করোনা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উত্তর দেবে কে?

প্রকাশিত: ৯:৪৯ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৬, ২০২০

করোনা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উত্তর দেবে কে?

কমিউনিটি পর্যায়ে করোনা ছড়িয়ে পড়লে লক ডাউন করে একটা দেশের কি আসলেই মুক্তি মিলবে? নাকি লকডাউন পরিবর্তী যে অর্থনৈতিক দুরাবস্তার মধ্যে পরতে হবে এবং ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত যেহেতু করোনা ঠেকানো যাবে না। মন্দা এবং করোনা দুইটা একসাথে মিলে কি বাংলাদেশের মতো দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে?

সিংগাপুর লক ডাউন করে করোনা নিয়ন্ত্রণে এনে আবার স্বাভাবিক হওয়ার উদ্যেগ নিতেই আক্রান্ত বাড়তে শুরু করেছে। এখন সিংগাপুর আবার শতভাগ লক ডাউন মুডে গিয়েছে। রাশিয়া, জাপানসহ আরো অনেক দেশে একই অবস্থা। কত দিন তবে লক ডাউন চলবে? বোঝাই যাচ্ছে ২১ দিনের যে গল্পটা বলা হচ্ছিলো তা আসলে কার্যকর নয়। সিংগাপুর, জাপান, রাশিয়া তার অন্যতম উদাহরন। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং অসচেতন দেশে এটা কি আদৌ কার্যকর হবে? কার্যকর করতে কতদিন লাগবে?

এ দেশের সরকার কতদিন লকডাউন চালাতে পারবে? বুঝাই যাচ্ছে যতো টেস্ট বাড়াবে রোগীর সংখ্যা বাড়বে। আমার মতে নতুন করে কেউ এফেক্টেড না হলেও পুরা এপ্রিল/মে জড়ে রোগীর সংখ্যা বাড়বে। যেখানে নিউইয়র্ক, লন্ডন, রোম, বার্সোলোনার মতো জায়গায় আক্রান্ত বেড়ে যাওয়ায়, তা সামলাতে হিমশিম খেয়েছে। পর্যাপ্ত ফ্যসিলিটি দিতে পারেনি। আগামী ২ মাস বাংলাদেশের কথা চিন্তা করলে হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। এমন পরিস্তিতিতে কি সরকার সাধারন ছুটি আরো বাড়াবে নাকি আরো খারাপ পরিস্থিতিতে সব খুলে দিবে? বাংলাদেশের মতো দেশে যদি ৩ মাস সব বন্ধ থাকে তবে সেই মন্দা ধাক্কা কি সরকার সামলাতে পারবে?

প্রণোদনা হিসাবে সরকার সহজ লোন ঘোষণা করেছে। সরকার বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুমোদন দিবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার করবে। বিভিন্ন ব্যাংকরা সেই সার্কুলার অনুযায়ী আবেদন করবে। বিভিন্ন ব্যাংকের লেনদেন এসেস করে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই ফান্ড বন্টন করবে। প্রাপ্ত ফান্ড থেকে ঐ ব্যাংক সকল দ্বায়িত্ব নিয়ে লোন প্রসেস করবে। যেহেতু ঐ ব্যাংকের দায় তাই সে তার সকল নিরাপত্তা পদ্ধতি অনুসরন করেই তাদের ব্রাঞ্চের মাধ্যমে সম্পর্ক ভালো এমন ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানদেরকে লোন দেবে।

আমি একজন ব্যাংকের ম্যানেজারের সাথে কথা বললাম। তাদের ঢালি বাড়ি ব্রাঞ্চ এই সাধারণ ছুটিতে বন্ধ। সেই ম্যানেজার বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সারকুলেশন এখোনো পায়নি। তিনি ব্রাঞ্চ খুললে যোগাযোগ করতে বললেন। উপরে যোগাযোগ করে জানলাম বাংলাদেশ ব্যাংক এখোনো বন্টনের প্রসেস শুরু করে নি। সাধারন ছুটি শেষ হলে তা শুরু হবে। ব্যাংকিং প্রসেসের বিন্দু মাত্র অভিজ্ঞতা থাকলে বোঝা উচিত এই পুরো প্রসেসটা খুব দ্রুত হলেও কমপক্ষে আরো তিন মাস লাগবে। তবে তা সাধারণ ছুটি শেষ হবার পরে। কিন্তু পরিস্থিতি যদি খারাপ হতে থাকে (যা অনুমেয়), তবে সাধারন ছুটি কবে শেষ হবে?

তিন-চার মাস ব্যাবসা/আয় ছাড়া এ দেশের কয়টা কোম্পানি বাঁচতে পারবে? কয়টা কোম্পানি তার কর্মীদেরকে বেতন দিতে পারবে? ২ মাস পরে কয়জন ব্যাবসায়ী নিজ ঘরের বাজার নিশ্চিত করতে পারবে? আমরা শুনছি অনেক কারখানার মালিক শ্রমিকদের অগ্রিম বেতন দিচ্ছে। অবশ্যই সাধুবাদ জানাই। কিন্তু বাস্তবে কয়টা মালিকের পক্ষে তা সম্ভব? এমন অনেক খাত আছে/কারখানা আছে যা মাস ভিত্তিতে চলে। তারা কি ৩/৪ মাস নিয়মিত করতে পারবে? বেতন না পেলে কর্মচারীরা কি নিয়মিত থাকতে পারবে? তখন যে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হবে সরকার কি তা সামলাতে পারবে?

লোন পেলেও যদি সব বন্ধ থাকে তবে একজন ব্যাবসায়ী সেই লোন কিভাবে পরিশোধ করবে? বলা হচ্ছে অন্তত দেড় বছরের আগে ভ্যাকসিন আসার কোনো সম্ভাবনা নাই। ভ্যাকসিন আসার আগে জীবন স্বাভাবিক হবে না। বর্তমান লকডাউন পরিস্থিতি আমাদেরকে একটা মহামন্দা দিকে ধাবিত করছে। লোন নিয়ে স্টাফ বেতন দিয়ে ছয় মাস টিকে থেকে নিয়ে আদৌ কি ঐ ব্যবসায়ী ব্যাবসা করে লোন শোধ করতে পারবে? আদৌ কতজন ব্যবসায়ী এই মূহুর্তে কর্মীদের বেতন দেবার জন্য নিজের সম্পত্তি বন্ধক রেখে ব্যাংক লোন নেবে? কতজন ব্যাংক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে লোন নিতে যোগ্য? কতজন ব্যাংক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে? প্রণোদনা হিসাবে ব্যাবসায়ীকে সহজ ঋণ দেওয়া কি সমাধান নাকি দেশের প্রতিটি নাগরিককে সরাসরি বেঁচে থাকতে সাহায্য করা সামাধান?

গতমাসের বেতনটা কিন্তু প্রায় সবাই পেয়েছে। তাই এই সাধারন ছুটিটা বন্ধের মতোই। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী উপভোগ করছে। কিছুটা মানসিক অস্থিরতা আছে কিন্তু মধ্যবিত্ত ভয়াবহতা এখোনো শুরু হয় নাই। তারপরও শোনা যাচ্ছে অনেক স্কুলে অভিবাবকরা সন্তানের স্কুলের বেতন দেয় নাই, অনেক বাড়িওয়ালা ভাড়া পায় নাই, অনেক কম্পানি তার কাজের বিল পায় নাই। যে বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াদের ভাড়া মওকুফ করছে সে মহান এবং তার নিশ্চয়ই সামর্থ্য আছে। কিন্তু এমন অনেক বাড়িওয়ালা আছে তার সংসার ঐ মাসের ভাড়ার টাকায় চলে, ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। সে কীভাবে চলবে? বেতন পেয়েও যারা ভাড়া দেয়নি তাদের কেউ কেউ যখন আগামী মাসে বেতন পাবে না তাদের আচরণ কি হবে? সরকারি সাহায্য চলতে হলেই বা তার আচরণ কি হবে?

আদৌ কি ৫ শতাংশ মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে লকডাউন সমাধান? নাকি ব্রিটিস, সুইডিস কিংবা ডাচদের মতো হার্ড ইমুইনিটি সমাধান? নাকি আমাদের মতো জনবহুল দেশে ভয়াবহতা সামলানো যাবে না? নাকি আমাদের গরীব দেশে মহামন্দার ভয়াবহতা হবে তার চেয়েও বেশি?

৭১-এর যুদ্ধেও ৩০ লক্ষ শহীদের বিনিময়েই স্বাধীনতা এসেছিলো। তারপরও জাতি হিসাবে আমাদের মাথা তুলে দাঁড়াতে অনেক বছর লেগেছে। কিন্তু লক্ষ মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধটা না হলে আজকে মাথা তুলে দাঁড়াবারও প্রশ্ন আসতো না।এটা যদি যুদ্ধই হয়, তবে লড়তে হবে, মরতেও হবে। করোনা ঠেকাতে গিয়ে মরে কি জয় পাওয়া যাবে, না মন্দা ঠেকাতে গিয়ে মরে জয় পাওয়া যাবে। এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •