এসি এডুগন পেলেন লাখ ডলারের সাহিত্য পুরস্কার

এসি এডুগনসাহিত্যক্ষেত্রে কানাডার বেশ কয়েকটি পুরস্কার রয়েছে। কবিতার জন্য পঁয়ষট্টি হাজার ডলার মূল্যের গ্রিফিন পুরস্কার, শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের জন্য পঞ্চাশ হাজার ডলার মূল্যের রাইটার্স ট্রাস্ট পুরস্কার, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় রচিত সাহিত্যের জন্য প্রতিটি পঁচিশ হাজার করে মোট চৌদ্দটি গভর্নর জেনারেল পুরস্কার। সাহিত্যকে ছাপিয়ে যে পুরস্কারটি গত দুই দশক জুড়ে সাহিত্যামোদীদের কাছে বিপুল আলোচনার বিষয় হয়েছে সেটি হলো এক লাখ ডলার মূল্যের স্কোশিয়া ব্যাংক গিলার পুরস্কার। দুই মাস অপেক্ষা শেষে ১৯ নভেম্বর টরন্টোর সময় রাত ৮টায় জাঁকজমকপূর্ণ এক অনুষ্ঠানে এ পুরস্কারের জন্য লেখক এসি এডুগনের নাম ঘোষণা করা হয়। তিনি পাবেন এক লাখ ডলার। সংক্ষিপ্ত তালিকার বাকি চার সদস্যের প্রত্যেকে পাবেন দশ হাজার ডলার। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অগ্রগণ্য সাহিত্যিক মার্গারেট অ্যাটউড, টরন্টোর মেয়র জন টরিসহ অনেক বরেণ্য লেখক-সাহিত্যিক ও বিশিষ্টজন। পাঁচ সদস্যের জুরি বোর্ডের প্রধান ছিলেন কানাডীয় সাহিত্যিক কামাল আর-সোলাইলি।
এসি এডুগন বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি বহুল আলোচিত নাম। ক্যালগেরির এই কৃষ্ণাঙ্গ নারী মোট মাত্র চারটি উপন্যাস লিখলেও এ বছর ‘ওয়াশিংটন ব্ল্যাক’ উপন্যাসের জন্য তিনি ম্যান বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিলেন। এর আগে ২০১১ সালেও অন্য উপন্যাস ‘হাফ-ব্লাড ব্লুজ’-এর জন্য তিনি স্কোশিয়া ব্যাংক গিলার পুরস্কার লাভ করেছেন। সে-বছর ওই উপন্যাসটিও ম্যান বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল।
এ বছর মোট জমা পড়েছিল ১০৪টি বই। সেখান থেকে ১২টি বইকে বড় তালিকাভুক্ত (লংলিস্ট) করা হয়। সে-তালিকা ঘোষিত হয়েছিল ১৬ সেপ্টেম্বর। ১ অক্টোবর পাঁচটি গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল। এ তালিকায় এসি এডুগন ছাড়া যে চার লেখক ছিলেন তাঁরা হলেন প্যাট্রিক ডিউইট (ফ্রেন্স এক্সিট), এরিখ ডুপন্ট (সংস ফর দ্য কোল্ড অব হার্ট), শিলা হেটি (মাদারহুড) এবং টিয়া লিম (অ্যান ওশান অব মিনিটস)। অন্য প্রতিযোগী প্যাট্রিক নিজেও কিন্তু স্কোশিয়া ব্যাংক গিলার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিলেন ২০১৫ সালে—‘আন্ডারম্যাজরডোমো মাইনর’ উপন্যাসের জন্য। তারও আগে ২০১১ সালে প্যাট্রিকের ‘সিস্টারস ব্রাদারস’ উপন্যাসটি কিন্তু একই সঙ্গে পঞ্চাশ হাজার ডলারের রজার্স রাইটার্স ট্রাস্ট ফিকশন প্রাইজ এবং পঁচিশ হাজার ডলারের গভর্নর জেনারেল পুরস্কার পায় এবং ম্যান বুকার ও স্কোশিয়া ব্যাংক পুরস্কারের দৌড়ে ছিল। আরেক প্রতিযোগী এরিখ হলেন ফরাসিভাষী লেখক। ইংরেজি অনুবাদে অংশগ্রহণের সুযোগ আছে বলেই এরিখের উপন্যাসটি এই প্রতিযোগিতায় টিকে ছিল। অনুবাদক হলেন পিটার ম্যাক ক্যামব্রিজ। বলে রাখা যেতে পারে যে এই উপন্যাসটি কিন্তু এ বছর গভর্নর জেনারেল সাহিত্য পুরস্কারের দৌড়েও ছিল।
অন্য যে-সাতজন লেখক বড় তালিকায় ছিলেন তাঁরা হলেন: পেইজ কুপার, রাও হেজ, ইমা হুপার, লিসা মুর, তানিয়া তাগাগ, কিম থু, জসুয়া হোয়াইটহেড। পাঠকের স্মরণে থাকতে পারে কিম থু হলেন কুইবেকের সেই ফরাসি-ভাষী লেখিকা যিনি এ বছর বিকল্প নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য সর্বশেষ চারজনের তালিকাতে ছিলেন। কিমের যে উপন্যাসটি দৌড়ে রয়েছে সেটি হলো ‘ভি’। এটি অনুবাদ করেছেন দুই শ উপন্যাসের খ্যাতিমান অনুবাদক শিলা ফিশম্যান। রাও হেজ হলেন ‘বইরুত হেলফায়ার সোসাইটি’ নামের বহুল আলোচিত সেই উপন্যাসটির লেখক যেটি রাইটার্স ট্রাস্টের এবং গভর্নর জেনারেল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকাতে ছিল। জসুয়ার লেখা ‘জনি অ্যাপলসিড’ উপন্যাসটিও কিন্তু গভর্নর জেনারেল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকাতে আমরা দেখেছিলাম।
তবে যে-কারণে সাহিত্য ক্ষেত্রে স্কোশিয়া ব্যাংক গিলার পুরস্কার অনন্যতা অর্জন করেছে তা হলো সংক্ষিপ্ত তালিকা ঘোষণার পর থেকে আয়োজকদের তত্ত্বাবধানে মোট সাতটি শহরে কানাডা ও কানাডার বাইরে প্রতিযোগী লেখকদের পাঠকদের মুখোমুখি করা হয়। কানাডার শহরগুলো হলো ক্যালগেরি, ভ্যাঙ্কুভার, হ্যালিফ্যাক্স, অটোয়া ও টরন্টো। ৭ নভেম্বর ছিল নিউইয়র্কে এবং ১৫ নভেম্বর ছিল ইংল্যান্ডের লন্ডনে। লন্ডনে আয়োজনটি করা হয় যে ঠিকানায় সেটি হলো কানাডা হাউস—যে ভবনে কানাডার হাইকমিশন অফিস অবস্থিত।
গণমাধ্যমে সংক্ষিপ্ত তালিকার পাঁচ লেখক নিয়ে চলেছে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড। রেডিও-টেলিভিশন তাঁদের নিয়ে প্রচার করে চলেছে নতুন নতুন অনুষ্ঠান। পাঠকেরা পরিচিত হয়েছেন তারকা এই লেখকদের ব্যক্তিজীবন ও লেখকজীবন নিয়ে।
গিলার পুরস্কার দেওয়া হয় কথাসাহিত্য গ্রন্থের জন্য। শুরুতে পঁচিশ হাজার ডলার দেওয়া হতো। টরন্টোর ধনাঢ্য ব্যবসায়ী জ্যাক র‌্যাবিনোভিচ তাঁর প্রয়াত স্ত্রী ডরিস গিলারের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে এই পুরস্কারের প্রচলন করেন। ২০০৫ সালে পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত হয় কানাডার গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাংকটি সেটি হলো স্কোশিয়া। পুরস্কারের নামকরণ করা হয় ‘স্কোশিয়া ব্যাংক গিলার পুরস্কার’। পুরস্কারের অর্থমূল্য বাড়িয়ে করা হয় পঞ্চাশ হাজার ডলার। চল্লিশ হাজার দেওয়া হতো বিজয়ী লেখককে আর সংক্ষিপ্ত তালিকার চার লেখককে দেওয়া হতো আড়াই হাজার করে। ২০০৬ সালে বিজয়ী লেখকের ভাগ বাড়িয়ে করা হয় পঞ্চাশ হাজার ডলার এবং সংক্ষিপ্ত তালিকায় লেখকের জন্য করা হয় পাঁচ হাজার ডলার করে। ২০১৪ সাল থেকে অর্থের পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে—বিজয়ী এক লাখ এবং সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান লাভকারী দশ হাজার ডলার করে পাচ্ছেন।
১৯৯৪ সালে শুরুর বছরে গিলার পুরস্কার পেয়েছিলেন কানাডার বরেণ্য কথাসাহিত্যিক এম. জি. ভাসানজী। সে-বছর তাঁর লেখা উপন্যাসটির নাম ছিল ‘দ্য বুক অব সিক্রেটস’। রোহিনতন মিস্ত্রি ‘অ্যা ফাইন ব্যালান্স’এর জন্য পান ১৯৯৫ সালে। মার্গারেট অ্যাটউড পান ১৯৯৬ সালে। বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ‘অ্যালিয়াস গ্রেস’ উপন্যাসের জন্য তাঁর সেই প্রাপ্তি। পরবর্তীকালে যে-কথাসাহিত্যিকেরা এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন তাঁরা হলেন মরডেকাই রিচলার (১৯৯৭), এলিস মানরো (১৯৯৮), মাইকেল ওনডাডজি (২০০০), ডেভিড অ্যাডামস রিচার্ডস (২০০০) প্রমুখ।
অতীতে পুরস্কারপ্রাপ্ত অন্য যে কথাসাহিত্যিকেরা বিশেষ মর্যাদায় কানাডার সাহিত্যজগতে বর্তমানে উজ্জ্বল তাঁরা হলেন: অস্টিন ক্লার্ক (দ্য পোলিস্ড হো, ২০০২), ভিনসেন্ট ল্যাম (ব্লাডলেটিং অ্যান্ড মিরাকুলাস কিওরস, ২০০৬), এলিজাবেথ হে লেইট নাইটস অন এয়ার, (২০০৭), জোহানা স্কিবসরুড (দ্য সেন্টিমেন্টালিস্ট, ২০১০), আন্ড্রে অ্যালেক্সিস (ফিফটিন ডগস, ২০১৫) প্রমুখ।
গত বছর বহু-কাঙ্ক্ষিত এই পুরস্কারটি পান মাইকেল রেডহিল। ‘বেলভু স্কোয়ার’ উপন্যাসের জন্য তিনি যখন এক লাখ ডলার পান তখন একটি অদ্ভুত কাজ করেন মাইকেল। তিনি চেকটি ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর তাঁর অ্যাকাউন্টের সর্বশেষ স্ট্যাটাসের স্লিপটি তিনি সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করেন। আমরা দেখতে পাই চেকটি জমা দেওয়ার আগে মাইকেলের অ্যাকাউন্টে ছিল ৪১১ ডলার ছেচল্লিশ সেন্ট। মাইকেলের এই কাণ্ড কিন্তু সংবাদপত্রের শিরোনামও হয়েছিল।
১৯৯৪ সালে শুরু হওয়া গিলার কথাসাহিত্য পুরস্কারের এ বছর ছিল রজত জয়ন্তী। এসি হলেন তৃতীয় লেখক যে পুরস্কারটি দুইবার পেলেন। এর আগে অন্য যে দুই বরেণ্য সাহিত্যিক দুইবার করে পুরস্কারটি পেয়েছেন তাঁরা হলেন এম জি ভাসানজি ও এলিস মানরো।