Sun. Aug 25th, 2019

BANGLANEWSUS.COM

-ONLINE PORTAL

এশিয়ার ভয়ংকর সড়কগুলোর গল্প

1 min read

কী নেই এই রাস্তাগুলোয়? উঁচু–নিচু পাহাড়, ভয়ংকর খরস্রোতা নদী, মরুভূমি, যেকোনো সময় তুষার বা পাথর ও ভূমিধসের ভয়, বন্দুকধারী খুনি। আছে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাওয়া ব্যাপক স্বপ্নবাজ মানুষের পাথুরে পাহাড় কেটে মসৃণ রাস্তা বানানোর সত্যি গল্প! তারপরও রাস্তাগুলো ভয়ংকর। পদে পদে মৃত্যু সেখানে ওত পেতে থাকে। অথচ কোনোমতে পার হতে পারলেই আপনি পাবেন জীবনের সেরা মুহূর্তের স্বাদ। চলুন শুরু করা যাক সেই রোমাঞ্চকর গল্প।

 

১. খারদুং লা রোড, (ভারত)

 

হিমালয়ের পশ্চিম অংশের দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত এই রাস্তাটি সমুদ্রপৃষ্ট থেকে প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। এ কারণে ভারতের খারদুং লা রোডটি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মোটরগাড়ি চলাচলকারী রাস্তা হিসেবে বিবেচিত।

প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতা, গভীর গিরিখাদ, যেকোনো সময় তুষারপাত এবং ভূমিধসের আশঙ্কা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফি’ চ্যানেল এবং ‘গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে’ অনেকবারই বিপজ্জনক রাস্তার তালিকায় এসেছে ভারতের ‘খারদুং লা রোড’–এর কথা। প্রায় ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রাস্তাটি ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের লাদাখ অঞ্চলের একটি পর্বত পাস। এর স্থানীয় উচ্চারণ ‘খারডং লা’ বা ‘খার্ডজং লা’। এ ছাড়া খারদুং লা রোডটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি মধ্য এশিয়ায় লেহ থেকে কাশগার পর্যন্ত প্রধান কারওয়ান রুটে অবস্থিত। এ ছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এই রুট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এই রোডটির নতুন করে নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৭৬ সালে এবং ১৯৮৮ থেকে এখানে গাড়ি চলাচল শুরু হয়। এই রাস্তাটি ভারতের সর্বোচ্চ পর্বত রাস্তাগুলোর মধ্যে একটি হওয়ায় এটি সবার ভ্রমণের জন্য নয়। তাই খুবই অভিজ্ঞ ড্রাইভার ছাড়া এই রাস্তায় কাউকে গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া হয় না। তবে ভারী বৃষ্টিপাত এবং তুষারপাতের কারণে খারদুং লা পাস জুলাই থেকে আগস্ট এবং নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ থাকে। এই সড়কে চলাচলের সবচেয়ে ভালো সময় মে মাস থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত।

 

 

২. জোজি লা রোড, (ভারত)

আপনি যদি জানেন, যে রাস্তায় আপনি গাড়ি চালাচ্ছেন সে রাস্তা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১ হাজার ৫৭৫ ফুট বা ৩ হাজার ৫২৮ মিটার উঁচুতে অবস্থান করছে এবং আপনার চোখের সামনে রয়েছে কয়েক শ বা কয়েক হাজার ফুটের গভীর পাহাড়ি খাদ, পাহাড়ের ওপরের তুষার যেকোনো সময় আপনার গাড়ির ওপরে ধসে পড়বে, আপনি কী করবেন? ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর থেকে ১০০ কিমি দূরে এবং কাশ্মীরের শোনমার্গ থেকে ১৫ কিমি দূরে লাদাখ ও কাশ্মীরের সংযোগ স্থাপনকারী জোজি লা রোড বা যাকে ‘জোজিলা পাস’ নামে চেনে সবাই, সে রাস্তাটি এ রকমই একটি ভয়ংকর রাস্তা। আর এ কারণেই এই রাস্তাটি বিশ্বের ভয়ংকরতম রাস্তাগুলোর মধ্যে ১ নম্বরে রয়েছে।

জোজি লা রোড জম্মু ও কাশ্মিরের একটি উঁচু পর্বত পাসও বটে। লাদাখ ও কাশ্মীরকে সংযুক্ত করা প্রায় ৫ মাইল বা ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাহাড়ি রাস্তাটি ভীষণ সরু। শীতকালে তীব্র বাতাস এবং ভারী তুষারপাতের কারণে এই রাস্তাটি অত্যন্ত দুর্গম হয়ে ওঠে। এ জন্য শীতের আগে এই রাস্তায় সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া এই রাস্তাটিতে প্রায়ই ধস নামে। ভারী বৃষ্টিপাত হলে এই রাস্তায় কাদা জমে যায়। এ কারণে গাড়ির চাকা কাদায় আটকে যায় এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। তাই ওই সময় এই সরু রাস্তাটিতে গাড়ি চালানো অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এ রাস্তায় একবার প্রবেশ করলে পেছনের দিকে ফেরা প্রায় অসম্ভব। এ কারণে জোজি লা রোডে চলার সময় যদি একবার ভেড়ার পালের সামনে পড়ে যায় কোনো যানবাহন, তাহলে যতক্ষণ না ভেড়ার পাল সরছে ততক্ষণ সেখানে আটকে থাকতে হবে। এই রাস্তায় চলাফেরায় সাধারণ মানুষের অসুবিধার কথা চিন্তা করে ভারত সরকার ‘জোজি লা টানেল’ প্রকল্পটি অনুমোদন করে। এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।

 

 

৩. করাকোরাম হাইওয়ে, (পাকিস্তান ও চীন)

প্রায় ১৬ হাজার ফুট উঁচুতে যদি কোনো রাস্তা হয়, সেই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে আপনি মজা পাবেন হয়তো, কিন্তু কখন যে স্বর্গের কাছাকাছি পৌঁছে যাবেন তার কোনো হিসাব আপনার কাছে না–ও থাকতে পারে। তার ওপর রাস্তাটা যদি হয় ভূরাজনৈতিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানকার আইনশৃঙ্খলা যদি সব সময় যথাযথ কর্তৃপক্ষের হাতে না থাকে, তাহলে আপনার মতো সাধারণ মানুষের জন্য সেটা নরক ছাড়া আর কিছুই নয়। হ্যাঁ, তেমনি একটি ভয়ংকরতম রাস্তা কারাকোরাম হাইওয়ে। যেটিকে কেকেএইচ বা ন্যাশনাল হাইওয়ে ৩৫ নামেও চেনে পৃথিবীর মানুষ। এই খতরনাক রাস্তাটি পাকিস্তান এবং চীনের মধ্যে অবস্থিত। এটি প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিমি দীর্ঘ, যার মধ্যে পাকিস্তানে ৮৮৭ কিমি এবং চীনে ৪১৩ কিমি রাস্তা রয়েছে।

 

কারাকোরাম পর্বতমালার মধ্য দিয়ে যাওয়া এই রাস্তা চলে গেছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়, নদী, হ্রদ ও হিমবাহর পাশ দিয়ে। যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় এসব থেকে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। এই রাস্তাটি

 

৪. তিয়েনমেন মাউন্টেন রোড, (চীন)

তিয়েনমেন শব্দটির বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘স্বর্গের দরজা’। অসাধারণ প্রাকৃতিক শোভাময় পাহাড় বলে এর এমন নাম হয়েছে। এই পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার জন্য যে রাস্তা সেটিই তিয়েনমেন মাউন্টেন রোড নামে পরিচিত। কিন্তু একবার ভাবুন যে আপনাকে সেই রাস্তা পাড়ি দিতে হবে ৯৯টি বিপজ্জনক বাঁক! সঠিক সময় বাঁকটা নিতে না পারলে আপনি গাড়িসহ উড়ে গিয়ে পড়তে পারেন কয়েক শ ফুট নিচের গিরি খাদে। উচ্চতা যত বাড়বে, পতনের রাস্তা তত লম্বা হতে থাকবে।

 

চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় হুনান প্রদেশের তিয়ানমেন মাউন্টেন ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে অবস্থিত এই রাস্তা ‘তিয়েনমেন শান বিগ গেট রোড’ নামেও পরিচিত। এই রাস্তাটি সমুদ্রপৃষ্ঠের ২০০ মিটার ওপর থেকে ১ হাজার ৩০০ মিটার পর্যন্ত ওপরে উঠে গেছে। এই রাস্তাটি ভীষণ বিপজ্জনক হওয়ার মূল কারণ, এতে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি কোণের মোট ৯৯টি বাঁক বা মোড় আছে এবং এই মোড়গুলোর বেশির ভাগই তিয়েনমেন গুহার ভেতর দিয়ে চলে গেছে। এই রাস্তাটির একদিকে গভীর খাদ আর অন্যদিকে বিশাল বাঁক। তাই এই রাস্তায় বছরের সব সময়ই দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত এই রাস্তায় চলাচলের জন্য আদর্শ সময় ধরা হয়।

 

 

৫. গোলিয়াং টানেল, (চীন)

নওয়াজ উদ্দিন সিদ্দিকী অভিনীত হিন্দি সিনেমা ‘মানঝি: দ্য মাউনটেন ম্যান’ যাঁরা দেখেছেন তাঁরা জানেন, একজন মানুষ নিজের স্ত্রীর মৃত্যুর পর পাহাড় কেটে রাস্তা বানিয়ে কীভাবে নিজ গ্রামের শত শত মানুষের মৃত্যু রুখে দিয়েছিলেন। চীনের গোলিয়াং টানেলের গল্পটাও একই রকম। মাত্র ৩০০ জন গ্রামবাসীর ব্যবহারের জন্য রাস্তা বানাতে মিলিয়ন মিলিয়ন অর্থ খরচ করতে অনীহা প্রকাশ করে চীন সরকার। কিন্তু দেশের অন্যান্য অংশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য উতলা হয়ে থাকা চীনের প্রত্যন্ত এলাকার গোলিয়াং নামের গ্রামটির ১৩ জন অধিবাসী সরকারের সে সিদ্ধান্তের থোড়াই কেয়ার করেন। তাঁরা সরকারের সহায়তা এবং কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাহাড়ের ভেতর দিয়ে সুড়ঙ্গ নির্মাণের বিপজ্জনক কাজ শুরু করেন। খাড়া পাহাড়ের ওপর বিস্ফোরক নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। কিন্তু দমে না গিয়ে অন্যরা পাথুরে পাহাড়ের পেটে খোঁড়াখুঁড়ি চালিয়ে যান। অবশেষে ১৯৭৭ সালে অনেক রক্ত আর তিক্ত অভিজ্ঞতার পর এই টানেল সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

 

গোলিয়াং টানেল প্রায় ১.২ কিলোমিটার লম্বা একটি সুড়ঙ্গ পথ। এই সুড়ঙ্গ পথটি চীনের হিনান প্রদেশের জিনসিয়াংয়ের হুইসিয়ানে অবস্থিত তাইহং পর্বতমালার অন্য প্রান্তের সঙ্গে গোলিয়াং গ্রামকে যুক্ত করে দিয়েছে। পাথুরে পাহাড়ের পেটে প্রায় ১৩ ফুট প্রশস্ত এই সুড়ঙ্গটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৭২ সালে। এই রাস্তাটি বিপজ্জনক হওয়ার কারণ, এর এক দিকে পাহাড় আর অন্য দিক সম্পূর্ণ ফাঁকা। এই সুড়ঙ্গের কয়েক শ মিটার নিচে রয়েছে মাটি। এ ছাড়া এটি একটি সুড়ঙ্গ হওয়ায় বেশির ভাগ সময় অন্ধকার থাকে। এই টানেলটি সারা বছর খোলা থাকে।

 

 

৬. তারোকো গর্জেড রোড, (তাইওয়ান)

বিপজ্জনক রাস্তার মধ্যে এরপর বলতে হবে তাইওয়ানের ৮ নম্বর হাইওয়ে ‘তারোকো গুর্জ রোডে’র কথা। এই রাস্তাটিও গোলিয়াং টানেলর মতো পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে। এটিকে ‘সেনট্রাল ক্রস-আইল্যান্ড হাইওয়ে’ বলা হলেও আসলে এটি একটি সরু রাস্তা। এটি এতই সরু রাস্তা যে এই রাস্তায় পাশাপাশি দুটি বড় গাড়ি চলাচল করা প্রায় অসম্ভব।

Copyright © Banglanewsus.com All rights reserved. | Developed By by Positive it USA.

Developed By Positive itUSA