এনজিওর ব্যাপকতা ও করোনায় নীরবতা

প্রকাশিত: ৬:১০ পূর্বাহ্ণ, মে ২২, ২০২০

এনজিওর ব্যাপকতা ও করোনায় নীরবতা

মুঈদ রহমান: এনজিও (NGO)-এর পূর্ণ নাম Non-Government Organiæation, বাংলায় যার রূপ দেয়া হয়েছে ‘বেসরকারি সাহায্য সংস্থা’। যেসব দেশে আর্থ-সামাজিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল সেসব দেশে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি এনজিওগুলো কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। যে দেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় যত বেশি অব্যবস্থাপনা থাকে সেদেশে এনজিও’র দাপট তত বেশি পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশকে এনজিও কার্যক্রমের মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এদেশে এমনও এনজিও আছে যার কার্যক্রম ও শাখা-প্রশাখা পৃথিবীর প্রায় ১৫০টি দেশে বিস্তৃত। আবার এমন এনজিও আছে যার ললাটে নোবেল পুরস্কারের ছোঁয়া লেগে আছে। বাংলাদেশের এনজিওগুলো যেসব কাজ করছে তার মধ্যে আছে- প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, মৌলিক অধিকার, স্যানিটেশন, আর্সেনিক, এইডস/এইচআইভি, নারী, মানবাধিকার, শিশু, ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং সবচেয়ে প্রাধান্য বিস্তারকারী খাতটি হল ক্ষুদ্রঋণ। এদের অর্থের জোগান দেশি-বিদেশি উভয় উৎস থেকেই আসে। এনজিও ব্যুরোর নিবন্ধিত মোট ২ হাজার ৩৪৬টি এনজিওর মধ্যে দেশীয় অর্থায়নে পরিচালিত হয় ২ হাজার ১০৮টি আর বিদেশি অর্থে চলে ২৩৮টি।

’৭১-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে এনজিও কার্যক্রম শুরু হয় ত্রাণ সহায়তার মাধ্যমে। গত প্রায় ৫০ বছরে এ সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখে গিয়ে পৌঁছেছে। এর মধ্যে সমাজসেবা অধিদফতরে নিবন্ধিত আছে ৫৬ হাজার, সমবায় অধিদফতরের অধীনে ১ লাখ ৫০ হাজার, মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের অধীনে ১৬ হাজার এবং এনজিও ব্যুরোতে নিবন্ধিত আছে ২ হাজার ৫০০। তবে এই আড়াই লাখ নিবন্ধিত এনজিওর মধ্যে ৫৫ হাজার নিষ্ক্রিয় আছে। সব এনজিও আবার একই আইনে নিবন্ধিত নয়। সমাজসেবা অধিদফতরের অধীন এনজিওগুলো ‘স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ ১৯৬১’ আইনে নিবন্ধিত। মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের এনজিওগুলোও তাই। কিন্তু সমবায় অধিদফতরের অধীন এনজিওগুলো চলে ‘দ্য কো-অপারেটিভ সোসাইটিজ অ্যাক্ট ২০০১ আইন অনুসারে। আবার ৯ হাজার ৭১০টি এনজিও আছে, যারা যৌথ মূলধনী ও ফার্মগুলোর অধিদফতরের অধীন। এসব প্রতিষ্ঠান পরিচারিত হয় ‘দ্য সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট ১৮৬০ অনুযায়ী। অন্যদিকে এনজিও ব্যুরোর অধীনে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো চলে ‘দ্য ফরেন ডোনেশন (ভলান্টারি অ্যাক্টিভিটিজ) অর্ডিন্যান্স ১৯৭৮’ এবং ‘দ্য ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স ১৯৮২’-এর আইনের অধীনে। তবে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার অধীন এনজিওগুলো ‘মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি আইন ২০০৬’ অনুযায়ী চলে। সে যাই হোক, এনজিওর এই সংখ্যা নিয়ে ‘নিন্দুকেরা’ বলেন, এদেশে কাকের সংখ্যা আর এনজিওর সংখ্যা সমান। তবে এর সঙ্গে একমত নন ফেডারেশন অব এনজিওজ ইন বাংলাদেশ (এফএনবি)-এর কর্মকর্তরা। তাদের বক্তব্য হল, ‘সরকার ঢালাওভাবে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে এনজিও বলছে। এমনকি পাড়ার ক্লাবও সরকারি পরিসংখ্যানে এনজিওর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু দেশে এনজিওর সংখ্যা কোনোভাবেই সাড়ে তিন হাজারের বেশি নয়।’ তারা আরও মনে করেন, ‘এনজিও শব্দটির পরিচিতি আরও স্বচ্ছ করা দরকার। যেসব এনজিও দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্ষুদ্রঋণ, পরিবেশ, নারীর ক্ষমতায়নসহ সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছে সেগুলোকেই এনজিও বলতে হবে। অন্যদের আলাদা নামকরণ বা পরিচিতির ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। এছাড়া সমবায় সমিতিগুলো কোনোভাবেই এনজিও নয়।’
আমরা অতটা নিখুঁত বিশ্লেষণে যেতে আপাতত প্রস্তুত নই। আমরা স্পষ্টভাবেই বিশ্বাস করি, পুঁজিবাদি সমাজে এনজিওর অস্তিত্ব থাকলেও তা অবশ্যই ব্যক্তিখাত থেকে পৃথক, অন্তত দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে। ব্যক্তিখাতের মোটিভ মুনাফা, কিন্তু এনজিওগুলো মুনাফার উদ্দেশ্য নিয়ে নিবন্ধিত নয়; সুতরাং সেখানে পুঁজি কেন্দ্রীভূত হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু আমাদের সামনে এমন উদাহরণও আছে যে, কোনো কোনো এনজিও বিশাল বিশাল ব্যবসা ফেঁদে বসে আছে। বিলাসী পোশাক, পাস্তুরিত দুধ আর মুঠোফোনসহ নানা রকমের রমরমা ব্যবসা করছে- যার একমাত্র উদ্দেশ্য হল মুনাফা। তাদের শিক্ষা খাতে যে বিনিয়োগ তাও মুনাফাভিত্তিক। ক্ষুদ্রঋণ এনজিওগুলোর একটি অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট। এই ক্ষুদ্রঋণের প্রসারের কারণে সারা বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে চেনেন। এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল গরিব, বিশেষ করে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা। এর অর্থনৈতিক ফলাফলকে নেতিবাচক বলা যাবে না। তবে খেয়াল করতে হবে, ক্ষুদ্র্রঋণ ভূমিহীন মানুষকে ভিটে দিয়েছে; ভিটের ওপর একটি দোচালা ঘরও দিয়েছে; ঘরের ভেতর দিয়েছে একখানা খাট; আর খাটের ওপর বিছিয়েছে বিছানা। কিন্তু রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। রাত পোহালেই ঋণ নেয়া কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে হবে। পেটে ভাত দিয়েছে, কিন্তু মনে স্বস্তি দেয়নি। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সুদের হার ১৩-১৫ শতাংশের বেশি নয়, সেখানে এনজিও থেকে নেয়া অর্থের সুদ দাঁড়ায় গড়ে ৩২-৩৫ শতাংশ। এই সংকটময় মুহূর্তেও কিস্তির টাকা আদায়ে চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। এনজিওগুলো গরিব মানুষকে সহায়তার নামে হাজার হাজার কোটি টাকার মুনাফা করেছে। সুতরাং যে সামাজিক উদ্দেশ্যকে ঘিরে কিংবা নিয়ে এনজিওগুলোর সৃষ্টি, প্রকৃতপক্ষে দেখা যায় সেগুলো বাণিজ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠিত।
এ মুহূর্তে আমরা এনজিওগুলোর চরিত্র বদল করতে পারব না। কিন্তু একটা প্রশ্ন তো খুব সহজেই তোলা যায়, দেশের অর্থনীতি যখন মহামন্দার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, দেশের ৬ কোটি মানুষের ন্যূনতম খাবারের নিশ্চয়তা যখন বিপন্ন, তখন দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে মুনাফাকারী বিশাল এনজিওগুলো কেন মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে না? এনজিওগুলোর কার্যক্রম পরিচালিত দেশজুড়ে। তাদের দক্ষ কর্মীবাহিনী আছে, আর আছে আর্থিক সঙ্গতি। সারা দেশে ৬৮ হাজার ৩৮টি গ্রাম আছে। প্রতিটি গ্রামে গড়ে ২৩৭টি পরিবার বাস করে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী এমন কোনো পরিবার নেই যার হাড়ির খবর এনজিওকর্মীরা জানে না। এ সুযোগটি ব্যবহার করে এনজিওগুলোর সহযোগিতা ছিল ন্যায্য প্রত্যাশা। কিন্তু তারা আমাদের হতাশ করেছে। হ্যাঁ, দু’-একটি এনজিও যে কিছু করেনি তা নয়। তবে প্রায় আড়াই লাখের তুলনায় তা কি উল্লেখ করার মতো? আর অর্থের পরিমাণের কথা যদি বলেন তাহলে বলব, যেখানে দেশের ত্রাণ তহবিলে একজন ভিক্ষুক ১০ হাজার টাকা দেয়ার মতো মানবিকতা দেখায়, সে তুলনায় এনজিওদের ভূমিকা কি বিবেচনায় নেয়ার যোগ্যতা রাখে? আমরা যৌক্তিকভাবেই মনে করি, সারা বছর সারা দেশে সদাই আর্থিক কর্মকাণ্ডে এনজিওগুলো যতটা সরব থেকেছে, জাতির ক্রান্তিকালে তারা ততটাই নীরব ভূমিকা পালন করেছে, যা আমাদের প্রত্যাশিত ছিল না।
মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •