চীনে আত্মহত্যা ঠেকাতে প্রযুক্তি

প্রকাশিত: ৪:৪৭ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১০, ২০১৯

চীনে আত্মহত্যা ঠেকাতে প্রযুক্তি

মানুষ যখন হতাশায় নিমজ্জিত থাকে তখন আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ চীনে সেই মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। প্রযুক্তিগত উন্নতিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে চীন। সেই প্রযুক্তি দিয়েই নাগরিকদের আত্মহত্যা চেষ্টা ঠেকানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে দেশটি।

 

 

 

চীনের ২১ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী লি ফ্যান দেশটির নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উইবোতে একটি পোস্ট করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। গত ভ্যালেন্টাইন্সে তিনি পোস্ট করেন, ‘আমি আর পারছিনা। আমি সব ছেড়ে দিচ্ছি’। এর কিছুক্ষণ পরই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সে ঋণগ্রস্ত ছিল। এছাড়া মায়ের সঙ্গে বিবাদ চলছিল এবং চরম বিষণ্ণতায় ভুগছিল।

 

তার বিশ্ববিদ্যালয় নানজিং থেকে প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে আমস্টারডামের একটি কম্পিউটারে চলমান এক প্রোগ্রামে শনাক্ত করা হয় চীনের এই শিক্ষার্থীর পোস্টটি। ওই কম্পিউটার প্রোগ্রামটি মেসেজটিকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে চীনের বিভিন্ন এলাকায় থাকা স্বেচ্ছাসেবকদের নজরে আনে যাতে তারা দরকারি ব্যবস্থা নিতে পারে।

 

যখন তারা এত দূর থেকে লিকে জাগিয়ে তুলেতে সক্ষম হল না তখন স্থানীয় পুলিশের কাছে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানায় এবং এরপর তারা এসে তাকে বাঁচায়।

 

শুনতে নিশ্চয়ই এটা খুব বিস্ময়কর বা অসাধারণ শোনাচ্ছে কিন্তু ট্রি হোল রেসকিউ টিমের সদস্যদের আরও অনেক সাফল্যের কাহিনীর মধ্যে এটা একটি মাত্র। এই উদ্যোগের প্রধান ব্যক্তিটি হচ্ছেন হুয়াং ঝিশেং, যিনি ফ্রি ইউনিভার্সিটি আমস্টারডামের একজন শীর্ষ আর্টিফিশাল ইন্টেলিজেন্স(কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) গবেষক। গত ১৮ মাসে চীন-জুড়ে ছয়শও স্বেচ্ছাসেবক তার এই প্রোগ্রাম ব্যবহার করেছে, যারা বলছে প্রায় ৭০০ মানুষকে তারা বাঁচিয়েছে।

 

হুয়াং ঝিশেং বলেন, ‘এক সেকেন্ড যদি আপনি ইতস্তত করেন, অনেক প্রাণ শেষ হয়ে যাবে। প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০ জনকে আমরা প্রাণে বাঁচাতে সক্ষম হয়েছি’।

 

প্রথম রেসকিউ অপারেশন চালানো হয়েছিল ২০১৮ সালের ২৯ এপ্রিল। চীনের উত্তরাঞ্চলীয় শ্যানডং প্রদেশের ২২ বছর বয়সি তরুণী তাও ইয়ো, উইবোতে লিখেছিল যে দুইদিন পরে নিজেকে শেষ করে ফেলার পরিকল্পনা করছে সে। চাইনিজ একাডেমী অব সায়েন্সের স্বেচ্ছাসেবক পেং লিং নামে এবং আরো কয়েকজন বিষয়টিতে বিচলিত প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন।

 

পেং বলেন, তারা আগের এক পোস্ট থেকে ওই শিক্ষার্থীর একজন বন্ধুর ফোন নম্বর পান এবং কলেজ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান। আমি ঘুমানোর আগে তাকে মেসেজ করার চেষ্টা করি এবং বলি যে আমি তাকে তুলতে পারব। তার উইচ্যাট মেসেজ গ্রুপের একজন বন্ধু হিসেবে সে আমাকে যুক্ত করে এবং ধীরে ধীরে শান্ত হয়। তখন থেকে তার দিকে আমি নজর রাখতাম যেমন সে খাচ্ছে কি-না। আমরা সপ্তাহে একবার ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাকে একগুচ্ছ করে ফুল কিনে দিতাম।

 

এই সাফল্যের পর এই উদ্ধার দলের সদস্যরা একজন পুরুষকে উদ্ধার করেন যিনি একটি ব্রিজ থেকে লাফিয়ে পড়তে চেয়েছিলেন এবং একজন নারীকে বাঁচান যিনি কিনা যৌন হেনস্থার শিকার হওয়ার পর নিজেকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন।

 

বেইজিংয়ের মনোবিজ্ঞানী লি হং বলেন, ‘উদ্ধারের জন্য ভাগ্য এবং অভিজ্ঞতা দুটোই দরকার’।  তিনি স্মরণ করেন কিভাবে তিনি এবং তার সহকর্মীরা চেং ডুর আটটি হোটেলে পরিদর্শন করেন, আত্মহননে চেষ্টাকারী একজন নারীকে খুঁজতে একটি রুমও বুকিং দেন।

 

লি বলেন, ‘সব হোটেলের অভ্যর্থনা-কর্মীরা সবাই বলত তারা ওই নারীর সম্পর্কে কিছু জানেনা। কিন্তু তাদের মধ্যে একজন এক মুহূর্তের জন্য ইতস্তত করছিলেন। তখন আমরা ধরে নিলাম যে এটা নিশ্চয়ই সেই হোটেল এবং তাই ছিল’।

 

যেভাবে কাজ করে এই প্রক্রিয়া

 

জাভা-বেজড এই প্রোগ্রামটি উইবোতে কিছু ‘ট্রি হোলস’ মনিটর করে এবং সেখানে পোস্ট করা কিছু বার্তা বিশ্লেষণ করে থাকে। একটি ‘ট্রি হোল’ হচ্ছে ইন্টারনেটে যেসব জায়গায় লোকজন অন্যদের পড়ার জন্য গোপনে পোস্ট করে তার একটি চীনা নাম।

 

এই নামকরণে পেছনে রয়েছে আইরিশ কাহিনী যেখানে একজন ব্যক্তি তার সব গোপন কিছু একটি গাছের কাছে গিয়ে বলতেন। জোও ফানের দেয়া পোস্টের একটি উদাহরণ, ২৩ বছর বয়সী এই চীনা শিক্ষার্থী ২০১২ সালে আত্মহত্যার আগে উইবোতে একটি মেসেজ লেখেন।

 

তার মৃত্যুর পর দশ হাজারের বেশি অন্যান্য ব্যবহারকারী তার পোস্টে মন্তব্য করেন, তাদের নিজেদের নিজস্ব সমস্যাগুলো তুলে ধরে। এভাবে মূল মেসেজটি একটি ট্রি হোল হিসেবে রূপ নেয়। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে এ ধরনের কোন পোস্ট শনাক্ত করা হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাকে ১ থেকে ১০ এর মধ্যে র‍্যাংক দেয়া হয়।

 

র‍্যাংকে এ-নাইন হলে বুঝতে হবে খুব শিগগিরই একটি আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো হবে। এ-টেন বা ১০ নম্বর র‍্যাংকিং মানে হল, ইতোমধ্যেই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। এধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবকরা সরাসরি পুলিশকে খবর দেয়, সেইসঙ্গে ওই ব্যক্তির পরিবার, আত্মীয় স্বন বা বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

 

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •