কাজ করেছি মনে করলে একটি ভোট দেবেন

সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত ও ২০ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী গতকাল শনিবার বিকেলে তাঁর শেষ নির্বাচনী পথসভা করেছেন। বন্দরবাজার পয়েন্টে অনুষ্ঠিত শেষ পথসভায় বৃষ্টি উপেক্ষা করে বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন। দীর্ঘ প্রচার মিছিল নিয়ে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে তারা বন্দরবাজার পয়েন্টে এসে মিলিত হন। এ সময় একটি খোলা ট্রাকে দাঁড়িয়ে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আপনারা ৫ বছরের জন্য আমাকে নির্বাচিত করেছিলেন। কিন্তু, দায়িত্ব পালনের ২৭ মাসই আমাকে জেলে কাটাতে হয়েছে। মাত্র ২৩ মাস আমি কাজ করতে পেরেছি। কি করতে পেরেছি সেই বিচার আপনাদের উপর ছেড়ে দিলাম। যদি মনে করেন কাজ করেছি, তবে একটি ভোট দিবেন।’ প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র প্রার্থীর নামোল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি ১৮ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। আর আমি মাত্র ২৩ মাস দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি। কামরান দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় সিটি কর্পোরেশনে রেখে এসেছিলেন মাত্র ২ কোটি ৬ লক্ষ টাকা। আবার শুধু বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রেখে এসেছিলেন ৮ কোটি টাকা। আর আমি দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় রেখে এসেছি ৫৮ কোটি টাকা। কোর্ট পয়েন্টে এসে ওই মেয়র প্রার্থী কেঁদেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের জন্য কাজ করলে জনগণই আপনার জন্য কাঁদবে।

এর আগে বিকেল সাড়ে ৪টায় নগরীর উ”া সড়কস্থ প্রধান নির্বাচনী কার্যালয় থেকে আরিফুল হক চৌধুরীকে একটি ছাদ খোলা গাড়িতে নিয়ে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের প্রচার মিছিল বের হয়। মিছিলটি নগরীর শাহী ঈদগাহ, আম্বরখানা, চৌহাট্টা, রিকাবীবাজার, লামাবাজার, জিন্দাবাজার, জেল রোড হয়ে বন্দরবাজারে গিয়ে সভায় মিলিত হয়। আর আগে গতকাল শনিবার সকালে তিনি নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেন।

সিলেট নগরের মানুষের প্রতি অগাধ আস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, সিলেটের মানুষ যে কাউকে যেমন বুকে টেনে নিতে পারেন তেমনি আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করতে পারেন। গত ৫ বছর আমার ওপর যে অন্যায়-অবিচার করা হয়েছে এবং আমার কর্মীদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হচ্ছে-তার বিচারের ভার আমি নগরবাসীর ওপরই ছেড়ে দিলাম।’

খুলনা গাজীপুরের মতো নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে উল্লেখ করে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে অনেকেই সিলেটে এসেছেন। তিনি হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, হযরত শাহজালাল-শাহপরানের পুণ্যভূমি সিলেট নগরবাসী কোন অন্যায় করেনও না, কোন অন্যায় করতেও দেবেন না। কেউ অন্যায় করতে চাইলে এর পরিণাম ভালো হবে না। তিনি আল্লাহর ওয়াস্তে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারিদের সততার সাথে দায়িত্ব পালনের জন্য অনুরোধ জানান।

তিনি আরো বলেন, ‘কোনো ষড়যন্ত্র করে নির্বাচনকে বানচাল করা যাবে না। সিলেটের পবিত্র মাটিতে কোন চালাকির চেষ্টা করবেন না। সিলেটে যারাই অন্যায় করেছে তারাই শেষ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি।’ তিনি প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়ার আহবান জানান।

 

তিনি বলেন, সিলেট রাজনৈতিক-ধর্মীয় সম্প্রীতির শহর। কিন্তু মামলার পর মামলা দিয়ে নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। এই নগরের মানুষই আমার বড় ভরসা। ব্যালটের মাধ্যমে নগরবাসী এর সমুচিত জবাব দেবেন।’

ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে তিনি নেতাকর্মীদের সেন্টারে সেন্টারে পাহারা বসানোর নির্দেশ দিয়ে ভোট কারচুপির সুযোগ দিবেন কি না জানতে চাইলে সবাই সমস্বরে প্রতিহতের শপথ নেন। কোন সন্ত্রাসী এলে তার সাথে ভালো ব্যবহার করতে বলেন তিনি।

বেগম খালেদা জিয়া জেলে থেকেও সিলেটবাসীর কথা মনে করেন জানিয়ে তিনি বলেন, মাজার জিয়ারতে আসার পর সিলেটবাসী তাঁকে যেভাবে স্বত:স্ফূর্তভাবে সমর্থন দিয়ে ছিলো-তিনি তা সব সময় স্মরণ করেন। তিনি সিলেটবাসীর নিকট দোয়া চেয়েছেন। পথসভায় বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

 

প্রার্থীর সাথে সারাদিন

কুমারপাড়া মসজিদে ফজরের নামাজ আদায়ের মাধ্যমে শনিবারের দিনের কর্মসূচি শুরু করেন বিএনপি মনোনীত ২০ দলীয় জোটের মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর। ফজরের নামাজ শেষে তিনি মহল্লাবাসীর সাথে কুশলবিনিময় ও দেখা সাক্ষাৎ করেন। মহল্লাবাসী তাকে সমর্থনের আশ্বাস দেন এবং দোয়া করেন। ৭টার দিকে বাসায় গিয়ে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে সাড়ে ৯টার দিকে এইডেড হাইস্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক নাজমুল হোসেন চৌধুরীর লাশ দেখতে তার আগপাড়াস্থ বাসভবনে যান তিনি। সেখানে তিনি কিছু সময় অতিবাহিত করেন এবং পরিবারের সদস্যদের সান্ত¦না দেন। পরে সোয়া ১০টার দিকে তিনি আগপাড়া, মিরাবাজার, ঝেরঝেরি পাড়া এলাকায় গণসংযোগ করেন। এ সময় মানুষ তাকে স্বত:স্ফূর্ত সমর্থন জানায়। তিনি এলাকার মুরব্বীদের সাথে দেখা করে তাদের নিকট দোয়া চান। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আব্দুল মালিক চৌধুরী, মহানগর জমিয়তের সভাপতি মাওলানা খলিলুর রহমান, মহানগর খেলাফত মজলিস-এর সহ-সভাপতি আব্দুল হান্নান তাপাদার, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম সিলেট জেলার সাবেক সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এডভোকেট আশিক উদ্দিন আশুক, ১৮ নং ওয়ার্ড বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুর রহমান প্রমুখ। বেলা সাড়ে ১১টায় তিনি সেখান থেকে দরগাহ মাদরাসায় যান। দরগাহ মাদরাসায় আলেম উলামা এবং মাদরাসার ছাত্রদের সাথে মতবিনিময় সভায় যোগদান করেন। দরগাহ মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা আবুল কালাম যাকারিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন আরিফুল হক চৌধুরী। সাবেক এমপি মাওলানা এডভোকেট শাহিনূর পাশা চৌধুরীর সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, সারাজীবন তিনি আলেম ওলামার সাথে সম্পর্ক রেখে চলেছেন। তাদের অন্তর থেকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করেন এবং তাঁদের পরামর্শ নেন। এ ব্যাপারে তিনি দরগাহ মাদরাসার সাবেক মুহতামীম মরহুম মাওলানা আকবর আলী (রহঃ) এর সাথে তাঁর জীবনের নানা ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি সকলের নিকট দোয়া চান। মতবিনিময় সভায় আরিফুল হক চৌধুরীর জন্য দোয়া করেন মাদরাসার মুহাদ্দিস মুহিব্বুল হক গাছবাড়ী।

পরে দুপুর সাড়ে ১২টায় আরিফুল হক চৌধুরী জিন্দাবাজারস্থ টিভি চ্যানেল নিউজ ২৪ এর প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। সেখানে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরানসহ আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সেখান থেকে বেলা দেড়টায় তিনি বাসায় যান। বাসায় গিয়ে তিনি কিছু সময় বিশ্রাম ও পরিবারের সদস্যদের খোঁজ-খবর নেন। বিকেল পৌনে ৪টায় তিনি ঘর থেকে বের হয়ে ৪টায় উচা সড়কস্থ মিতা কমিউনিটি সেন্টারে তাঁর প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে যান। সেখানে আগে থেকেই বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী জড়ো হন। তিনি যাওয়ার পরপরই স্লোগান স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে পুরো এলাকা। ভিতরে গিয়ে তিনি বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতাদের সাথে সংক্ষিপ্ত বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে শান্তিপূর্ণ ভাবে প্রচার মিছিলে অংশ নিতে বলেন এবং সবাইকে মোটরসাইকেল-গাড়ি রেখে পাঁয়ে হেঁটে অংশ নিতে বলেন। তিনি একটি ছাদ খোলা গাড়িতে উঠলে বিকেল সাড়ে ৪টায় নির্বাচনী কার্যালয় থেকে মিছিল শুরু হয়। বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী ‘ধানের শীষ’ ‘ধানের শীষ’ স্লোগানের প্রকম্পিত করে তোলে পুরো এলাকা। মিছিলটি যতই এগিয়ে যাচ্ছিলো ততই মিছিলের আকার বাড়তে থাকে। বিকেল ৫টায় মিছিল আম্বরখানা পয়েন্টে পৌঁছে। সেখানে পথসভার কথা থকলেও বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতির ওই এলাকায় যান চলাচল অনেকটা স্তব্ধ হয়ে পড়ে। পরে পথচারীদের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে আরিফুল হক চৌধুরী সেখানে পথসভা না করে মিছিলকারীদের এগিয়ে যেতে বলেন। পুরো সময় সড়কের দুই পাশে এবং বিভিন্ন ভবন থেকে উৎসুক মানুষ মিছিলটি দেখতে থাকে। ব্যবসায়ীরা দোকানের বাইরে এসে মিছিলকে অভিনন্দন জানায়। চৌহাট্টা পয়েন্ট ঘুরে সাড়ে ৫টার দিকে মিছিল গিয়ে পৌঁছায় রিকাবীবাজার পয়েন্টে। সেখানেও পথসভার কথা থাকলেও জনদুর্ভোগের কথা চিন্তা করে মিছিলকারীদের এগিয়ে যেতে বলেন আরিফুল হক চৌধুরী। পরে লামাবাজার পয়েন্ট হয়ে মিছিল জিন্দাবাজারের পথ ধরে। এ সময় শুরু হয় বৃষ্টি। নেতাকর্মীরা বৃষ্টির মধ্যেই মিছিল নিয়ে এগিয়ে যায়। জিন্দাবাজার পয়েন্টে এলে সড়কের দুই পাশ থেকে মানুষ তাকে অভিনন্দন জানান। মিছিলটি জিন্দাবাজার পয়েন্ট অতিক্রম করার পর মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টির মধ্যেই নেতাকর্মীরা মেয়র প্রার্থীর সাথে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যায়। মিছিলটি জেল রোড পয়েন্টে গিয়ে ডানে মোড় নিয়ে জেল রোডে হয়ে বন্দরবাজারের পথ ধরে। বিকেল ৬টারদিকে মিছিলটি বন্দরবাজার হয়ে আবারো বামে মোড় নিয়ে শিশুপার্ক ঘুরে আবারো বন্দরবাজার অভিমুখে যাত্রা করে। বিকেল সাড়ে ৬টার দিকে মিছিলটি বন্দর পয়েন্টে সমাবেশে মিলিত হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে দেয়া বক্তব্যে আরিফুল হক চৌধুরী নগরবাসীর প্রতি তার অগাধ আস্থার কথা উল্লেখ করে

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.