Sun. Sep 15th, 2019

BANGLANEWSUS.COM

-ONLINE PORTAL

কাশ্মীর ইস্যুতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতার অর্থ কী

1 min read
সাদিক শাবান
দুরূহ কাশ্মীর সংকট সমাধানে তিনি মধ্যস্থতা করতে চান- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বোমা বিস্ফোরণ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক টানাপোড়েনের একটি অবস্থা তৈরি করে দিয়েছে, যাতে বিশ্বের একক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ানো হয়েছে। যদিও দুই পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিবেশীর বহু বছর ধরে জিইয়ে থাকা সংঘর্ষটিতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতা করার আগ্রহ অনেককে আশান্বিত করেছে; কিন্তু এ বিষয়ে ভারত মনে হচ্ছে খুব কমই আগ্রহী। কাশ্মীর ইস্যুতে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের ভারতের বিরোধিতার অনেক ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে, সেগুলো আমরা পরে আলোচনা করব।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ওভাল অফিসে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে বহু প্রচারিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প কাশ্মীর ইস্যুতে শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়ে বোমা ফাটান, যে ইস্যুটি ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে পীড়াদায়ক হয়ে রয়েছে। ট্রাম্প ওই সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘যদি আমি সহায়তা করতে পারি, আমি চাইব একজন মধ্যস্থতাকারী হতে। যদি সহায়তা করার মতো কোনোকিছু আমার করার থাকে, তবে আমাকে জানান।’
১৯৪৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে তিনটি যুদ্ধ হয়েছে, তার মধ্যে দুটিই ছিল এ কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে। ট্রাম্প বলেন, ‘‘আমি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ছিলাম দুই সপ্তাহ আগে (জাপানের ওসাকায় জি-২০ সম্মেলনের সাইডলাইনে) এবং আমরা এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি এবং তিনি প্রকৃতপক্ষে বলেন, ‘আপনি কি একজন মধ্যস্থতাকারী বা সালিশ হতে চান’, আমি বলি ‘কোথায়’, তিনি বলেন, ‘কাশ্মীর’।”
কাশ্মীর ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের পরিবর্তন লক্ষ করে ইমরান খান দ্রুত সাড়া দিয়ে বলেন, ‘যদি আপনি মধ্যস্থতা করতে পারেন ও পরিস্থিতির সমাধান করতে পারেন, তবে ১০০ কোটির বেশি মানুষের প্রার্থনা থাকবে আপনার সঙ্গে।’
তবে সংবাদ সম্মেলনটির পরপরই দ্রুত ভারতের যে জবাব এসেছে, তা অনেকটা প্রত্যাশিত লাইনেই ছিল। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাবিশ কুমার ট্রাম্পের বিবৃতির বিরোধিতা করেন। তিনি বলেছেন, ‘এ ধরনের কোনো অনুরোধ করা হয়নি’ মোদি কর্তৃক।
তৃতীয়পক্ষের মধ্যস্থতার ইতিহাস : কাশ্মীর সমস্যা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার প্রস্তাব নতুন নয়। এ ধরনের পূর্ব নজির অনেক আছে, যখন ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের মধ্যকার বিভিন্ন ইস্যু সমাধানে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের অনুমোদন দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতি- উভয় ক্ষেত্রেই মধ্যস্থতার অর্থ হল নিরপেক্ষ কোনো দেশের অন্য জাতির সঙ্গে বিবাদের ক্ষেত্রে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপ’। এতে উদ্দেশ্য থাকে নিজের প্রভাব ব্যবহার করে ‘তাদের সমস্যাগুলোর সমাধান’ করে দেয়া। যদি আমরা ভারত-পাকিস্তান বিবাদের দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যায় অতীতে এ ধরনের মধ্যস্থতা বা সালিশের মাধ্যমে কয়েকটি ক্ষেত্রে লাভবান হওয়া গেছে।
উদাহরণস্বরূপ, উভয় দেশ তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার সুযোগে সিন্ধু নদীর পানি বণ্টন বিতর্কে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পেরেছে এবং রান অফ কুচ চুক্তির মধ্যস্থতায় পৌঁছাতে পেরেছে। যেখানে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় সিন্ধুর পানি বণ্টন চুক্তি হয়েছে (এতে করে সিন্ধু নদী বিদ্যমান পানি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভাগাভাগির দিকে দুই দেশকে নিয়ে যাওয়া হয়), সেখানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসনের মধ্যস্থতায় মুখোমুখি অবস্থানকারী দেশ দুটির মধ্যে বৈরিতা পরিহার করা ও বিতর্ক শেষ করার জন্য একটি ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়।
উভয় ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তান তৃতীয় পক্ষের ভালো দিকগুলো ব্যবহার করেছে, যার ফল হিসেবে চুক্তিগুলো করা সম্ভব হয়েছে এবং তা সময়ের পরীক্ষায় উতরে গেছে। একইভাবে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা ভারত ও পাকিস্তান উভয়কে অপরের এলাকা থেকে নিজেদের বাহিনী সরিয়ে নেয়ার পথ দেখিয়েছে (যেটি ছিল সামরিক বাহিনী ব্যবহারের আগের সীমানা)। এছাড়া ভবিষ্যতের সব বিষয়ে আলোচনার ঐকমত্যও হয়েছে। এটি ছিল উজবেকিস্তানে তাসখন্দ চুক্তি স্বাক্ষরের পরের ঘটনা।
তাহলে কাশ্মীরের বেলায় কী? সীমান্তজুড়ে জাতীয়তবাদের উচ্চমাত্রার অনুভূতি বিবেচনায় নিয়ে সমালোচকরা বিতর্ক করতে পারেন যে, কাশ্মীর ইস্যুকে সিন্ধুর পানি বণ্টন চুক্তি বা রান অব কুচ চুক্তি অথবা ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে মধ্যস্থতার চুক্তির সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। উদাহরণস্বরূপ, ভারত যুক্তি দেয়, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি থেকে মধ্যস্থতা ভালো কাজ করতে পারে এমন কোনো সুযোগ নেই। যেমন- ১৯৭২ সালের সিমলা চুক্তি, যার প্রতি উভয়পক্ষ সম্মান দেখানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। তবে তিক্ত সত্য হল, সিমলা চুক্তি দৃশ্যমানভাবে ভঙ্গ করা হয়েছে এবং এরপর সীমিত পর্যায়ে হলেও ১৯৯৯ সালে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে কারগিল যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে।
ভারতের অবস্থান অনুযায়ী, কাশ্মীর অভ্যন্তরীণ একটি সমস্যা হিসেবে থেকে গেছে। দেশটির এ সংক্রান্ত নীতির ক্ষেত্রে যে বিষয়টি কাজ করে থাকতে পারে তা হল, তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার (আপাতত যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় পক্ষ) ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এর পরাশক্তির ক্ষমতা ব্যবহার করে কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে এমন কিছু আরোপ করতে পারে, যা ভারতের বিবৃত অবস্থানের বিপরীতে যাবে। এ ধরনের উদ্বেগ একেবারেই ভিত্তিহীন নয়। কাশ্মীর ইস্যুতে জাতিসংঘ প্রস্তাবগুলো ঐতিহাসিকভাবে ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে বিব্রতকর হয়ে পড়েছিল, যা এ ইস্যুতে দ্বিপাক্ষিক সমাধানের ওপর জোর দেয়। স্পষ্টত, নয়াদিল্লি চায় না পররাষ্ট্রনীতির এমন কোনো নজির স্থাপন করতে, যাতে করে কাশ্মীরের ওপর আন্তর্জাতিক কোনো ধরনের হস্তক্ষেপকে সহজতর করার সুযোগ তৈরি হয়।
সমস্যার সমাধান : কাশ্মীর সমস্যা প্রায় ৭০ বছর ধরে চলমান। একে কেন্দ্র করে অনেকগুলো যুদ্ধ হয়েছে এবং পাকিস্তান-ভারত উভয় দিকের সীমান্তজুড়ে প্রচুর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। উভয় দেশই পারমাণবিক শক্তিধর এবং কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ছোটখাটো দাঙ্গা বড় ধরনের যুদ্ধের আকার ধারণ করতে পারে। যেমনটি প্রত্যক্ষ করা গেছে অতি সাম্প্রতিক বালাকোট হামলার সময়। ট্রাম্পের ভাষায় ‘সুন্দর নাম’, ‘সুন্দর স্থান’ কাশ্মীরে যে দুঃখজনক ও ভোগান্তির ঘটনা ঘটে চলেছে- এক কথায় তা তীব্র।
এ ইস্যুকে আরও দীর্ঘায়িত করা হবে বিয়োগাত্নক। ভারত ও পাকিস্তানের জন্য কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করে ফেলার এটাই উপযুক্ত সময়। যদি তারা নিজেদের মধ্যে যে কোনোভাবে কোনো অনাস্থা-অবিশ্বাস খুঁজে পায়, যা আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে, তবে তারা নিরপেক্ষ কোনো খেলোয়াড়ের সহায়তা নিতে পারে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও হস্তক্ষেপ না করার মূলনীতি নির্দেশনা দেয় যে, মধ্যস্থতার প্রয়োজন হয়, আরোপ করা হয় না। এটি হতে পারে উপকারী, অদমনমূলক এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। আমাদের হাতে এর ঐতিহাসিক নজির আছে।
Copyright © Banglanewsus.com All rights reserved. | Developed By by Positive it USA.

Developed By Positive itUSA