এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ পেছাতে পারে

প্রকাশিত:মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০ ০১:০৬

এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ পেছাতে পারে

শেখ আবদুল্লাহঃ করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যে ক্ষতি হচ্ছে তাতে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ পিছিয়ে যেতে পারে। যতটা সহজে বাংলাদেশ এই যাত্রা শেষ করতে পারত, তা এখন ততটাই চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের আয় কমছে। শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দারিদ্র্যের হার কমার পরিবর্তে বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টি পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঝিমিয়ে পড়ায় বাড়তে পারে বেকারত্বের হার।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতিসংঘের সংশ্নিষ্ট কমিটির তিন বছর অন্তর পর্যালোচনায় বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ আসতে পারে কিংবা নাও আসতে পারে। আবার বাংলাদেশ ইচ্ছা করলে এই উত্তরণের সময় বাড়াতে পারে। এজন্য বাংলাদেশকে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যাপক পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ এলডিসি থেকে বের হওয়ার পর বাংলাদেশ পণ্য রপ্তানিতে অনেক ক্ষেত্রে শুল্ক্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। আবার বৈদেশিক ঋণে সহনীয় সুদ ও নমনীয় শর্তও সীমিত হয়ে আসবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা কোথায় দাঁড়াবে তা বিশ্নেষণের বিষয়। কারণ পরিবর্তিত বিশ্বে এলডিসির সুবিধা হারিয়ে বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অনেক কঠিন।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) জানায়, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণে যোগ্য। এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য বিবেচ্য তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ যোগ্যতা অর্জন করেছে। তবে তা ছয় বছর ধরে রাখতে হবে। সিডিপি তিন বছর অন্তর এলডিসি থেকে উত্তরণের বিষয়টি পর্যালোচনা করে। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে কমিটির এ-সংক্রান্ত বৈঠক হওয়ার কথা। আর ২০২৪ সালে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে বের হওয়ার কথা রয়েছে।

জাতিসংঘের ওই কমিটির সদস্য এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সমকালকে বলেন, ফেব্রুয়ারিতে যে বৈঠক হবে সেখানে বিভিন্ন সূচকের এখনকার তথ্য থাকবে না। এসব তথ্য থাকবে ২০১৮ এবং ২০১৯ সালের। কভিড-১৯-এর পরিপ্রেক্ষিতে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক, জাতীয় আয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পরিস্থিতির হালনাগাদ পরিসংখ্যান না থাকলেও ওই কমিটি বৃহৎ একটা মূল্যায়ন কাঠামো গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কারিগরি, বস্তুগত ও প্রক্রিয়াগতভাবে উত্তরণের জন্য প্রস্তুত কিনা তা সরকারিভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। উত্তরণ পেছানোর জন্য বাংলাদেশ নিজেই অনুরোধ করবে কিনা তার জন্য সাম্প্রতিকতম তথ্য-উপাত্তের পুনর্মূল্যায়ন দরকার এবং এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য জাতিসংঘ একটি দেশের মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা বিবেচনায় নেয়। কোনো দেশ এই তিনটি সূচকের যে কোনো দুটিতে পর পর দুটি পর্যালোচনায় উত্তীর্ণ হলে তাকে এলডিসি থেকে বের করে জাতিসংঘ। বাংলাদেশই প্রথম এলডিসি যে তিনটি সূচকেই শর্ত পূরণ করে উত্তরণের পথে এগোচ্ছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য ২০১৮ সালের মার্চে যে পর্যালোচনা করা হয়েছে, তাতে মাথাপিছু আয় কমপক্ষে ১২৩০ ডলার থাকার শর্ত ছিল। বিশ্বব্যাংক নির্ধারিত অ্যাটলাস পদ্ধতিতে এ আয় নির্ধারণ করা হয়। জাতিসংঘের ওই কমিটির হিসাবে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ওই সময় ছিল ১২৭৪ ডলার।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সদস্য মোস্তফা আবিদ খান এ বিষয়ে সমকালকে বলেন, জাতিসংঘ সময়মতোই পর্যালোচনা করবে এবং আশা করা যায়, বাংলাদেশ উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করবে। কারণ করোনাভাইরাসের প্রভাব এই পর্যালোচনায় আমলে নেওয়া হবে না। কিন্তু জাতিসংঘ ইতিবাচক সুপারিশ করলেও তা গ্রহণ করার বিষয়ে বাংলাদেশের মতামত দেওয়ার সুযোগ আছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে গভীর পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ রপ্তানি বাজার পরিস্থিতি কী দাঁড়ায় এবং প্রবাসী কর্মসংস্থান কেমন থাকে, তা দেখতে হবে। এর আগে নেপাল তাদের দেশের ভূমিকম্পের কারণে উত্তরণ পিছিয়ে দিয়েছে।

সম্প্রতি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) আগামীতে বিশ্বে যে বাণিজ্য পরিস্থিতি আসছে তা এলডিসি থেকে উত্তরণে সংশ্নিষ্ট দেশগুলোকে কতটা প্রভাবিত করবে সে বিষয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, এ বছর বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যাপকভাবে কমবে। ফলে এই মহামারি এলডিসিগুলোর উত্তরণকে সীমাবদ্ধ করতে পারে। সংস্থাটির মহাসচিব বলেন, এলডিসিগুলোর অনেকেই উত্তরণের পথে রয়েছে। মসৃণ ও টেকসই উত্তরণ প্রক্রিয়ায় এখন তাদের সহায়তা দরকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস দেশের অর্থনীতিতে যে দুর্বলতা রয়েছে সেগুলোকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে অর্থনীতি ও সমাজের অগ্রগতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ যুক্ত হচ্ছে। ইতিমধ্যে করোনাভাইরাসের আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাবে ৪৭টি এলডিসি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে রয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে সরকার জীবন-জীবিকার মধ্যে সমন্বয় করতে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একই সঙ্গে পরিচালনার মতো ঝুঁকি নিচ্ছে। অবশ্যই আগামী বছরে অর্থনীতির গতি অনেক কমবে। মানুষ কাজ হারাবে। আয় ও সঞ্চয় কমবে। ফলে এলডিসি থেকে মসৃণ উত্তরণ সহজ হবে না। এ রকম পরিস্থিতিতে সরকার কি ২০২৪ সালে উত্তরণ নেবে কিনা তা পর্যালোচনার বিষয়।

মানবসম্পদ সূচকে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিবেচনায় নেওয়া হয়। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যে বড় দুর্বলতা রয়েছে তা এখন ফুটে উঠেছে।

এই সংবাদটি 1,225 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •