সহকর্মী। দৈনিক সমকাল-এ আমরা একসাথে কাজ করেছি। তাছাড়া তিনি তখন সিএসবি নিউজে আমার ইনপুট হেড তুষার আব্দুল্লাহর স্ত্রী। আমি আর সাদিয়া আমরা দুজনই সিএসবি’তে ইনপুট বিভাগে ছিলাম।

২৪ জুলাই আমাদের এংগেইজমেন্ট হলো। ওইদিনই দুই পরিবার সিদ্ধান্ত নিল, যেহেতু আমরা একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করি তাই আমাদের এভাবে থাকাটা ঠিক হবে না। এংগেইজমেন্টের দিনই ঠিক হলো একদিন পর অর্থাৎ ২৬ জুলাই আমাদের বিয়ে হবে। ছোট ভাইয়ের বিয়ের বাইশ দিন আগে আমার মায়ের মাত্র এক ভরি সোনার একটি অলঙ্কার দিয়ে সাদিয়ার সাথে বিয়ে হলো।

আগেই বলেছি, আমি একটি ভাড়া বাসায় থাকতাম। যদিও ফ্ল্যাটটিতে আমি একাই থাকতাম কিন্তু সেটি সাজানো-গোছানো ছিল না। বিয়ের দিন ছেলেরা বউকে নিয়ে নিজের বাড়িতে উঠে। সাদিয়া আমাকে নিয়ে তাদের বাড়িতে উঠল! আমরা যেহেতু সহকর্মী ছিলাম, একে অন্যকে আপনি সম্বোধন করতাম। তুমিতে আসতে আমাদের সাতদিন লেগেছিল।

আজ ২৬ জুলাই ২০১৭। আমাদের বিয়ের দশ বছর পূর্ণ হলো। আমি এক ভরি অলঙ্কার দিয়ে বিয়ে করেছিলাম। সেদিন ভেবেছিলাম, মানুষের জীবনে কত কিছুই তো ঘটে। বাস্তবতাকে অনেক সময় মেনে নিতে হয়। একদিন এক ভরি সোনা হয়তো একশ ভরি হবে। বেঁচে থাকলে কতকিছুই দেয়া যাবে। এরই মধ্যে আমরা দুজন থেকে তিনজন হলাম। সামরীন আসলো আমাদের জীবনে। দেখতে দেখতে একটি দশক পেরিয়ে গেল। কিন্তু একশ ভরি হওয়া তো দূরের কথা, এক ভরি সোনা এক ভরিই রয়ে গেল। এই দশ বছরে স্ত্রীকে আমি কিছুই দিতে পারিনি।

সাদিয়া, আজ বলি- তোমাকে কিছু দিতে না পারার এই অক্ষমতা আমাকে লজ্জিত করে। তবে স্বার্থপরের মতো এই ভেবে ভাল লাগে যে আমি একজন বড় মনের মানুষকে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছি, যার তেমন কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই।

প্রিয়তমা, তোমাকে অভিবাদন। তোমাকে অভিনন্দন। আমার অক্ষমতাকে তুমি ক্ষমা করো। শুভ বিয়েবার্ষিকী।

২৬ জুলাই ২০১৭
নিউইয়র্ক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.