গ্রামে শান্তির পায়রা আর ডানা মেলে না

প্রকাশিত:রবিবার, ১২ জুলা ২০২০ ০২:০৭

গ্রামে শান্তির পায়রা আর ডানা মেলে না

গ্রাম-পল্লি প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সৃষ্টিকর্তার অপরূপ নিদর্শনগুলোর একটি। ‘God made the village and man made the town’ পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে তাই এই কথাটি বেশ জনপ্রিয়।

 

প্রকৃতির কোলে আশ্রিত গ্রামের মানুষের জীবন ক্রমশই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে—যা শুধু উপলব্ধি করা যায়, সমাধানের পথ দীর্ঘ। এক সময় গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ ইত্যাদি বিষয়গুলো এখন গল্প, কবিতা ছাড়া আর কিছুই না।

আমাদের শ্যামল রূপ বাংলা বা বাংলাদেশ বলতে যে শ্যামলিমা বুঝায় সেখানে আজ নানারকম সমস্যা বিরাজ করছে। যা আগেও ছিল কিন্তু উদাহরণ দেওয়ার মতো নয়। কিছু কিছু সমস্যা দৃশ্যমান যা গ্রামের মানুষের ভালো না থাকার জন্য যথেষ্ট নয় কিন্তু এইসব সমস্যার উত্সই গ্রামের মানুষের জীবনে অদৃশ্য ছায়ার রূপ।

 

গ্রামে বসবাসরত মানুষজনের বেশির ভাগেরই রোগবালাই ও করোনার মতো মহামারিগুলোর ব্যাপারে যথেষ্ট জ্ঞান ও সচেতনতার দীনতা রয়েছে। তাদের মাঝে সচেতনতার ছিটেফোঁটাও পরিলক্ষিত হয় না। বাইরে বেরুলে মাস্ক পরা, নিয়মিত হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা বিভিন্ন মাধ্যমে বলা হলেও তারা তা মানছেন না। ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি। করোনা মহামারির কারণে দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট গ্রামের মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেছে।

বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এনজিও গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়ালেও সেই এনজিও এখন গ্রামের মানুষের শোষণের অন্যতম হাতিয়ার। এনজিওসমূহ যে পরিমাণ ঋণ দিচ্ছে সেই টাকা দিয়ে বর্তমান বাজারে কিছু করা সম্ভব নয়। তাই কিস্তি নামক উচ্চ সুদের বোঝা গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার বহন করে যাচ্ছে। গ্রামের বেশির ভাগ অভিভাবক তাদের কন্যা সন্তানদের কোনো মতে বিয়ে দিয়ে বাড়ি থেকে তাড়াতে পারলেই বুঝি হাফ ছেড়ে বাঁচেন। তাই বেড়ে যাচ্ছে বাল্যবিবাহ।

গ্রামে প্রায় ৯০ ভাগ পরিবার সুদের সঙ্গে জড়িত। এখন গ্রামের মানুষের মানসিক অবস্থা এরূপ দাঁড়িয়েছে যে, বিপদে পড়লে টাকা দিয়ে সাহায্য কেউ কাউকে করবে না। কিন্তু সুদ দেওয়ার জন্য লোকের অভাব নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধানের ওপর সুদ নিচ্ছে এবং দিচ্ছে। তাছাড়া প্রতি হাজারে ১০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত এবং এককালীন সুদ গ্রামের মানুষের জীবনকে এলোমেলো করে দিচ্ছে।

বর্তমানে গ্রামে অধিকাংশ বিচার সালিশ ও ব্যক্তিকরণ করা হচ্ছে। ন্যায়-বিচার তো দূরের কথা বিচারপ্রার্থীকে উলটো জরিমানা দিতে হচ্ছে। আবার যার টাকা আছে তার জন্য সবকিছু মাফ হওয়ার মতো অবস্থা গ্রামে সালিশকারিগণ ঘুষ খেয়ে ইচ্ছেমতো বিচারকার্য পরিচালনা করছে। এই অবস্থা প্রায় প্রতিটি গ্রামে। কথায় কথায় অশ্লীল শব্দের ব্যবহার গ্রামের লোকদের নিকট শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার মতোই একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কোনো একটা বাক্যে একটি অশ্রাব্য শব্দ প্রয়োগে ব্যর্থ হলে মনে হয় তার বলা কথাটা বুঝি পূর্ণতা পেল না।

তাদের কদুক্তি শুনে শিশুরাও হয়ে উঠছে গালিবাজ। খেলায় বনিবনা না হলে বড়দের থেকে শেখা রুচিবিরুদ্ধ শব্দদ্বয়ের ব্যবহার করে খেলার সাথীদের আক্রমণ করে। গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভালো শিক্ষক, আধুনিক শিক্ষা ও শিক্ষা উপকরণ না থাকার কারণে গ্রামের ছাত্রছাত্রীরা প্রতিযোগিতার যুগে পিছিয়ে যাচ্ছে এবং শহরের সঙ্গে টিকতে না পারা বা জিপিএ-৫ বেড়ে যাওয়ার কারণে ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি না হতে পেরে সাধারণ কলেজে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে অধিকাংশ ঝরে পড়ছে।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল অফুরন্ত সৌন্দর্যে ভরপুর এক অপরূপ লীলাভূমি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সবুজ শ্যামলিমায় শোভিত আমাদের গ্রামাঞ্চলগুলো। আমাদের দেশের চালিকাশক্তির অন্যতম উত্স গ্রামাঞ্চল। সুতরাং এই গ্রামাঞ্চল ও এখানে বসবাসরত মানুষদের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি বজায় রাখাকে অবজ্ঞা করলে চলবে না। গ্রামের সরল-সোজা মানুষগুলোর জীবনকে ছোট ছোট সমস্যাগুলো নষ্ট করে দিচ্ছে। সেটা তাদের অজান্তেই। গ্রাম বাঁচলে দেশ বাঁচবে। দেশ বাঁচলে আমরা ভালো থাকব। তাই গ্রামের মানুষের জন্য আমাদের একটু ভাবনার দরকার এখনই। কারণ আমার আপনার নাড়ি যে গ্রামে পাকা ধানের ফাঁকে। আকাশের সঙ্গে যে মেঠো পথ মিশে গেছে সে পথে।

এই সংবাদটি 1,227 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •