ক্ষমতাসীনদের হুমকির মুখে সিলেটের ইউএনওরা

প্রকাশিত:বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টো ২০২০ ০২:১০

ক্ষমতাসীনদের হুমকির মুখে সিলেটের ইউএনওরা

আকাশ চৌধুরী, সিলেট:

জলমহাল-বালুমহাল ইজারা, পাথর ও ভূমিখেকোদের নগ্ন থাবা এবং ক্ষমতাসীনদের চাপেই হুমকির মুখে সিলেটের উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা (ইউএনও)। তারা বলছেন, সরকারের স্বার্থ শতভাগ নিশ্চিত করতে গিয়েই পদে পদে নানা হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে। এছাড়া একজন ইউএনও যেহেতু উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি, সেহেতু অনেক কঠোর সিদ্ধান্তে মহলবিশেষ সংক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, বালু, পাথর, জলমহাল রক্ষায়ও তাদের ভূমিকা রয়েছে। সেক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় পুলিশের সীমিত সদস্য নিয়েও হিমশিম খেতে হয় তাদের। এক কথায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ক্ষমতাসীন বিশেষ একটি মহল এক বেপরোয়া। আর এ কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় কঠোর সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন না ইউএনওরা। এ থেকে উত্তোরণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে মনে করছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

সিলেট জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে ১১টি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সঙ্গে কথা বলে এমনই তথ্য পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিন থেকেই দেশের গ্রামীণ জনপদে কাজ করে আসছেন ইউএনওরা। তারা রাজনৈতিক চাপ ও ক্ষমতাসীনদের হুমকির মুখে থাকলেও তা তেমন একটা প্রকাশ পায়নি। সম্প্রতি দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর আক্রমণের পরই বিষয়টি জোর আলােচনায় আসে।

ইউএনওদের ভাষ্য, মাঠ পর্যায়ে সরকারের অনেক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে তাদের নানা চাপের মুখে পড়তে হয়। সেই চাপ ও হুমকির মধ্যেই তারা কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে স্বার্থান্বেষী মহলের নজর থাকে তাদের ওপর। এছাড়াও সরকারি সম্পত্তির ওপর দুর্বৃত্তদের নজর থাকে বেশি। যেমন বালু মহাল, খাস জমি অনেকে দখলে নিতে চায়। কিন্তু এগুলো পুনরুদ্ধারে গেলেই সংশ্লিষ্টরা প্রশাসনের ওপর ক্ষেপে থাকে। এরা এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে চায়। এছাড়াও অনেক ঠিকাদার রয়েছেন যারা নামেমাত্র কাজ করে বিল উত্তোলন করতে চায়। এদের সঠিকভাবে কাজের তাগাদা দিলে নাখোশ হয়।

একজন ইউএনও বলেন, তার উপজেলায় বালু ও পাথরখেকোদের তৎপরতা বেশি। এদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই সরকারি উন্নয়নমূলক কাজ অব্যাহত রাখা হচ্ছে। তাছাড়া অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, খাস জমি বন্দোবস্ত, হাটবাজার, জলমহাল ইজারায় প্রভাবশালীদের হাত থাকে। সেটা তাদের মনের মতো না হলে তারা ক্ষুব্ধ হন।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের বিরোধকৃত অনেক বিষয় ইউএনওর ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চায়। ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা নিজের পছন্দের মতো কিছু না হলে চড়াও হয়। অনেক সময় মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। নিরাপত্তার অভাবে সময়বিশেষ কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না।

তাদের মতে, মাঠ পর্যায়ের কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চাপ জড়িত। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার বিষয়টি দৃশ্যমান থাকে। কিন্তু শুধু তাই নয়, অনেক ফাইল স্বাক্ষরের বিষয়টিও হুমকির মধ্যে থাকে। এছাড়া একজন ইউএনও যেহেতু উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি, সে হিসেবে নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত থাকে। তাদের সঠিকভাবে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকা- তদারকি করতে হয়। এতে করে কোন একটি পক্ষ সংক্ষুব্ধ হতে পারে। ফলে নিরাপত্তা বিঘœতার সম্ভাবনা থাকে। পেশীশক্তি বা ক্ষমতাধরদের স্বার্থে আঘাত এলেই চাপের সৃষ্টি হয়।

এ বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম বলেন, যখন কম দায়িত্ব নিয়ে এসডিও পদ ছিল, তখন তিনি গানম্যান পেতেন। আর সেই পদটিকে বর্ধিত করে ইউএনও করা হলেও তারা বর্তমানে গানম্যান পাচ্ছেন না। যেহেতু ইউএনওদের স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত দিতে হয়, সেহেতু তাদের ওপর অনেকেই নাখোশ থাকে। এতে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত। তাই ইউএনওদের অবশ্যই গানম্যান (পুলিশ সদস্য) দেয়া দরকার । এছাড়া বাসায় নিরাপত্তার জন্য আপতত পুলিশ সদস্য দিতে না পারলেও ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্য দেয়া উচিত। কারণ এই আনসার সদস্যরা স্থায়ী। এতে করে ইউএনওরা স্বস্তিতে কাজ করতে পারবেন।

এসব বিষয়ে কথা হলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেট-এর সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশে সত্যিকারের কোন গণতন্ত্র নেই। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে দেশ চলতে পারে না। সরকার যা বলে তা সঠিকভাবে কার্যকর হয় না। তিনি বলেন, আমরা অতীতের সরকার গুলোতেও একই অবস্থা দেখেছি। একপর্যায়ে তারা ধ্বংস হয়েছে। তাই সুশাসন ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করা খুব জরুরি। নয়তো সামনে এর কঠিন মাসুল দিতে হবে।

এই সংবাদটি 1,229 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •