কালের সাক্ষি কুড়িগ্রামের সোনাহাট প্রাচীন কালী মন্দির

হুমায়ুন কবির সূর্য্য, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ঃ ১৮/০৯/১৬
কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট কালীমন্দিরের রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্য। এর নির্মাণ ইতিহাস এখনো সবার অজানা। তবে জনশ্রুতি রয়েছে আজ থেকে প্রায় দুশো বছর পূর্বে শ্রী ভিকিম চান্দ এই কালী মন্দিরটি নির্মাণ করেন। তখন এই এলাকাটি ছিল ২৪ পরগনাধীন গয়বাড়ী এলাকা। শ্রী ভিকিম চান্দ ছিলেন একজন জোতদার ও বণিক। তিনি স্বপ্নদ্রষ্ট হয়ে মা কালীর নির্দেশনায় মন্দিরটি নির্মান করেন। বানুরকুটি মৌজায় নির্মিত কালী মন্দিরটি’র জন্য তিনি ১ একর ৪২ শতক জমি দেবোত্তর হিসেবে দান করেন। বর্তমানে এটি সোনাহাট বিজিবি ক্যাম্প ও ভারতের বিএসএফ ক্যাম্পের মধ্যবর্তী আন্তর্জাতিক পিলার ১০০৮ এর মধ্যে রয়েছে। তবে আশংকার বিষয় হল মন্দিরের জায়গা বেদখল হয়ে গেছে! এখন মাত্র ৮ শতাংশ জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। বাকী জমি বিভিন্ন জন জোরপূর্বক ভোগদখল করছে। ইতিহাসের সাক্ষি এই কালী মন্দিরটির অবস্থা এখন ভগ্নপ্রায়।
জানা যায়, বৃটিশ আমলে ভারত উপমহাদেশের বাংলা-আসাম রাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন স্থান হিসাবে বিবেচিত ছিল সোনাহাট প্রাচীন কালী মন্দিরটি। এটিকে ঘিরেই গড়ে উঠে সোনাহাট বন্দর, প্রশাসনের বিভিন্ন অফিস-আদালত ও ব্যবসা কেন্দ্র। ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে এখানে প্রতিষ্ঠা পায় বৃটিশ ভারতের সামরিক ও ব্যবসায়িক দিক দিয়ে গুরুত্বপুর্ন প্রসিদ্ধ সোনাহাট রেলওয়ে ষ্টেশন।
কালক্রমে এই অঞ্চলের তীর্থস্থান হিসাবে বিবেচিত হয় সোনাহাট কালী মন্দিরটি। দেবোত্তর সম্পত্তির আয় দিয়ে পরিচালিত হতো সকল কর্মকান্ড। পুজারী-তীর্থযাত্রীরদের খরচও মেটানো হতো মন্দিরের উৎসে। দুরবর্তী তীর্থযাত্রীদের জন্য ছিল থাকার ব্যবস্থা। অসহায় দুঃস্থ দরিদ্রদের পেটপুজোর জন্য ছিল লঙ্গরখানা। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২রা বৈশাখ শ্রী কিস্তর চান্দ ওশোয়াল এবং ব্রজলাল ওশোয়াল এলাকার মানুষের সুপেয় জলের সংকটের কথা বিবেচনা করে ৫টি গভীর ইদারা খনন করেন। যা ইদারার গায়ে খোদাই করা আছে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সোনাহাট অঞ্চলটি দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এর একটি অংশ বাংলাদেশে এবং অপর অংশটি ভারতের সীমানায় চলে যায়। এসময় বেশিরভাগ হিন্দু পরিবার পাড়ি জমান ভারতীয় অংশে। ফলে কালি মন্দিরটি তার ঐহিত্য হারাতে থকে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের অংশের ৪টি ইদারা ধ্বংস করে স্থানীয় দখলবাজরা। অপর পরিত্যক্ত ইদারাটি ভারতীয় সীমান্তের অভ্যন্তরে মন্দির থেকে ১০০ গজ দুরে ঝোপঝাড়ে আচ্ছাদিত অবস্থায় রয়েছে।
এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ ও মন্দিরের সেবক শ্রী সুবল চন্দ্র জানান, বহুকাল পুর্ব থেকেই এই মন্দিরের অধিষ্ঠাতা দেবীকে জাগ্রত ভদ্রাকালী হিসাবে লোকজন বিশ্বাস করে আসছে। এখানে কালীপুজায় পাঠা বলি দেয়ার নিয়ম থাকলেও এই মন্দিরের অধিষ্ঠা দেবীকালী কোন বলি গ্রহন করেন না। তারপরও মানুষ মনোবাসনা পুরণের জন্য কালী মন্দিরে কবুতর, ছাগল, ভেড়ার পাঠা, টাকা-পয়সা দেয়। এছাড়াও অসুখে বিসুখে তার নিকট রোগমুক্তির কামনায় দুর-দুরান্ত থেকে লোকজন এই কালী মন্দিরে ভীড় জমায়। এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে বলে লোকজন আজও বিশ্বাস করে। স্থানীয়রা জানায়, কালীমন্দিরে আজও বাস করে একজোড়া নাগ-নাগিনী। অনেক বয়োবৃদ্ধদের চোখে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। দর্শনার্থীরা ভোগ হিসাবে দুধকলা দিলে জাগ্রত কালী নাগ-নাগিনীর রুপ ধরে খেয়ে যায় বলে জানান। তবে আশ্চর্যের বিষয় এই নাগ-নাগিনী রুপী কালী কাউকে কোনদিন দংশন করেনি বা ক্ষতি করেনি। কথিত আছে বৃটিশদের ভারত থেকে বিতাড়িত করতে এই সোনাহাট বন্দর দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে বৃটিশ সৈন্য বহরের ট্রেন এবং কালীমাতার অভিশাপে তারা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দেশ ত্যাগে বাধ্য হন। প্রায় ২শত বছর পুর্বে নিমিত মন্দিরটি শুধু মাত্র পুজার্চনার জন্যই ব্যবহৃত হয়নি। মন্দিরে পুজার্চনার পাশাপাশি মানুষের সেবার জন্য তখন আয়ুবের্দিক ভেষজ কবিরাজী চিকিৎসা দেয়া হত।
মন্দিরের সেবক শ্রী সুবল চন্দ্র বংশ পরম্পরায় জরাগ্রস্থ মানুষের মাঝে বিনামুল্যে কবিরাজী চিকিৎসা দিয়ে মানুষের সেবা দিয়ে আসছেন। সুবল চন্দ্রের মাতা স্বর্গীয় চম্পক লতা ২০০৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর ১০৫ বছর বয়সে ইহধাম ত্যাগ করে । তিনি আজীবন এই মন্দিরের সেবকের দায়িত্ব পালনসহ বিনামুল্যে মানুষের সেবা করে গেছেন। এই মন্দির প্রতিষ্ঠার পর ভারতের বিখ্যাত পুরোহিত ও তান্ত্রিক বিশেষজ্ঞ বিরাজ মোহন গাঙ্গুলী ছিলেন এর অন্যতম পুরোহিত। এই পুরোহিত বংশের সর্বশেষ পুরোহিত ছিলেন স্বগীয় সুনীল ঠাকুর গাঙ্গুলী যিনি আজ থেকে ৩৩ বছর পুর্বে ইহধাম ত্যাগ করেছেন। সুনীল কুমার গাঙ্গুলীর ইহধাম ত্যাগের পর আর কেউ নিয়মিত পুরোহিতের দায়িত্ব কাধে নিতে এগিয়ে আসেনি। এরপর থেকে শুধুমাত্র কার্তিক মাসের অমাবশ্যা তিথিতে কালী পুজার সময় চুক্তিভিক্তিক পুরোহিত দিয়ে পুজার্চনা করা হয়। বর্তমানে নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা বাজারের শ্রী কার্তিক ব্যানার্জী ও তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা শ্রী কৃষ্ণ ঠাকুর পুজার সময় পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করে আসছে।
এক সময়ের অসংখ্য হিন্দু জনপদ পরিবেষ্টিত এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে বার মাসে তের পুজা লেগে থাকতো। পুজা, হরিসভা, সংকীর্তন ইত্যাদির সরগরমে জমে উঠতো মেলা। দুরদুরান্ত থেকে আগত তীর্থযাত্রী পুজারীদের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠেছিল এই মন্দির প্রাঙ্গন। মন্দির প্রাঙ্গনে চলত বেচাকেনার ধুম। জমে উঠত খেলাধুলা। আবহমানকালের বাঙ্গালী ঐতিহ্যের ধারক বাহক হিসাবে যাত্রা পালা, কুষান যাত্রা, কবিয়াল গান মন্দির প্রাঙ্গনে চলত দিনের পর দিন। আর মেলা পার্বনে সকল ধর্ম বর্নের লোকজন স্বতঃফুর্ত অংশগ্রহন করতো। শুধু তাই নয় মন্দিরের সন্নিকটে ভারতে ছিল গৌরীপুর জমিদারের এবং বাংলার সীমানায় ছিল মহারাজা শ্রীশচন্দ্র নন্দীর জনগণের চিত্তবিনোদনের জন্য দুটি সিনেমা হল। এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের সুতিকাগার হিসাবে খ্যাত সোনাহাট কালী মন্দিরটির সকল জৌলুস ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর পাকিস্তান ও ভারতের নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হলে ঐতিহাসিক সোনাহাট বন্দর ও রেলওয়ে জংশন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। সোনাহাট বন্দরটি ভারতের আসাম রাজ্যের মধ্যে সীমান্ত এলাকায় পড়ার ফলে তা পরিত্যক্ত হয়। আর মন্দিরটি সীমান্তের ১০ গজ তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে পড়ে। তখন সোনাহাট বন্দরটির নাম ঠিক রেখে সীমান্ত থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দুরে সোনাহাট নামে বাজার চালু হয়। দেশ বিভাগের সময় সম্ভ্রান্ত মাড়োয়ারী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ভারতে পাড়ি জমায় ফলে পুজার্চনা বন্ধ হয়ে কালের আবর্তে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে সোনাহাট কালী মন্দির। পাকিস্তান আমলে নানা প্রতিকুলতার মধ্যেও সোনাহাটে প্রভাবশালী সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মধ্যে মরহুম আব্দুর রহিম মন্ডল, কুড়িগ্রাম জেলার সাবেক গভর্ণর মরহুম শামসুল হক চৌধুরী, তৎকালীন পাইকেরছড়া ও সোনাহাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মরহুম ফয়েজউদ্দিন মন্ডল ও স্থানীয় অনেক মুসলিম পরিবারের ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠায় রয়ে যাওয়া হিন্দু পরিবার আবারও কোন রকমে পুজার্চনা শুরু করে সেই সোনাহাট কালী মন্দিরে। ১৯৭১ সালে আবারও পাকহানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মন্দিরের সেবকের দায়িত্ব থাকা পরিবার ব্যতীত সকলেই ভারতে চলে যায়। আর জৌলুস হারিয়ে ফেলে সোনাহাট কালী মন্দিরটি। পুর্বে বিভিন্ন নক্সা ও টেরাকাটা নক্সা করা মন্দিরটি কালের অতলে ধ্বংস প্রাপ্ত হলেও টাকার অভাবে মন্দিরের সেবকের দায়িত্বে থাকা পরিবারটি নতুন করে মন্দির করতে না পেয়ে ঐ স্থানে টিনের ছাপড়া তুলে সেখানে প্রতিবছর শুধুমাত্র কালী পুজা করে। বর্তমানে ৯ হাত দৈর্ঘ্য ও ৬ হাত প্রস্থ টিনশেড ও হাফওয়াল বিশিষ্ট মন্দির নির্মান করা হয়েছে। যাতে এখন বার্ষিক কালী পুজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কখনও বা দুর্গা পুজাও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
কালের বিবর্তনে আজ প্রায় হারিয়ে গেছে অত্র অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এই মন্দির ও মন্দির কেন্দ্রিক সবধরনের কর্মকান্ড। সম্প্রতি বাংলাদেশ ভারতের ১৮তম সোনাহাট স্থলবন্দর চালু হওয়ায় সোনাহাট তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেলেও সোনাহাট কালী মন্দিরটির ঐতিহ্য এখনও ফিরে আসেনি। এখনও মন্দিরের সেবক শ্রী সুবল চন্দ্র জানান, প্রতিবছর কার্তিক মাসের অমাবশ্যায় কালী মন্দিরে পুজা অনুষ্ঠিত হলে বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক হিন্দুরা প্রসাদ গ্রহন করতে আসেন আর কালীমাতার আশির্বাদ নিতে চলে আসে রাষ্ট্র পৃথক হলেও কালী মাতার আশির্বাদ নিতে তাদের কোন নিয়মই পৃথক করতে পারেনি। সরকারীভাবে মন্দিরটি রক্ষার জন্য ব্যবস্থা নিলে উত্তর ধরলার যত প্রাচীন নিদর্শন আছে তার মধ্যে সোনাজাট কালীমন্দিরের ইতিহাস কম গুরুত্বপুর্ন নয়। এলাকার ইতিহাস ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে সোনাহাট কালীমন্দিরটির নামে বেদখলকৃত সম্পত্তি সরকারীভাবে উদ্ধার করে মন্দির নির্মান করলে প্রতিবছর স্থানীয় মাদাইখাল কালী মন্দিরের ন্যায় আবারও পুজার্চনার আয়োজন করলে সারা বাংলাদেশসহ ভারতের তীর্থযাত্রী পুণ্যার্থীর আগমন ঘটবে এবং সরকার প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ টাকা রাজস্ব আদায় করতে পারবে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করে।
এ ব্যাপারে ভুরুঙ্গমারী উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুন্নবী চৌধুরীর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, সোনাহাট কালী মন্দিরটি আত প্রাচীন মন্দির, বৃটিশ ও তার পুর্বে এই মন্দিরটি খুব জাগ্রত ছিল বলে আমি আমার বাবা মা ও দাদা-দাদীর কাছে অনেক গল্প শুনেছি। বর্তমানে পুরাতন সোনাহাট স্থলবন্দর চালু হওয়ার পর সোনাহাটে উন্নয়নের ছোয়া লেগেছে। মন্দিরটির রক্ষনাবেক্ষনের জন্য একটি মাত্র হিন্দু পরিবার থাকলেও মন্দির কমিটি না থাকার কারণে সরকারী সাহায্য সহযোগীতা ঠিকমত করা হয়নি। তবে মন্দির কমিটি গঠিত হলে এবং তারা আবেদন করলে আমি উপজেলা চেয়ারম্যান হিসাবে যথা সাধ্য সাহায্য করবো। আমিও চাই এই প্রাচীন কালী মন্দিরটি টিকে থাক ভবিষ্যত প্রজন্ম জানতে পারবে এই এলাকার প্রাচীন ইতিহাস।
সোনাহাটের অতীত ঐতিহ্য শুধুমাত্র ইতিহাস পিপাসুদের নয়; সাধারণ মানুষের মনকেও নাড়া দেওয়ার মতো। যে কালী মন্দিরটি সারাক্ষণ ভক্তদের আনাগোনায় ভরপুর ছিল। উৎসবে উৎসবে জমজমাট ছিল। আলোর ঝলকানিতে মূখরিত থাকতো চারদিক। তা আজ কালের গর্ভে মলিন হয়ে গেছে। লোকজনের কাছে রুপকথার খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলাকার ইতিহাস ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে সরকারের উচিৎ সোনাহাট কালী মন্দিরটির নামে জবরদখলকৃত সম্পত্তি উদ্ধার করে এটির নতুন অবয়ব সৃষ্টি করা। যা শত বছরের সনাতন হিন্দু ধর্মের ইতিহাসকে সামনে টেনে আনবে। আর বাংলাদেশ-ভারতের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মপালনে মিলন মেলার আবির্ভাব ঘটাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.