কুমিল্লায় কবি নজরুল প্রেম-পরিণয় কাব্যচর্চা ও গ্রেফতারী

প্রকাশিত:মঙ্গলবার, ০৯ আগ ২০১৬ ১২:০৮

Pic-4

ইয়াসমীন রীমা,০৯আগষ্ট,কুমিল্লা
কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় যথেষ্টবার ভ্রমনের মধ্যে কুমিল্লার ভ্রমনটি ছিলো অত্যন্ত জরুরি। কুমিল্লা না এলে হয়তো নজরুলের জীবনধারা প্রবাহিত হতো অন্যখাতে। নজরুল জীবনের বেচিত্র্য ও বহুমুখী ধারার উম্মেষ পর্ব কুমিল্লা। কুমিল্লা থেকেই নজরুলের নতুনধারা তৈরি হয়,অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রটি প্রসারিত হয়। দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তার ঘটে ব্যাপক,উপলদ্ধির নবতর ধারায় ঋদ্ধ হন কুমিল্লাতে। কুমিল্লা ও কুমিল্লার দৌলতপুর নজরুল জীবনে অপরিহার্য অংশ। নজরুলকে প্রভাবিত করেছে কুমিল্লা কুমিল্লার মানুষ ,ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য,প্রকৃতি পরিবেশ সামাজিক,সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা এবং চলমান ঘটনা প্রবাহ কবির মানস গঠনে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। নজরুল যখন কুমিল্লায় আসেন কবি হিসাবে তাঁর ব্যাপক খ্যাতি না থাকলেও জনপ্রিয় ছিলেন। তবে এভাবে যদি বিশ্লেষন করা যায় কুমিল্লা কবি নজরুলের সাহিত্য জীবনের উত্থান পর্ব,রাজনৈতিক জীবনের সূচনা পর্ব,সঙ্গীত জীবনের বিকশিত হওয়ার সাফল্যর অধ্যায়।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কুমিল্লায় এসেছিলেন তার দুরন্ত যৌবনকালে। কবি কুমিল্লায় এসেছিলেন ১৩২৭ বাংলা সালের চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহে। ১৯২১ সালের এপ্রিল থেকে ১৯২৪সালের জানুয়ারি পর্যন্ত, এই সময়ে কবি কুমিল্লা এসেছিলেন পাঁচবার। কুমিল্লায় কবির ঐতিহাসিক ও বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। প্রেম প্রেম থেকে বিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ দ্বিতীয় বিয়ে দু‘দুবার গ্রেফতার ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে আন্দোলনসহ অনেক ঘটনার নীরব সাক্ষী এ কুমিল্লা জেলা। জেলার মুরাদনগর উপজেলার ঐতিহাসিক দৌলতপুর পল্লীর নিভৃত মোহমায়ায় জড়িয়ে দৌলতপুরে বসে বসে কবি অনেক গান ও কবিতা রচনা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ছিলো পাপড়ীখেলা, হারমানা হার বেলা অবেলা মানসবধু বেদনা অভিমান প্রিয়া মুকুলের উদ্ভোধন ইত্যাদি।

কবির কুমিল্লায় আগমন ও দৌলতপুর উপাখ্যান
বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধুপ্রতিম আলী আকবর খাঁর আমন্ত্রণে কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম আসেন কুমিল্লায় ১৯২১সালের এপ্রিল মাসে বাংলা ছিলো ২২চৈত্র ১৩২৭সালে। কবি তার বন্ধুর সঙ্গে কলকাতা থেকে কুমিল্লায় এসে আলী আকবর খানের বন্ধু ধীরেন্দ্র সেনের পিতা ইন্দ্রকুমার সেনের কান্দিরপাড়স্থ বাসায় ওঠেন। এখান থেকে শুরু হয় কুমিল্লায় কবির স্মৃতিময় ,মধুময় ও আনন্দঘন ঘটনাপ্রবাহ। কবি নজরুল কুমিল্লায় কান্দিরপাড়ে ৩-৪দিন থাকার পর বন্ধু আলী আকবর খানের সঙ্গে চলে যান মুরাদনগরের দৌলতপুরে। সুতরাং এটা বলা যায় নজরুলের উৎসাহ ও উদ্দীপনার ক্ষেত্রটি প্রথম তৈরি হয়েছিল এ দৌলতপুরেই। বিশেষ যতœ ও সম্মানের কারণে নজরুল ছিলেন দৌলতপুর খাঁন বাড়ির বিশেষ অতিথি। তাই উদ্দীপিত তরুণ নজরুলের অবস্থান ও ছিল উচ্ছল ও আনন্দময়। দৌলতপুরে নজরুলের গান লেখা,কবিতা,লেখা,গান গাওয়া ,সাঁতার কাটা,ঘুরে বেড়ানো,সবুজ প্রকৃতির হাতছানি,গ্রাম্যগায়কদের সখ্যতা,সবকিছু মিলিয়ে দৌলতপুরে নজরুল অন্যরকম জীবনের স্বাদ অনুভব করেন। দৌলতপুর বালিকা বিদ্যালয়ের বার্ষিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে কবি রচনা করেন ‘মুকুলের উদ্ধোধন’ নার্গিসের ভাই মুন্সী আবদুল জব্বারের বিয়ে উপলক্ষে রচনা করেন ‘লাল সালাম’ নামে দুটি কবিতা। কোন অনুষ্ঠান উপলক্ষে এ দুটি কবিতাই কবির প্রথম রচনা।

দৌলতপুরে কবির প্রেম,বিয়ে ও বিচ্ছেদ
দৌলতপুরে কবি ছিলেন দু‘মাসেরও অধিক সময়। এ-সময়ে আলী আকবর খাঁর বোনের মেয়ে সৈয়দা খাতুনের (জ-১৯০৫,মৃ-১৯৮৫) সঙ্গে নজরুলের প্রেমের সর্ম্পক গড়ে ওঠে। নজরুল খাঁর বাড়িতে আসর পর থেকে আলী আকবর খাঁর সবছেয়ে বড়ো বোন মুন্সী বাড়ির বউ আসমতুননেসা ও তাঁর মেয়ে সৈয়দা খাতুনের খাঁ বাড়িতে বেশি যাতায়াত শুরু হয়। সৈয়দা খাতুনের নাম দেন নজরুল নার্গিস আসর খানম। নার্গিসকে নিয়ে নজরুল প্রথম কবিতার পাপড়ি খোলা “রেশমি চুড়ির শিঞ্জিনীতে রিমঝিমিয়ে মরম কথা/পথের মাঝে চমকে কে গো থমকে যায় ঐ শরম নতা” সবুজ নিসর্গ আর গ্রামের সরল সাধারন কৃষিজীবি মানুষ কবিকে নাড়া দিয়েছিল।
কবির কুমিল্লায় দ্বিতীয়বার আগমন এবং গ্রেফতার
১৯২১ সালের নভেম্বরে কবি পুনারায় কুমিল্লায় আসেন। অবস্থান গ্রহন করেন শহরের কান্দিরপাড়ে ইন্দ্রকুমার সেনের বাড়িতে। এ সময় প্রিন্স অব অয়েলস এর আগমন উপলক্ষ্যে ২১ নভেম্বর পুরো ভারতবর্ষব্যাপী হরতাল আহবান করা হয়। কবি সেদিন গলায় হারমেনিয়াম ঝূলিয়ে ছেলেমেয়েদের সাথে নিয়ে গান গেয়ে শহর প্রদক্ষিণ করেন। অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাপে কুমিল্লা শহরেও বিভিন্ন কর্মসূচি। এ কর্মকোলাহলে নজরুলও সংপৃক্ত হয়ে পড়েন। কংগ্রেস আহুত হরতালের সমর্থনে নজরুল ‘জাগরণী’গানটি গেয়ে মিছিল করেছিলেন-
“ভিক্ষা দাও ভিক্ষা দাও
ভিক্ষা দাও গো পুরবাসি
সন্তান দ্বারে উপবাসি
দাও মানবতা ভিক্ষা দাও”
এ প্রসঙ্গে পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে নজরুল গ্রেফতার হয়েছিলেন। কুমিল্লা কোতোয়ালী থানার কাছে রাজগঞ্জ থেকেই কবিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল,গ্রেফতার করেন দারোগা তোরাব আলী।
তৃতীয়বার আগমন এবং প্রমীলার সঙ্গে প্রেম
১৩২৮ বাংলা সালে কবি তৃতীয়বার কুমিল্লা আসেন। এবং ইন্দ্রকুমার সেনের বাড়িতে দীর্ঘ চারমাস অতিবাহিত করেন। এসময় কবি ইন্দ্রকুমার সেনের ভাইয়ের কন্যা প্রমীলা দেবীর প্রেমে আবদ্ধ হন। সমাজ সংসারের প্রবল বিরোধিতার মুখেও নজরুলর সঙ্গে প্রমীলার বিয়ে হয়। নজরুলের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ কখনোই ছিলোনা। কৈশোরেই লেটো দলের জন্য গান তৈরি করতে গিয়ে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মীয় বিষয় নিয়ে গান তৈরি করেছেন। নজরুলের এ অসাম্প্রদায়িক মনোভঙ্গী একটা ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে যায় কুমিল্লাতে। এখানে যে বাড়িতে তিনি অবস্থান করেছিলেন সেই ইন্দ্রকমার সেনগুপ্তের বাড়িটিতে সাম্প্রদায়িকতার লেশ মাত্র ছিলোনা। এ-ছাড়া কুমিল্লায় যাদের সঙ্গে মিশেছেন তাঁরা সংস্কারমুক্ত অগ্রসর চিন্তার মানুষ সুতরাং নজরুলের চিন্তা-চেতনায় তার প্রভাব পড়াটা স্বাভাবিক। এসব প্রগতিশীল ধ্যান ধারনার মানুষ কবিকে সাম্প্রদদায়িকতা মুক্ত উন্নত মানসিক বিকাশে সহায়তা করেছে। তাঁর নিজের অসাম্প্রদাদয়িক মনোভঙ্গি ও প্রমানিত হয়। প্রমীলার সঙ্গে প্রেম ও বিয়ের মধ্যে দিয়ে কবির অসাম্প্রদায়িক মানসিকতাকে প্রমান্য করে তোলেন। কুমিল্লায় কবির আরোকজন শুভানুধ্যায়ী ছিলেন তিনি প্রমীলার মাতা গিরিবালা দেবী। গিরিবালা দেবী ছিলেন নজরুল জীবনে পরম আর্শিবাদের মতো। বিশাল বিটপীর সুশীতল ছায়ায় নজরুলকে আশ্রয় দিয়েছেন নিরন্তর। নজরুলের সৃষ্টির জন্য ,প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাত্যহিক জীবন নির্বাহের প্রেক্ষাপটে গিরিবালা দেবীর ভূমিকাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। তাঁর ত্যাগ তাঁর প্রতিনিয়ত সহায়তা ছাড়া নজরুলের পক্ষে কাব্য কিংবা সঙ্গীত সাধনা কোনটাই হয়তো সম্ভব হতো না। তিনি ছিলেন কবি নজরুলের অনিবার্য সহায়ক।

চতুর্থবার আগমণ,আত্মগোপন ও গ্রেফতার
কুমিল্লায় কবির চতৃর্থবার আগমন ছিলো অত্যন্ত গোপনীয়। ১৯২২ সালের আগস্টে ধুমকেতু পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এতে আনন্দময়ী আগমনে কবিতা রচনার জন্য ব্রিটিশ সরকার কবির ওপর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির কারণে কলকাতা থেকে পালিয়ে এসে কুমিল্লায় আত্মগোপন করেন। আত্মগোপনের সময় কবি কালেভদ্রে শহরের বাগিচাগাঁও ও দারোগা বাড়িসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে রাত্রি যাপন করতেন। ১৯২২ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিকালে কবি বাউতলা পুলিশ লাইনের রাস্তা দিয়ে গমন করার সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কুমিল্লা তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কবিকো গ্রেফতার করেন এবং কলকাতা কারাগারে প্রেরণ করেন।

পঞ্চম ও শেষবার কবির কুমিল্লায় আগমণ
১৯২৩ সালর ১৫ ডিসেম্বর কবি কলকাতা কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে প্রমীলা দেবীর সাথে দেখা করার জন্য পরদিন ১৬ডিসেম্বর চলে আসেন কুমিল্লা প্রমীলা কুটিরে। সারা কলকাতায় তখন কবিকে সংবর্ধনা দেয়ার আয়োজন চলছিলো। কিন্তু কবি তার সংবর্ধনা উপেক্ষা করে সবার আগচরে চলে আসেন প্রমীলা দেবীর সানিধ্য লাভে।
কুমিল্লার দু‘প্রণয়ণী -স্ত্রী নার্গিস ও প্রমীলা এবং কুমিল্লার রাজনৈতিক পরিবেশ সঙ্গীত ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নজরুলের মনে প্রভাব বিস্তার করে। নানাভাবেই নজরুলের মধ্যে প্রভাব লক্ষনীয় হয়ে ওঠে। নজরুলের মানসিক গঠনে ও জীবন গঠনে কুমিল্লার মাটি ,মানুষ ,প্রকৃতি সামজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ,ঘটনা প্রবাহ নজরুলের মধ্যে প্রবেশ করেছে অবলীলায়। নজরুলের পূর্ণতা ও আতœনির্মানে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নজরুলের খ্যাতি,নজরুলের প্রতিষ্ঠা এবং নজরুলকে নজরুল রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে কুমিল্লা।

এই সংবাদটি 1,266 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ