কুয়াকাটাকে নিরাপদ জোন হিসেবে নিয়েছে অপরাধীরা

প্রকাশিত:রবিবার, ২৭ সেপ্টে ২০২০ ০৮:০৯

কুয়াকাটাকে নিরাপদ জোন হিসেবে নিয়েছে অপরাধীরা

 

আনোয়ার হোসেন আনু,কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) :
পর্যটন নগরী কুয়াকাটাকে এখন অপরাধীরা অপরাধের নিরাপদ জোন হিসেবে বেছে নিয়েছে। যার ফলে ক্রমশই বাড়ছে বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ডসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ড। গত কয়েক বছরের এমন অপরাধের তথ্য প্রমাণ রয়েছে পুলিশ প্রশাসনের কাছে। নি¤œমানের আবাসিক হোটেলে বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড, ধর্ষণ, আত্মহত্যার মত ঘটনা ঘটছে। এছাড়াও দেহব্যবসা, মাদক বানিজ্য,বন্যপ্রাণী পাচারকারীর সদস্যরা প্রায়ই আইন শৃঙ্খলাবাহিনির কাছে আটক হয়। দেশীয় আর্ন্তজাতিক চোরা কারবারীরা পর্যটক সেজে এসব নানা অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। ওইসব অপরাধীরা বঙ্গোপসাগরকে নৌ-রুট ব্যবহার করে ভারতও মিয়ানমার থেকে শাড়ি,কাপড় ও মাদকের বড় বড় চালান নিয়ে আসে। ২-১টি চালান আটক হলেও বেশীর ভাগ থেকে যায় অন্ধকারে। ইয়াবা ও কাপড়ের চালান আটক হলেও এর সাথে জড়িত মুল হোতারা সব সময় থেকে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এসব চোরা কারবারীরা মাদক ও পন্য আনা নেয়ায় জেলেদের ট্রলার ও মাছ বিপননের পরিবহনকে ব্যবহার করছে এমন অভিযোগ রয়েছে । এসব অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। এঘটনায় মহিপুর ও কলাপাড়া থানায় ইয়াবার চালান ও ভারতীয় পন্য আটকের বিষয়ে একাধিক মামলা রয়েছে। তথ্যমতে ১৮ বছরের নীচে শিশু কিশোর ও টিনেজদের কাছে হোটেল কক্ষ ভাড়া দেয়া হচ্ছে। এতে করে বিভিন্ন সময়ে নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। নি¤œ ও মধ্যম শ্রেনীর আবাসিক হোটেলগুলোতে নিয়ম কানুন না মেনে পর্যটক রাখার কারণে অপরাধীরা অপরাধ সংগঠিত করে সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে । প্রতিনিয়ত নানা অপরাধ সংগঠিত হওয়ায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পুলিশ সুত্রে জানা গেছে,২০১৮ সালে ২৩ সেপ্টেম্বর আবাসিক হোটেল আল মদিনায় ঢাকার আশুলিয়ার কান্তা বিউটি পার্লারের মালিক মার্জিয়া আকতার কান্তাকে স্বামী ও দেবর হত্যা করে পালিয়ে যায়। হোটেলের মালিক কান্তার লাশ সাগরে ফেলে দেয়। এ ঘটনায় কান্তার বাবা ২০১৯ সালের ফ্রেরুয়ারীতে নরসিংদীতে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এঘটনায় স্বামী দেবর ও হোটেলের দুই মালিক আনোয়ার এবং দেলোয়ারকে নরসিংদী পিবিআই গ্রেফতার করে।
চলতি বছর ১৭ আগষ্ট আবাসিক হোটেল সাগর’র কক্ষে রাঙ্গাবালীর মাদ্রাসা ছাত্রীকে গণধর্ষণের অভিযোগে ১৩ সেপ্টেম্বর ওই ধর্ষিতার বাবা বাদী হয়ে রাঙ্গাবালী থানায় অপহরন ও ধর্ষণ মামলা দায়ের করে। গত ২৪ আগষ্ট সাগর হোটেলে কক্ষে পটুয়াখালীর লাউকাঠি ইউনিয়নের মিঠাখালী গ্রামের এক কন্যা শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মামাতো ভাইসহ দুই যুবকের বিরুদ্ধে অপহরন ও ধর্ষণের মামলা হয়। এ ঘটনায় মোঃ রুবেল (২০) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে পুলিশ। বিশ্বাস সী প্যালেসে স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর লিঙ্গ কর্তনের মত ঘটনা ঘটেছে। আবাসিক হোটেল রাজু ও সাগর নীড় হোটেলে আমতলীর স্কুল ছাত্রী গণধর্ষণের ঘটনায় ওই ছাত্রীর মা ২৫ আগষ্ট আমতলী থানায় অপহরন ও ধর্ষণ মামলা দায়ের করে। এ ঘটনায় দুই ধর্ষককে গ্রেফতার করেছে আমতলী থানা পুলিশ। ৪ সেপ্টেম্বর মৎস্য ব্যবসায়ী ইউসুফ কোম্পানীর মালিকানাধীণ আবাসিক হোটেল পাচঁতারা থেকে সরিসূপ জাতীয় বন্য প্রানী তক্ষকসহ এক পাচারকারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে পাচঁতারা হোটেলে দেহ ব্যবসা,মাদক বেচাকেনাসহ নানা অপরাধ সংগঠিত হয়ে আসছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর মেয়র জিয়াউল হক জুয়েলের অরুনিমা সী প্রপাটিজ পরিচালিত ভাড়াটিয়া আবাসিক হোটেল ঝিনুক ডাকবাংলো থেকে পতিতা,খদ্দের ও হোটেল ম্যানেজারসহ পাচঁজনকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতদের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মহিপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। জেলা পরিষদ সুত্রে জানা গেছে, ঝিনুক ডাকবাংলো হোটেলটি সরকারী হলেও অরুনিমা সী প্রপাটিজ নামে একটি আবাসন কোম্পানীর নামে লিজ নিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে। শিক্ষক গোলাম মোস্তফা কর্তৃক পরিচালিত হলিডে ইন হোটেলে গেীরনদীর সংখ্যালঘু এক মেয়েকে বিয়ের প্রলোভনে হোটেল কক্ষে হত্যা করে পালিয়ে যায় নির্মাণ শ্রমিক প্রেমিক। পায়রা আবাসিক হোটেলে বান্ধবীকে নিয়ে বেড়াতে এসে অতিরিক্ত মাদক সেবনে খুলনার এক যুবকের মুত্যু হয়।
অপরদিকে সান ফ্লাওয়ার হোটেলে সাতক্ষীরা শ্যামনগর এলাকার পর্যটক মোবারক হোসেন (৪৫) লেম্বুর বনের জঙ্গলে আত্মহত্যা করে। এর আগেও লেম্বুর বনে নাম পরিচয়হীন এক পর্যটকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সিকদার রিসোর্ট এন্ড ভিলাস এর ছয় তলার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে চীনা নাগরিকের মুত্যুর ঘটনা ঘটে। কুয়াকাটা সৈকতের গঙ্গামতি রিজার্ভ ফরেষ্ট এলাকা থেকে এক কলেজ ছাত্রীর লাশ এবং গঙ্গামতির চর থেকে গর্ভবতী এক নারীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সৈকতে ভেসে ওঠা অজ্ঞতনামা একাধিক লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সর্বশেষ ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে যমুনা হোটেল থেকে দুই পতিতা ও ৪ খদ্দেরকে আটক করে পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে যমুনা হোটেল থেকে ৪ খদ্দেরকে আটক করলেও রহস্যজনক কারণে দুই খদ্দেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। যমুনা হোটেলের ভাড়াটিয়া মালিক সাইফুল ও জাহিদকে এর আগে ধর্ষণ ও পতিতা ব্যবসার অভিযোগে কয়েকবার আটক করে পুলিশ। বেঙ্গল গেষ্ট হাউজে এক নারীকে আটকে রেখে ধর্ষণের ঘটনায় জাহিদ,আল আমিন,খলিলসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
অন্যদিকে সমুদ্রে ট্রলার যোগে আসা ইয়াবার বিশাল দু’টি চালান মহিপুর থেকে র‌্যাব-৮ আটক করে। কোষ্টগার্ডের অভিযানে ভারতীয় শাড়ি ও পন্য সামগ্রী আটক করা হয়। যার একটি চালান এখনও মহিপুর থানায় জব্দ তালিকায় রয়েছে। যা নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়াধীণ রয়েছে। এছাড়াও পুলিশের হাতেও একাধিকবার ইয়াবার ছোট বড় চালান ধরা পরে।
এসব অপরাধ জনিত দু’য়েকটি ঘটনা উম্মোচিত হলেও বেশিরভাগ অপরাধ এবং অপরাধের সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে নি¤œ ও মধ্যম শ্রেণীর আবাসিক হোটেল গুলোতে দেহ ব্যবসা,মাদক পাচার,হত্যা গুমসহ নানা অপরাধ জনিত কাজ ঘটলেও পুলিশের তদারকির অভাবে বন্ধ হচ্ছে না এসব অপরাধমূলক কার্যকলাপ।
কুয়াকাটায় প্রায় শতাধিকেরও বেশি আবাসিক হোটেল রয়েছে। এসব আবাসিক হোটেলের মধ্যে ১৫-২০টি আবাসিক হোটেলে জেলা প্রশাসকের লাইসেন্স রয়েছে। বাকি আবাসিক হোটেল গুলো লাইসেন্স বিহীন। লাইসেন্স বিহীন আবাসিক হোটেল গুলোকে লাইসেন্স করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হলেও গুরুত্ব দিচ্ছে না মালিকরা।
এছাড়াও নামে বেনামে বাসা বাড়ি কটেজ রয়েছে একাধিক। নিন্ম ও মধ্যম মানের আবাসিক হোটেল গুলো দেহ ব্যবসা.মাদক বানিজ্য সহ নানা অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। হোটেল রুমে পর্যটক রাখার ক্ষেত্রে জেলা পুলিশের দেয়া নির্দেশনা মানছে না। বিভিন্ন বাসা বাড়িতে ভাড়া দেয়া হচ্ছে দেহ ব্যবসায়ীদের। বীচে ভাসমান পতিতাদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। আর্থিকভাবে লাভবান হবার জন্য অনেক হোটেলের বয় ম্যানেজাররা মালিকের অগোচরে লোভে পরে অসামাজিক ব্যবসা চালিয়ে আসছে। ট্যুরিষ্ট পুলিশ ও থানা পুলিশ মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে এদের দু’য়েকজনকে আটক করলেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেড়িয়ে এসে আবার জড়িয়ে পড়ছে অসামাজিক কাজের সাথে। অভিযোগ রয়েছে পুলিশের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে এদের সখ্যতা রয়েছে। যার ফলে এরা নানা ধরনের অপরাধ সংগঠিত করতে সাহস ও উৎসাহ পাচ্ছে।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে, অসামাজিক কার্যকলাপের সাথে জড়িত আবাসিক হোটেল গুলোতে পুলিশী অভিযান চালাতে গেলে তখন হোটেল কর্তৃপক্ষ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পর্যটক হয়রানী করছে বলে অহেতুক অভিযোগ করছেন। যার কারণে অনেক সময় অসামাজিক কার্যকলাপ চললেও পুলিশ এড়িয়ে যায়।

এ বিষয়ে কথা হয় কুয়াকাটা হোটেল মোটেল ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম এ মোতালেব শরীফ এর সাথে। তিনি বলেন,জেলা পুলিশের নির্দেশনা মেনে তারা আবাসিক হোটেল পরিচালনা করছেন। হোটেল মোটেল ওনার্স এসোসিয়েশনের আওতাভূক্ত কোন হোটেল অসামাজিক কার্যকলাপের সাথে জড়িত নয় বলে তিনি দাবী করেন। তিনি আরও বলেন এসোসিয়েশনের আওতাভূক্ত নয় এমন কয়েকটি আবাসিক হোটেলের বিরুদ্ধে অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত থাকার বিষয়ে তাদের কাছে অভিযোগ রয়েছে। এবিষয়ে তারা আইন শৃঙ্খলা মিটিংয়ে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছেন।
এ ব্যাপারে মহিপুর থানার অফিসার্স ইনচার্জ মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, অসামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত আবাসিক হোটেল সাগর নীড়,ঝিনুক ডাকবাংলো ও যমুনা হোটেলের বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যেসকল আবাসিক হোটেল অসামাজিক কার্যকলাপের সাথে জড়িত রয়েছে তাদের চিহ্নিত করণে গোয়েন্দা পুলিশ কাজ করছে। তিনি আরো বলেন, জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে হোটেলে পর্যটক রাখার ক্ষেত্রে নিয়মাবলী সম্মিলিত তথ্য সিট দেয়া হয়েছে। নিয়মাবলী অমান্য করে যারা পর্যটক রাখবে এবং অসামাজিক কার্যকলাপের সাথে জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান তিনি। ইতোমধ্যে হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সাথে কাউন্সিল করে এবিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে বলে ওসি জানান।

এই সংবাদটি 1,237 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •