জন্মদিনে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বাবরের

২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট বাংলাদেশে সরকার গঠন করার পর যে কয়েকজন ব্যক্তি প্রবল ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন, তাদের মধ্যে লুৎফুজ্জামান বাবর ছিলেন অন্যতম।

মনে করা হয় যে বিএনপি নেত্রী এবং ওই সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের সাথে ঘনিষ্ঠতাই ছিল মি: বাবরের ক্ষমতাবান হয়ে উঠার মূল ভিত্তি।

মি: বাবর প্রথমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন, তবে মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল আলতাফ হোসেন চৌধুরী। কিন্তু ক্ষমতা প্রয়োগের মানদণ্ডে মি: বাবর ছাপিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর পূর্ণ মন্ত্রীকে।

একটা সময়ে আলতাফ হোসেন চৌধুরীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আর কোন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী নিয়োগ দেয়নি সরকার, ফলে মি: বাবর অনেকটা একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিপতি হয়ে যান।

১৯৫৮ সালের ১০শে অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন লুৎফুজ্জামান বাবর। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এইচএসসি পর্যন্ত। এই তথ্য দেয়া হয়েছে আমিনুর রশিদ এবং মোস্তফা ফিরোজ সম্পাদিত ‘প্রামান্য সংসদ’ বইয়ে।

১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো নেত্রকোনা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মি: বাবর। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সর্বশেষ ২০০১ সালে লুৎফুজ্জামান বাবর নেত্রকোনার একটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

ওই নির্বাচনের পরপরই বিএনপি যখন সরকার গঠন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন দলের ভেতরে অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে লুৎফুজ্জামান বাবর ‘গুরুত্বপূর্ণ কোন মন্ত্রণালয়ের’ দায়িত্ব পাবেন।

সেই ধারণা সত্যি বলে প্রমানিত হয়েছিল তখন। ওই সময় বিএনপি সরকারের কর্মকাণ্ড খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন সাংবাদিক আরিফুর রহমান।

“সাংবাদিক হিসেবে আমি এমনও শুনেছি যে কোন একটি ঘটনায় লুৎফুজ্জামান বাবর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীকে ধমক দিয়েছিলেন,” বলেন মি: রহমান।

তিনি বলেন, ১৯৮০’র দশকে মি: বাবর ঢাকা বিমানবন্দর-কেন্দ্রীক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে ব্যাপকভাবে কথা প্রচলিত রয়েছে।

তবে লুৎফুজ্জামান বাবরের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা দাবী করেন যে তিনি কখনোই বিমানবন্দর-কেন্দ্রীক কোন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

তবে আরিফুর রহমান বলছেন যে ব্যবসার মাধ্যমে মি: বাবর বিত্তশালী হয়ে ওঠেন এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির টিকিটে নেত্রকোনা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৯৯ সালে ঢাকার বনানীতে বিএনপির এক নেতা ‘হাওয়া ভবন’ নামে একটি বাড়ি ভাড়া নেন। সেটি বিএনপি চেয়ারপারসেনর রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হলেও এক পর্যায়ে সেটি খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের এক ধরণের অঘোষিত কার্যালয় হিসেবেই বেশী পরিচিত পায়।

ওই ভবন থেকেই ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন এবং এর পরবর্তী বিভিন্ন দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

‘হাওয়া ভবন’ কার্যালয় চালু হওয়ার পর সেখানে যোগাযোগ গড়ে তোলেন লুৎফুজ্জামান বাবর।

“হাওয়া ভবনে যে বিভিন্ন প্রোগ্রাম হতো সেগুলোর ইভেন্ট আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হতো লুৎফুজ্জামান বাবরকে। সেসব দায়িত্ব তিনি ঠিক মতো পালন করতেন। এভাবে বিএনপি চেয়ারপারসনের ছেলে তারেক রহমানের সাথে তার বিশেষ সখ্যতা গড়ে উঠে,” বলছিলেন আরিফুর রহমান।

মি: বাবর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন বাংলাদেশে বেশ কিছু বোমা হামলার ঘটনা ঘটে এবং জঙ্গি কার্যক্রমের উত্থান ঘটে। জেএমবি নেতা শায়খ আব্দুর রহমান এবং সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের উত্থান হয়েছিল ওই সময়েই।

আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর সিলেটে গ্রেনেড হামলা, দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণ, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা এবং সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল বিএনপির ওই শাসনামলে।

রাজনীতির খবরাখবর যারা রাখেন তারা বলছেন যে ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর মি: বাবর গ্রেফতার এড়াতে তৎকালীন সরকারের সাথে সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেন।

মি: বাবর তৎকালীন সরকারকে এমন ধারণা দেয়ারও চেষ্টা করেছিলেন যে কূটনীতিকদের – বিশেষ করে পশ্চিমা দেশের কূটনীতিকদের – সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক রয়েছে।

তখন তিনি নিজের বাসায় ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস এবং আরও কয়েকজন পশ্চিমা কূটনীতিককে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। তবে এর পরপরই মি: বাবরকে আটক করা হয়।

তখন জেলে যাবার পর তিনি আর সেখান থেকে বের হতে পারেননি তিনি। একের পর এক মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন তিনি।

আর সেই থেকে গত প্রায় ১১ বছর কারাগারেই আছেন লুৎফুজ্জামান বাবর।