কু-ঋণের পরিমাণ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৭৫ হাজার কোটি টাকা

নতুন প্রভিশন ঘাটতি ১১ হাজার কোটি টাকা ১৩ ব্যাংকে
রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেয়ার কারণেই ব্যাংকিং খাতে খেলাপি আর কু-ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। দলীয় নেতা কর্মীদের ঋণ দেয়ার করণেই তা আদায় করার ক্ষমতা নেই সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর। গত ৬ মাসে এ ধরনের ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত কু-ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। এ কারণে প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে ১৩টি ব্যাংক। এই ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।
জানা গেছে, এসব ঋণ নেয়ার সময় আইনী পরামর্শ করে এমনভাবে ভুয়া ঠিকানা এবং কাগজপত্র তৈরি করার হয়েছে যা আইনী লড়াইয়ে গেলে ব্যাংকগুলো হারবে। আর এ কারণেই অনেক ব্যাংক আইনী প্রক্রিয়ায় গিয়েছে নামেমাত্র। ঋণ নেয়ার আগেই তারা নানা কৌশল ব্যবহার করেছে। দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং পরিচালকদের সাথে যোগসাজশে তারা এ ঋণ নিয়ে থাকেন।
জানা গেছে, যতগুলো এ যাবত কাল খেলাপি কিংবা কু-ঋণে পরিণত হয়েছে সব কয়টিই ভুয়া ঠিকানায় ঋণ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের বড় বড় কোম্পানির মালিক ঋণ নিচ্ছে অথচ তাদের ঠিকানা ভুল। তারা নিজের ঋণের তদবির করলেও ঋণ নিজের নামে না করে ভুয়া নাম এবং ঠিকানা ব্যবহার করেন। এতে করে তাদের বিরুদ্ধে কোন আইনী ব্যবস্থা নিতে পারে না ব্যাংক কতৃপক্ষ। এভাবে দেশের আর্থিক খাতে একের পর এক লুট চলছে। অবস্থা দেখে মনে হয় তা দেখার কেউ নেই।
শুধু তাই নয়, আইনের এত ফাঁক ফোকর রয়েছে। এসব মামলা শেষ করতে যুগের পর যুগ কেটে যায়। কিন্তু মামলা শেষ হয় না। রাজনৈতিক কারণে এসব মামলার কোন সাজাও হয় না। এতে করে নিরাপদেই থেকে যায় এসব হোতারা।
যেসব ঋণ গ্রাহকের কাছ থেকে আর ফেরত পাওয়া যাবে না বলে ধরে নেওয়া হয়, সেসব ঋণই হিসাব বিজ্ঞানে কু-ঋণ বা অনাদায়ী পাওয়া হিসেবে পরিচিত।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যেসব ঋণ দেয়া হয়, সেগুলোর অধিকাংশই এখন কু-ঋণে পরিণত হয়েছে। কারণ এসব ঋণ গ্রহীতারা ইচ্ছা করে খেলাপিতে পরিণত হয়। পরে সেসব খেলাপি ধীরে ধীরে কু-ঋণে পরিণত হয়। আর কু-ঋণের এই চাপ পড়ে ব্যাংকের প্রভিশন বাড়াতে হয়।
তাদের পরামর্শ, আইনের সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। অর্থঋণ আদালতকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রত্যেক জেলায় এ ধরনের আদালত স্থাপন করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত কু-ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। যা ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৬৪ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। এই হিসেবে ৬ মাসের ব্যবধানে কু-ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের কু-ঋণ ৩৬ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা, বেসরকারি ৪০ ব্যাংকের ৩১ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা, বিদেশি ৯ ব্যাংকের ১ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। এছাড়া সরকারি বিশেষায়িত ২ ব্যাংকের কু-ঋণ ৪ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা।
মাত্রাতিরিক্ত এই কু-ঋণের প্রভাবে প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে সরকারি-বেসরকারি ১৩টি ব্যাংক। চলতি বছরের জুন শেষে এসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও আইনগত জটিলতাসহ নানা সমস্যায় রয়েছে ব্যাংকিং খাত। অর্থাৎ সুশাসনের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এর ফলে অনেকেই ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করে না। ইচ্ছা করেই খেলাপি হয়। এ কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। যার প্রভাব পড়ছে পুরো আর্থিক খাতে।
তিনি বলেন, কু-ঋণ বাড়লে তখন নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি প্রভিশন রাখতে হয়। কিন্তু প্রভিশন রাখতে না পারলে ব্যাংকগুলোকে জরিমানা গুণতে হয়।
এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ঋণ পুনঃতফসিলের কারণে কু-ঋণ বাড়ছে। আর কু-ঋণ বাড়ছে খেলাপি ঋণের কারণে। আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকার কারণে এই পরিস্থিতি দাঁড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দেয়ার সংস্কৃতিতে ঝুঁকছে অধিকাংশ ঋণ গ্রহীতা। ফলে ভাল গ্রাহকেরা ঋণ পাচ্ছে না। এটা ভাল লক্ষণ নয়।
খেলাপি ঋণ বেশি থাকলে কু-ঋণ বাড়ে উল্লেখ করে মাহবুবুর রহমান বলেন, কু-ঋণের কারণে প্রধানত ২টি সমস্যা হয়, একদিকে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায় অন্যদিকে প্রভিশন বেশি রাখতে হয়।
এবিবির এই চেয়ারম্যান বলেন, খেলাপি ও কু-ঋণ কমিয়ে আনার জন্য অর্থঋণ আদালতকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। একই সাথে প্রত্যেক জেলায় অর্থঋণ আদালত স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। নতুবা খেলাপি হওয়ার সংস্কৃতি কমানো যাবে না।
নিয়ম হলো- প্রভিশন ঘাটতি রেখে কোনো ব্যাংক তার শেয়ারহোল্ডারকে লভ্যাংশ দিতে পারে না। তবে কয়েক বছর ধরে প্রভিশন ঘাটতি থাকার পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ আনুকূল্যে লভ্যাংশ ঘোষণার অনুমতি পাচ্ছে বিভিন্ন ব্যাংক।
আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে ঋণের শ্রেণিমান বিবেচনায় ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত হারে প্রভিশন রাখতে হয়। ব্যাংকগুলোর মুনাফা থেকে সাধারণ ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে শুরু করে ৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন রাখতে হয়। আর নিম্নমান, সন্দেহজনক এবং মন্দ বা ক্ষতি মানে শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে যথাক্রমে ২০, ৫০ ও ১০০ শতাংশ হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, জুন শেষে ১৩ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। মার্চে ১২ ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। ৩ মাসের ব্যবধানে ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে ৩৭৫ কোটি টাকা। মার্চের ১২টি ব্যাংক ছাড়াও নতুন করে একটি ইসলামী ব্যাংক প্রায় ১৬০ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে।
ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভিশন ঘাটতি সোনালী ব্যাংকে, তিন হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। এরপর বেসিক ব্যাংকে ৩ হাজার ২২৩ কোটি, রূপালীতে ১ হাজার ৩৭২ কোটি ও অগ্রণী ব্যাংকে ৮৯০ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকে ৪৭৮ কোটি, কমার্স ব্যাংকে ৪২২ কোটি, এসআইবিএলে ৩৬৮ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ১৬০ কোটি, এবি ব্যাংকে ১৪৭ কোটি, প্রিমিয়ারে ১১৬ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্টে ১০৬ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে ৪৬ কোটি এবং আইএফআইসি ব্যাংক ২১ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে।