Wed. Oct 16th, 2019

BANGLANEWSUS.COM

-ONLINE PORTAL

চিকিৎসার জন্য ফ্ল্যাট বিক্রি করতে হবে রুবেলকে!

1 min read

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার মোশাররফ রুবেল ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত। গত মার্চে সিঙ্গাপুরে অপারেশন করলেও রোগটি পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। এখনো ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশের শততম ওয়ানডে জয়ের অন্যতম নায়ককে। চিকিৎসার জন্য সেই অর্থ জোগানের জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে দিতে চাচ্ছেন রুবেল

 

বসার ঘরটা কেমন হবে? ছোট্ট রুমটা ‘স্টাডি’ রুম হবে নাকি খেলার ঘর? ডাইনিং স্পেসের রংটা কী হলে ভালো দেখাবে? শোবার ঘরের রংটা বদলানো যায় না?

প্রিয়তম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে কল্পনার সব রং ঢেলে দিয়ে বাসাটি সাজানো। চার দেয়ালের রংগুলো এখনো নতুন বউয়ের মেহেদি রাঙা হাতের মতো উজ্জ্বল হয়ে হাসছে। চোখ ঘোরালে শোভা পাচ্ছে সচ্ছলতার বিজ্ঞাপন, আসবাবে মিশে আছে আভিজাত্যের ছোঁয়া। কিন্তু সাজানো সংসারে বাজছে বিষাদের সুর। ১৫৫০ স্কয়ার ফুটের বাসার রঙিন দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে গুমোট বিমর্ষ একটা আবহ।

 

বাড়ির কর্তা ক্রিকেটার মোশাররফ হোসেন রুবেল। নাম শুনে বুঝে যাওয়ার কথা রঙিন সাজানো সংসারে অশান্তির ছায়ার কারণ। বিশ্বকাপের উন্মাদনায় অনেকে হয়তো ভুলেই গিয়েছেন রুবেলের কথা। জাতীয় দলের সাবেক এই ক্রিকেটার এখন ব্রেন টিউমারের সঙ্গে লড়ছেন। মার্চে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে মস্তিষ্কে সফল অস্ত্রোপচার হলেও রোগ সারেনি পুরোপুরি। ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে, কিন্তু তার প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান কে দেবে?

 

অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে উপায়ান্তর না দেখে জীবন বাঁচানোর জন্য নিজের ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সাবেক এই স্পিনার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দিয়েছেন পোস্ট, ‘কেমোথেরাপির সঙ্গে এখন লড়াই করছি। আমার চিকিৎসার জন্য ইতিমধ্যে ১ কোটি টাকার মতো খরচ করে ফেলেছি। বাকি ৬ সার্কেল কেমোথেরাপির জন্য আরও ৫০ লাখ টাকা প্রয়োজন। এ কারণে জরুরিভাবে আমার ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে দিতে চাই (১৫৫০ স্কয়ার ফুট) …। এবং অবশ্যই আপনার দোয়াও প্রয়োজন। কারণ, এখনো আমি বেঁচে আছি কেবল আপনাদের দোয়ায়। আল্লাহ আমাদের সব অপরাধ ক্ষমা করুন। ধন্যবাদ।’

 

বারিধারার ডিওএইচএসে রুবেলের বাসার ড্রয়িং রুমে বসে সে পোস্টটি আরেকবার পড়ে নিলাম। এরপর বাসায় যতক্ষণ ছিলাম, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘশ্বাসও বাড়তে থাকল। কী যত্ন ও ভালোবাসা নিয়ে গোছানো। মাঠে বছরের পর বছর পরিশ্রম করে সঞ্চয় দিয়ে কেনা বাসাটি পছন্দের সব জিনিস দিয়ে সাজানো। বাসায় উঠেছেন খুব বেশি দিন নয়। এই তো গত বছর পয়লা ফেব্রুয়ারিতে স্ত্রী ফারহানা চৌধুরীর হাত ধরে ওঠা। ৯ মাসের একমাত্র ছেলে রুশদামের জন্ম দক্ষিণের ওই কোনার ঘরে। চার দিকে সুখের কী বাতাবরণই না ছিল। এমন মনমরা এক দিনেও ঠিকই পড়ে নেওয়া যাচ্ছিল তাঁদের সেই লাল-নীল সুখের দিনগুলোর গল্প।

ভাগ্যের কী ‘চোখ পল্টি’! দেড় বছর না যেতেই চিকিৎসার অর্থ জোগানোর জন্য বিক্রি করতে চাচ্ছেন তিলে তিলে গড়ে তোলা ফ্ল্যাটটি, ‘চিকিৎসার জন্য ইতিমধ্যে ১ কোটি টাকা খরচ করে ফেলেছি। এখন তো কোনো কূলকিনারা পাচ্ছি না। একে তো অসুখ নিয়ে চিন্তা, সঙ্গে এখন টাকার দুশ্চিন্তা। জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। হঠাৎ করে জীবনটা কী হয়ে গেল। বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে ডলার পাঠানোর কথা ছিল। ব্যাংকে গিয়েছি টাকা নেই। এফডিআরসহ যা ছিল, সব শেষ। ফ্ল্যাটটি বিক্রি করতে পারলে টাকার চিন্তাটা আপাতত আর করতে হবে না।’

 

জীবনে মন্দ সময় আসেই! অপারেশন করে সেই খারাপ সময়ের ধাক্কাটা সামলেও উঠেছিলেন। কিন্তু অপারেশনের পরে বায়োপসি রিপোর্টে দেখা যায় টিউমারের জীবাণু রয়ে গিয়েছে, ‘অপারেশন সফল হয়েছে। কিন্তু এরপর বায়োপসি রিপোর্টে দেখা যায় টিউমার দ্রুত বাড়ছে। গ্রেড থ্রিতে চলে গিয়েছে। পরে ডাক্তার আবার ৬টা সার্কেল কেমোর সঙ্গে ৩০টা রেডিওথেরাপি নিতে বলেছেন। সে কোর্সগুলো আমি শুরুও করে দিয়েছি। কিন্তু এখন আরও অনেক টাকার প্রয়োজন। ধারদেনা করে কুলিয়ে উঠতে পারছি না।’

 

অনিচ্ছা সত্ত্বেও কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে হাহাকার। শক্ত-সামর্থ্য মানুষটার চোখ দুটো লাল হয়ে আসে। পলক ফেললেই জমে থাকা জল ফোঁটা হয়ে ঝরবে। কে বলবে এই মানুষটাই জমিয়ে রাখতেন পুরো বাসা। আশপাশের মানুষগুলোও তো এই বাসার কত আনন্দের সঙ্গী। দুই বছর আগে রুবেলের হাত ধরেই আফগানিস্তানকে হারিয়ে শততম ওয়ানডে জয়ের উৎসব করেছিল বাংলাদেশ। বাঁহাতি স্পিনার রুবেলের ঘূর্ণি জাদুতে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল আফগানরা। প্রায় সাড়ে আট বছর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে মাত্র ২৪ রান খরচায় নিয়েছিলেন তিন উইকেট।

 

সেই বোলারের সঙ্গে সামনে বসা রুবেলকে মেলানো যায় না। সেদিনের সেই দুর্দান্ত প্রতাপশালী আজ অসহায়ত্ব প্রকাশ করছেন, দিতে হচ্ছে বাসা বিক্রির বিজ্ঞাপন। আশার কথা কিছু জায়গা থেকে পাওয়া গিয়েছে সহযোগিতার আশ্বাস। রুবেলের মূল ভরসার জায়গাটা মূলত অভিভাবক সংস্থা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, ‘অপারেশনের সময় আমার কিছু সতীর্থ খেলোয়াড়ের সঙ্গে আমার দলও আমাকে সহযোগিতা করেছে। সবচেয়ে বড় সহযোগিতা পেয়েছিলাম বিসিবির কাছ থেকে। এখন এই দুঃসময়ে বিসিবির দিকেই তাকিয়ে আছি। আমার বিশ্বাস বিসিবি আমার জন্য কিছু করবে।’

 

ঋণী থাকাকে খুব ভয়ের চোখে দেখেন শিক্ষাজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বর্ণপদক পাওয়া রুবেল। কিন্তু চিকিৎসা করাতে গিয়ে ঋণী হয়ে গেলেন সতীর্থ-সমর্থকদের কাছে। নতুন জীবন পেলে তাই বাকি জীবনে মানুষের জন্য কিছু করে যেতে চান, ‘আমি ঋণী থাকাকে সবচেয়ে অপছন্দ করি। কিন্তু অসুস্থ হয়ে অনেকের কাছে ঋণী হয়ে গেলাম। আমার খবর নিয়েছে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের আমি চিনিও না। তাঁরা আমাকে ভালোবাসা দিয়েছেন। অনেক সতীর্থ খেলোয়াড় আমাকে অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছেন। আমি সবার কাছেই ঋণী। আল্লাহর রহমতে সুস্থ হলে মানুষের জন্য কিছু করে যেতে চাই।’

 

এর মাঝেই মায়ের কোল থেকে রুবেলের কোলে চড়ে বসে তাঁর ৯ মাসের ছেলে রুশদাম। ওর জানা নেই বাবার কঠিন অসুখ। হয়তো সে অনুভব করতে পারে, বাবা ভালো নেই। কারণ ইতিমধ্যে হারিয়ে গিয়েছে বাবা-ছেলের খুনসুটি। বাবা এখন সারাক্ষণ চিন্তায় থাকেন আর হিসাব কষতে থাকেন সামনের কেমোটা ঠিক সময়ে দিতে পারবেন তো? টাকা জোগাড় হবে তো?

 

কিন্তু তাই বলে কি চিকিৎসার জন্য মাথা গোঁজার ছাদটুকু হাতছাড়া করতে হবে দেশকে শততম জয় এনে দেওয়া বীরকে!

 

 

Copyright © Banglanewsus.com All rights reserved. | Developed By by Positive it USA.

Developed By Positive itUSA