চোখ খুললেই কাঞ্চনজঙ্ঘা

প্রকাশিত: ৭:৫৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০১৯

চোখ খুললেই কাঞ্চনজঙ্ঘা

পাহাড়ের বরফশুভ্র গায়ে সূর্যের আলো পড়লে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত হিমালয় পর্বত ও কাঞ্চনজঙ্ঘার একাধিক রূপ দেখা যায়। এ দৃশ্য দেখার জন্য দূরবীন সঙ্গে করে নিয়ে আসতে হবে না। একদম খালি চোখেই দেখতে পারেন প্রকৃতির এসব অপরূপ দৃশ্য। মোহনীয় এ দৃশ্য দেখতেই অসংখ্য পর্যটক আসেন গ্রামটিতে। কেউ একাকী, কেউ বন্ধুদের নিয়ে দল বেঁধে আবার কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে। খুব ভোরে চা হাতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের বর্ণিল আলোকচ্ছ্বটায় উদ্ভাসিত অভূতপূর্ব দৃশ্যে অন্যরকম ভালোলাগার দ্যুতিতে মন ভরে যায় সবারই।

 

কাঞ্চনজঙ্ঘার এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে যেতে হবে দার্জিলিং থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরের চটকপুর গ্রামে। এই গ্রামে একশ’র মতো মানুষ বসবাস করেন। কিছুদিন আগেও থাকার জায়গা বলতে ছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি ইকো রিসোর্ট। থাকার জায়গা কম বলেই হয়তো চটকপুর গ্রামে পর্যটক যেতো না দীর্ঘদিন। কিন্তু, বিগত কয়েক বছর ধরে গ্রামের ওপরেই গড়ে উঠেছে একের পর এক হোটেল ও রিসোর্ট। তাইতো দিনে দিনে বাড়ছে পর্যটক।

 

দার্জিলিং থেকে সোজা পথে যেতে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগে না। তাই হয়তো ঠিক করলেন খানিক ঘুরপথে উঠবেন। মংপু হয়ে, বগুরা হয়ে গা ছমছমে বন্য পথে অবশেষে পৌঁছে যাবেন চটকপুর। আমরাও গেলাম একই পথে। যাওয়ার সময় দেখা হয়ে গেল একপাল ত্রস্ত হিমালয়ান ডিয়ারের সঙ্গে। হরিণের পিছু পিছু এই পথে আসে লেপার্ডও। দু’বছর আগে নাকি রাস্তা থেকে এক গ্রামবাসীকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল শ্বাপদ। ড্রাইভার সেই কথা মনে করিয়ে দিতেই গা ছমছমে ভয় বেড়ে গেল কয়েকগুণ।

 

 

চটকপুর

 

 

কিন্তু, এরপরে যখন গ্রামে পৌঁছোবেন, মনেই হবে না হিংস্র আদিমতা ঘিরে আছে আপনাকে। উচ্চতায় প্রায় আট হাজার ফুট। সারা বছরই শীতের রাজ্য এই গ্রাম। দু’পাশ জুড়ে বন। রাজকীয় পাইন কোঁকড়া চুলের মাথা নিয়ে দাঁড়িয়ে গ্রামের ঠিক নিচেই। আর, সামনে পাহাড়ের পর পাহাড়ের ঢেউ। সেই ঢেউ কোথায় শেষ হয়েছে জানা নেই, শুধু আকাশের গায়ে শেষ সীমানায় টাঙানো রয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। যা দেখতে এসেছেন, এটাই তো সেই ‘সোনার পাহাড়’!

 

এই গ্রামের দুটো জিনিস একেবারেই কমন। মুরগির ঝাঁক আর বড় এলাচের ক্ষেত। এক ঘরের উঠোন বেয়েই সিঁড়ি অন্য ঘরে যাওয়ার। পাহাড়ের ধাপে ধাপে চাষ। দু’এক পশলা বৃষ্টিতে আরো বেশি সবুজ হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম। আর প্রত্যেকটা মানুষের মুখেই এক আকাশ সারল্যের হাসি লেগেই থাকে সারাক্ষণ।

 

 

 

প্রকৃতির কখন যে কী ইচ্ছে হয় তা বলা মুশকিল! ইচ্ছে হলেই বৃষ্টি, সঙ্গে ঝড়কে বোনাসও দিতে পারে। সব ঝাপসা হয়ে যাবে তখন। তারপর মেঘ কেটে গেলেই কাঞ্চনজঙ্ঘা। গ্রামের মাথায় ওয়াচ টাওয়ার। সেখানে ওঠার সিঁড়িটার পাথুরে খাঁজে খাঁজে বাহারি বুনো ফুল। সেই ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখা যায় অনেক নিচের সমতল। দেখা যায় সান্দাকফুও। আর, ভোরবেলায় কাঞ্চনজঙ্ঘার ঘুম-ভাঙানো সূর্যোদয়ে চটকপুর যে কোনো দিন হারিয়ে দেবে টাইগার হিলকে। আর, এখানে সেই অলৌকিক সূর্যোদয়ে এসে মিশবে না কোলাহলের ঝাঁক, ভিড়। বড় নিবিড় কিংবা সুন্দর সেই প্রথম সূর্য।

 

 

চটকপুর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা

 

 

চটকপুর গ্রামটা পায়ে হেঁটে ঘুরতে পারেন, নেশা লাগবেই। প্রতিটা বাড়িতে ফুলের বাগান। যখন চাইবেন তখনই চা এনে দেবে কেউ একজন। হাঁটতেই হাঁটতেই কখন শেষ হয়ে যাবে গ্রাম। নিচের রাস্তা ধরে ডানদিক-বাঁদিক যেদিকেই যাওয়া যায়, জঙ্গল। ডানদিকে পাইনের সারি পেরিয়ে, সেসব পাইনের ফাঁকে আটকে থাকা কুয়াশার বিভ্রমে খানিক থমকে দাঁড়িয়েই আপনি হাঁটা লাগাবেন কালিপোখরির দিকে। ছোট্ট একটা জলাশয়। এখানেই বাস হিমালয়ান স্যালামান্ডারের। পৃথিবীর প্রাচীনতম জীবিত প্রজাতিদের মধ্যে অন্যতম এই স্যালামান্ডার। দেখতে অনেকটা গিরগিটির মতো। তবে, এদের দেখা পেতে অপেক্ষা করতে হবে আপনাকে। সেই অপেক্ষার ফাঁকেই আপনার চোখে পড়বে গোলাপি রঙের ব্যাঙ কিংবা শত শত পাখি। চারপাশে অসংখ্য নাম না জানা গুঁড়ি-গুঁড়ি ফুল। পাহাড়ি অরণ্য তার সমস্ত আদিমতার রহস্য উপুড় করে দিয়েছে এখানে। সবমিলিয়ে চটকপুর না গেলে নয়! এ ভারি দ্বন্দ্বের খেলা।

 

নিউ জলপাইগুড়ি জংশন রেলওয়ে স্টেশন বা বাগডোগরা থেকে গাড়িতে উঠে যেতে পারেন চটকপুরে। দার্জিলিং থেকেও আসতে গেলে গাড়িপথেই আসতে হবে। এই গ্রামে যাওয়ার সেরা সময় অক্টোবর থেকে মার্চ। তবে, গ্রীষ্মেও যেতে পারেন। মেঘের দেখা মিলবে এই সময়ে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •