Wed. Nov 13th, 2019

BANGLANEWSUS.COM

-ONLINE PORTAL

এক মানবীর সংগ্রামের গল্প

1 min read

ঝিরঝির করে বৃষ্টি ঝরছে। স্বামীর কবরের মাটি ভিজে যাচ্ছে। হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রুমানা সুলতানা চোখের জল গোপন করার চেষ্টা করেন। চার দিন আগে স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি। সেই শোকে তিনি বিহ্বল। কিন্তু তাঁকে এখন ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে হাসপাতালে। তাঁর ছেলের কোমরের নিচের (পেলভিস) হাড় ভেঙে গেছে। যে বাস পিষ্ট করেছিল রুমানা সুলতানার স্বামী সুরকার ও সংগীতশিল্পী পারভেজ রবকে (৫৫), সেই একই কোম্পানির বাস এবার ধাক্কা দিয়েছে তাঁর ছেলে ইয়াসির আলভীকে (১৯)।

 

শ্যামলীর ট্রমা সেন্টারে শুয়ে আছে ইয়াসির আলভী। ৬ সেপ্টেম্বর আলভীর বাবা পারভেজ রব বেরিয়েছিলেন শিক্ষার্থীর বাড়িতে গান শেখাতে যাওয়ার জন্য। ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের একটা বাস তাঁকে ধাক্কা দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক বাসের সঙ্গে পিষে মেরে ফেলে।

 

বাবাকে হারিয়েছে ছেলে। বাসের মালিকদের সঙ্গে দেনদরবার চলছিল। উত্তরায় তাদের বাড়ির কাছেই বাসস্ট্যান্ড। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে সে ফিরছিল পড়শির বাসা থেকে দেনদরবার শেষ করে। শনিবার রাতে বাড়ির কাছের বাসস্ট্যান্ডে ভিক্টর ক্লাসিকের বাসই তার আর তার বন্ধুদের ওপর দিয়ে চালিয়ে দেয়। মারা যায় ইয়াসির আলভীর বন্ধু মেহেদী হাসান (১৯)। বাবাকে হারানোর শোক আর ধাক্কায় সে এমনিতেই ছিল টালমাটাল। বাবা নেই। এখন বন্ধুও নেই। তার কোমরের নিচের হাড় ভাঙা। আর কোনো দিন কি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে ইয়াসির? তার চোখ দিয়ে জল গড়ায়।

 

রুমানা সুলতানাকে কে সান্ত্বনা দেবে? কী সান্ত্বনা দেবে?

 

মেহেদী পড়তেন উত্তরা কমার্স কলেজে। ১৯ বছর বয়সে বাসের নিচে পিষ্ট হয়ে শেষ হয়ে গেল তার সমস্ত সম্ভাবনা। মেহেদীর মা–বাবা ছেলেকে কবরে নামিয়ে রেখে শূন্য হৃদয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। মেহেদীর বিছানাটা খালি। তার প্লেট আর পানির গ্লাসটা পড়ে আছে টেবিলে। সবকিছুই এখন বড় শূন্য বলে মনে হচ্ছে মেহেদীর মা–বাবার।

 

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কত কথা হলো! একেকটা ঘটনা ঘটে, আর একবার করে টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। কত ধরনের কমিটি গঠন করা হয়, কত তার সুপারিশ। শুধু মৃত্যু কমে না, আহতের সংখ্যা কমে না। তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরের মৃত্যুর পর একবার নড়ে উঠেছিল ঘুমন্ত বিবেক। গত বছরের জুলাইয়ে ক্যান্টনমেন্ট শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থীর বাসের চাকার নিচে মৃত্যুর পর আন্দোলিত হয়েছিল সমস্ত দেশ। কিশোর–তরুণেরা রাস্তায় নেমে এসেছিল। তারা শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করেছিল সড়কে। কিশোরদের কাজ তো আর রাস্তায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা নয়।

 

যাদের কাজ তাদের করতে হবে

 

সরকার টাস্কফোর্স করে দিয়েছে আবারও। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল ১১১ দফা সুপারিশ অনুমোদন করেছে। এগুলো ঘটেছে গত ৫ সেপ্টেম্বর। কিশোর আন্দোলনের পর প্রধানমন্ত্রী নিজে ৩০টি নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

 

রুমানা সুলতানা একবার ছেলেকে নিয়ে এক্স–রে রুমে যান, একবার সিটি স্ক্যান করাতে ছুটে যান স্ক্যান সেন্টারে। ওষুধ লাগবে। ইনজেকশন লাগবে। ব্যাগ থেকে টাকা বের করেন। তাঁর স্বামীর কুলখানির জন্য আসা আত্মীয়স্বজন ইয়াসির আলভীকে দেখতে হাসপাতালে আসেন।

 

দর্শনার্থীদের একজন বলেন, বছরে সাড়ে আট হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়।

 

একজন বলেন বাসের চাকার নিচে পা হারানো কৃষ্ণার কথা।

 

একজন বলেন, সবকিছুর মূলে হলো নৈরাজ্য। ল লেসনেস।

 

তখন একজন প্রৌঢ় বলেন, সুশাসনরে ভাই সুশাসন। সড়ক মানেই চাঁদাবাজি। ড্রাইভারদের ট্রেনিং নাই। লাইসেন্স নাই। গাড়ির ফিটনেস নাই। এক বাস আরেক বাসের সঙ্গে রেস খেলে। পাল্লা দেয়। গাড়ি বাঁকা করে রাখে, অন্য বাসকে আটকে রেখে নিজে বেশি যাত্রী তুলতে চায়। এখানে সবাই জিম্মি। বাসের চালকদের কাছে যাত্রীরা জিম্মি। সিন্ডিকেটের কাছে কর্মচারীরা জিম্মি। দুর্নীতির কাছে সিস্টেম জিম্মি। সিস্টেমের কাছে দেশ জিম্মি।

 

ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে ইয়াসির। মা তার কপালে হাত রাখেন। বাবা, কষ্ট হয়!

 

ছেলে বলে, হয় মা। কোমরে ব্যথা। মা, আমি কি আর দাঁড়াতে পারব না সোজা হয়ে?

 

মা কাঁদেন।

 

একজন দর্শনার্থী বলেন, চিন্তা করো, তোমার মতো কত হাজার সড়ক দুর্ঘটনার শিকার আহত অসুস্থ কিংবা পঙ্গু মানুষ এখন হাসপাতালের বিছানায়, তাদের পেছনে পথে বসতে বসেছে কত হাজার পরিবার!

 

ইয়াসির বলে, আঙ্কেল, আমাকে নিয়ে আমি ভাবি না, আমার বাবাকে হারালাম, এখন আমি মেহেদীর বাবা-মাকে মুখ দেখাব কী করে?

 

রুমানা সুলতানার বুক ভেঙে আসে। স্বামীকে হারালেন। ছেলের বন্ধু বাসের চাকায় পিষ্ট হলো।

 

এই ছেলে যদি আর দাঁড়াতে না পারে, কী হবে তাঁর। তাঁর বুক ভেঙে আসে।

 

একজন দর্শনার্থী বলেন, আমাদের সড়ক পরিবহন সেক্টরটা আসলে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাটার মতো। চলছে, কিন্তু চলছে অব্যবস্থার এক নিদারুণ প্রতীকের মতো।

 

অবস্থা এমন যে ঠিক কোন জায়গা থেকে এর নিরাময় শুরু করতে হবে, কেউ জানে না। টাস্কফোর্স হয়, কমিটি হয়, সুপারিশ আসে, শুধু অবস্থা দিন দিন আরও খারাপ হয়ে পড়ে।

 

Copyright © Banglanewsus.com All rights reserved. | Developed By by Positive it USA.

Developed By Positive itUSA