করোনা কীভাবে আমাদের পরিবেশ দূষণ রোধ শেখাতে পারে!

প্রকাশিত:রবিবার, ০৬ সেপ্টে ২০২০ ০৫:০৯

করোনা কীভাবে আমাদের পরিবেশ দূষণ রোধ শেখাতে পারে!

 
ড. মো. কামাল উদ্দিন
 
পরিবেশ দূষণ বর্তমান বৈশ্বিক সমস্যার মধ্যে অন্যতম। পরিবেশগত সমস্যার ট্রান্সন্যাশনাল চরিত্র রয়েছে। একটি দেশ অন্যান্য দেশের ক্রিয়াকলাপের জন্য সৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য ঝুঁকির মধ্যে থাকে। তাই, পরিবেশগত সমস্যার আন্তর্জাতিকীকরণ করা হয় এবং এ সমস্যার সমাধানে সব দেশের অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যক। এ জাতীয় বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কখনও কখনও কার্যকর করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ পরিবেশ বিষয়টি একটি বিশেষ মতাদর্শিক এবং রাজনৈতিক বিতর্কের ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশগত সমস্যার গুরুত্ব, প্রকৃতি এবং এগুলো কীভাবে সর্বোত্তমভাবে মোকাবিলা করা যায় সে সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। পরিবেশগত অগ্রাধিকারগুলো অর্থনৈতিক কার্যকলাপের সঙ্গে পারস্পরিক বিপরীত অবস্থা তৈরি করে।
কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব জীবন-জীবিকা নষ্ট করেছে। কোটি কোটি মানুষ বিশ্বজুড়ে ঘরে থাকতে বাধ্য হয়েছে। এসময় ভ্রমণ ও উৎপাদনের সীমাবদ্ধতার কারণে কার্বন নিঃসরণ ও দূষণের মাত্রাও ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে। শিল্পায়িত শহরগুলোতে কালো ধোঁয়া ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় এ শহরগুলো থেকে নীল আকাশ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বর্জ্য কমে যাওয়ায় পরিষ্কার পানি দেখা দিয়েছে। অনেক কারখানা ও ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া, রাস্তায় গাড়ির পরিমাণ কমে যাওয়া ও আকাশে প্লেন উড্ডয়ন কমার কারণে আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ আস্তে আস্তে পুনরুদ্ধার হচ্ছে বলে পরিবেশবিদরা মনে করেন। করোনার কারণে চীনে দূষণ কমেছে ৪০ শতাংশ। নিউইয়র্ক শহরে দূষণের মাত্রা কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। গ্রিন হাউস গ্যাসের উৎপাদন ও পরিবেশ দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের তথ্য মতে প্রতি বছর প্রায় ৩ মিলিয়ন মানুষ বায়ু দূষণজনিত অসুস্থতায় মারা যায়, যার ৮০ ভাগ শহরাঞ্চলে বসবাসরত মানুষ। আমাদের মতো নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ, যেখানে ৯৮% শহর বায়ু দূষণের কবলে। গবেষকরা দেখছেন যে দূষিত শহরগুলোতে নিম্নমানের বাতাসের কারণে হাঁপানি বা দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের অসুস্থতার সম্ভাবনা বেশি থাকে, যা করোনা আক্রান্তদের জন্য ভয়ানক বিপদ ডেকে আনতে পারে। করোনা পরিস্থিতির কারণে পরিবেশ দূষণ কমেছে তা যেরকম পরিষ্কার, অন্যদিকে কোভিড-১৯ পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হয়েও দাঁড়িয়েছে।
করোনাভাইরাসের ফলে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যাপক হারে বেড়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থার ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে করোনাভাইরাস। এ মহামারির প্রেক্ষিতে একক ব্যবহারের গ্লাভস, সার্জিক্যাল মাস্ক এবং খালি আইভি ব্যাগের মতো ডিসপোজেবল চিকিৎসা সামগ্রীর বিপুল চাহিদা চিকিৎসা বর্জ্যের প্রলয় ঘটিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ চীনের উহান শহরে মহামারি যখন ব্যাপক আকার হয় তখন দিনে ৪০ থেকে ২৪০ টন মেডিক্যাল বর্জ্যের পরিমাণ বেড়েছে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে এ মেডিক্যাল বর্জ্যের পরিমাণ অনেক গুণ বেড়েছে। যে সকল দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খুবই দুর্বল সে সকল দেশে মেডিক্যাল বর্জ্যের কারণে বায়ু দূষণ ও অন্যান্য পরিবেশ দূষণ মারাত্মক হতে পারে। এছাড়া করোনাভাইরাসের চিকিৎসা সরঞ্জামের উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। ফলে সৃষ্ট এ বর্জ্য শুধুমাত্র পরিবেশগত সমস্যাই নয়, বর্জ্য সংগ্রহ ও নিষ্কাশনের সঙ্গে নিযুক্ত শ্রমিককে স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যেও ফেলেছে। এছাড়া করোনা মহামারি চলাকালীন পুনরায় ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিংয়ের গুরুত্ব কমেছে। অন্যদিকে প্লাস্টিকের প্যাকেজিংয়ের জনপ্রিয়তার বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে প্লাস্টিকের প্যাকেটগুলোকে স্যানিটারি বিকল্প হিসেবে দেখেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, নিউ হ্যাম্পশায়ার, ইলিনয় এবং ম্যাসাচুসেটসে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রিপাবলিকানরা ওয়াশিংটন, নিউ ইয়র্ক এবং নিউ জার্সিতে তাদের নিজ নিজ প্লাস্টিকের ব্যাগ নিষিদ্ধকরণ বা বিলম্ব করার জন্য কাজ করছেন। তাদের যুক্তি হলো পুনরায় ব্যবহারযোগ্য ব্যাগগুলো করোনভাইরাস বহন করার সম্ভাবনা বেশি। অনলাইন শপিং প্যাকেজিংয়ে প্রচুর পরিমাণ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে। করোনাভাইরাসের ফলে অনলাইনে কেনাকাটার চাহিদা প্রচুর পরিমাণ বাড়ার ফলে পলিথিনের ব্যবহার বা প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে আগের তুলনায় বহুগুণ। জাতিসংঘ ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রে মাছের চেয়ে বেশি প্লাস্টিকের উপস্থিতি থাকবে। করোনাভাইরাস মহামারি নিঃসন্দেহে এই প্রবণতাটিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে বলে অনেক দাবি করেন। করোনার কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ের যতই যুক্তি থাকুক না কেন, মোদ্দাকথা হলো করোনা পরিস্থিতিতে পরিবেশ দূষণ আগের তুলনায় অনেক কমেছে।
সাম্প্রতিক একটি রিপোর্টে উঠে এসেছে যে বেশিরভাগ দেশে কোভিড-১৯ মহামারিতে কার্বন নিঃসরণ এবং অন্যান্য বায়ু দূষণ হ্রাস পেয়েছে। তবে এ প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। মহামারি শেষ হলে এবং সবকিছু পূর্ববর্তী স্তরে প্রত্যাবর্তিত হলে মানুষের অভ্যাস আগের স্তরে যাবে না তার কোনও ইঙ্গিত বহন করে না। তবে আমরা যদি করোনায় সৃষ্ট অভ্যাস ধরে রাখতে পারি, তাহলে পরিবেশ দূষণ কমিয়ে আনা সম্ভব। জুম, মাইক্রোসফ্ট টিমস এবং স্কাইপের মতো অনলাইন যোগাযোগ সরঞ্জামগুলোর চাহিদা এখন আকাশচুম্বী। তাই মহামারি শেষ হওয়ার পরও বাড়ি থেকে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করা যায়। আমরা কোভিড-১৯ এর পর কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করার একটি উপায় হিসেবে এটিকে দেখতে পারি। যদি আমরা করোনভাইরাস শেষ হওয়ার পর আমাদের চিন্তাভাবনাটিকে রিসেট করতে সক্ষম হই, তাহলে আমরা আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় আরও পরিবেশবান্ধব হতে অনুপ্রাণিত হতে পারি। দূরবর্তী অবস্থান থেকে যে কাজগুলো করা যায় সেগুলো সেভাবে করতে পারি। যার মাধ্যমে গাড়ি এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ব্যবহার হ্রাস করা যাবে।
এছাড়া করোনা থেকে শিক্ষা নিয়ে কেনাকাটা কমিয়ে আরও বেশি সাশ্রয়ী হতে পারি। কম অপচয়কারী হতে শিখতে পারি। আমরা করোনাভাইরাসের ইতিবাচক দিকটি দেখার চেষ্টা করতে পারি। করোনা থেকে শেখা আমাদের বর্জ্য ও কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমিয়ে আনার অভ্যাস ভবিষ্যতের জন্য ভালো শিক্ষা হতে পারে। ইতিবাচক পরিবেশগত পরিবর্তন কার্যকর করতে পুরো বিশ্বকে থামিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। তবে বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন করতে হবে যা পরিবেশের জন্য সহায়ক। এরই মাধ্যমে আস্তে আস্তে একটি টেকসই পৃথিবী অর্জনের পথকে আমরা আরও সুগম করতে পারি। আর যদি তা না করি, তাহলে পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ হতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা যে কৌশল অবলম্বন করেছি এখন পর্যন্ত তা পরিবেশ বিপর্যয় রোধে সফলতা দিচ্ছে। এই ধরনের সাফল্য করোনা পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়ন করতে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থাপনার জন্য একটি নীতি প্রণয়নের জন্য আলোচনা হতে পারে। দূর থেকে কীভাবে অফিস করা যায় এবং এর মাধ্যমে ট্রান্সপোর্টেশন কমিয়ে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমিয়ে আনা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। অফিসের কিছু সংখ্যক কর্মীকে হোম অফিসের মাধ্যমে কাজ আদায়ের যে ধারণা করোনাকালীন সময়ে তৈরি হয়েছে, তা পরিবেশ দূষণ রোধে ভূমিকা রাখতে পারে। এটি একদিকে প্রতিষ্ঠানের অর্থ সাশ্রয় করবে অন্যদিকে অবশ্যই নেতিবাচক পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস করবে। আশা হলো, আমাদের পরিবেশ সঙ্কট যে রূপ ধারণ করেছে তা থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রত্যেক ব্যক্তি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আচরণ পরিবর্তন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। আমরা সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং ভবিষ্যতে আমাদের ইতিবাচক পরিবর্তন পরিবেশ দূষণ কমিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আমরা ইতিমধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি চালানো, রিনিউয়েবল এনার্জি ও সবুজ পণ্যের ব্যবহার, দ্রব্যের ব্যবহার কমানো, দ্রব্যের পুনঃব্যবহার ও রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে পরিবেশের ওপর আমাদের নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস করার চেষ্টা করে আসছি। তবে আমরা জানি, পরিবেশ দূষণ রোধে আমরা নিজেরা আরও বেশি কিছু করতে পারি এবং আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্তদের আরও বেশি কিছু করতে উৎসাহিত করতে পারি।
করোনাকালীন সময়ে অনলাইন কার্যক্রমের ফলে আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সভা-সমাবেশে প্রত্যক্ষ উপস্থিতির দরকার হয়নি। ঘর থেকে অফিস করা, অনলাইন কেনাকাটা, ভ্রমণ কমানো ইত্যাদি কারণে পরিবেশ দূষণ এতটাই কমেছে যে দীর্ঘ সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো কেউ কেবল ধোঁয়াশার বদলে আকাশের আসল রঙ দেখতে পেয়েছে। যদিও করোনা সংকট কাটিয়ে উঠলে পুনরায় আবার আগের মতো সবকিছু চলবে। তবে পরিবেশ বিপর্যয় কমাতে ভার্চুয়ালি কাজ করার অভ্যাস টিকিয়ে রাখতে হবে। ভার্চুয়ালি কিছু অফিস চালাতে পারলে যাতায়াত করা লোকের সংখ্যা কমে যাবে। তবে অনেকে হয়তো ধারণা করতে পারেন, ঘর থেকে বা দূরবর্তী জায়গা থেকে অফিসের কাজ করলে উৎপাদনশীলতা কমে যাবে। তবে এ ধারণা পরিপূর্ণ ঠিক নয়। সঠিকভাবে সিস্টেম ডেভেলপ করে ব্যবস্থা নিলে উৎপাদনশীলতা কমার সম্ভাবনা নেই। আমরা এখনও ডিজিটাল জ্ঞান কাজে লাগিয়ে উচ্চ উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে পারি। ফলে আমাদের ব্যবসায় কোনও বিরূপ প্রভাব পড়বে না। আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও ইভেন্টগুলোতে সরাসরি উপস্থিত হয়ে অংশ না নেওয়ার জন্য বিকল্প খুঁজে বের করতে পারি। ইতোমধ্যে করোনাকালীন সময়ে অনলাইনে দূরবর্তী মিটিংয়ে অংশগ্রহণ, বিদেশে মিটিং ও কনফারেন্সে যোগদান সফল হয়েছে। ভবিষ্যতেও আমরা যদি এ ধারা কিছুটা হলেও অব্যাহত রাখি তাহলে আমাদের বিমান ভ্রমণও হ্রাস করে পরিবেশ দূষণ কমাতে পারি। করোনার কারণে আমরা দূরবর্তী জায়গা থেকে কাজ চালিয়ে যাবার যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, এজন্য আমরা যে অফিশিয়াল ব্যবস্থাপনা তৈরি করেছি এবং দূরবর্তী জায়গা থেকে কাজ করার একটি বিশাল কর্মী বাহিনী তৈরি করেছি তা করোনা পরবর্তীতে কাজে লাগানো যেতে পারে। এর মাধ্যমে যাতায়াতের সময় বাঁচবে। পরিবেশ দূষণ হ্রাস হবে। অর্থ সাশ্রয় হবে। এবং আমরা আরও বেশি উৎপাদনশীল হতে পারবো।
তবে সবকিছু দূরবর্তী কোনও জায়গা থেকে বা অনলাইনের মাধ্যমে সমাপ্ত করা সম্ভব নয়। আমরা পরিপূর্ণভাবে সবকিছু অনলাইনে বা দূরবর্তী জায়গা থেকে করতে বলছিও না। আমাদের যুক্তি হচ্ছে, যে সকল কাজ দূরবর্তী জায়গায় থেকে বা অনলাইনে সমাপ্ত করা সম্ভব সে সকল কাজ যদি ঐভাবে সমাপ্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করি তাহলে আমরা পরিবেশ দূষণ কমিয়ে আনতে পারবো। সামগ্রিকভাবে, করোনার শিক্ষা পরিবেশ দূষণ রোধে আমাদের জন্য একটি বড় সাফল্য নিয়ে আসতে পারে বলে আমি মনে করি।
লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
ইমেইল- kamalircu@yahoo.com

এই সংবাদটি 1,230 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ