জামালপুরের গান্ধী আশ্রম ও মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘর

প্রকাশিত:বৃহস্পতিবার, ১১ আগ ২০১৬ ০৭:০৮

জামালপুরের গান্ধী আশ্রম ও মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘর

শফিক জামান,জামালপুর প্রতিনিধি:
বৃটিশ শাসিত ভারতে গান্ধির স্বদেশী মন্ত্রে দিক্ষিত হয়েছিল ভারত বর্ষের মানুষ। স্বদেশী চেতনায় ভারতবর্ষজুড়ে বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছিল গান্ধি আশ্রম। এই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সেসময় নাসির উদ্দিন সরকার নামে এক গান্ধিভক্ত স্বদেশী জামালপুরের নিভূত গ্রামে গড়ে তুলেছিলেন গান্ধি আশ্রম। সময়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া এই গান্ধি আশ্রমটি স্থানীয় উদ্যোগে ফের পূনর্জাগরিত হয়েছে। শুধু পূনর্জাগরণ নয় ভারতবর্ষের বৃটিশপূর্ব, বৃটিশ পরবর্তি পাকিস্তান পর্ব, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ ইতিহাসের অবিবিচ্ছিন্ন ধারাকে তুলে ধরতে এই প্রত্যন্ত গ্রামে গড়ে উঠা গান্ধি আশ্রম ও মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘর কাজ করে যাচ্ছে। যাদুঘরটি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরছে ইতিহাসের আলো।
পরাধীনতার গ্লানী মোচনের লক্ষ্যে গান্ধির স্বদেশী চেতনাকে ধারণ করে জামালপুর মহকুমা কংগ্রেসের তৎকালীন সম্পাদক নাসির উদ্দিন সরকার ১৯৩৪ সালে জামালপুর শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের ঝিনাই নদী তীরের নিভূত গ্রাম কাপাসহাটিয়ার নিজ বাড়িতে গড়ে তুলেছিলেন গান্ধি আশ্রম। এই আশ্রমে তিনি গ্রামের মানুষকে স্বদেশী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে চরকায় সুতা তৈরী, হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ, লেখাপড়া ও শরীরচর্চা কার্য্যক্রম চালাতেন। এই আশ্রমে এসেছিলেন শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, কমরেড মনি সিংহ, বারীন দত্ত, খোকা রায়, অনিল মুখার্জী, প্রফেসর শান্তিময় রায়, কমরেড আশুতোষ দত্ত, আন্দামান ফেরত কমরেড রবি নিয়োগী, নগেন মোদক, বিধূভূষন সেন, সুরেন্দ্র মোহন ঘোষ, মনোরঞ্জন ধর, নরেন নিয়োগী, রনেশ দাশ গুপ্ত, সত্যেন সেন, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, কৃষক নেতা হাতেম আলী খান, আব্দুস সাত্তার, হেমন্ত ভট্টাচার্য, মন্মথনাথ দে, খন্দকার আব্দুল বাকীসহ অনেক বিশিষ্ট জন। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন এখানে।
পরবর্তিতে দেশভাগের পর মুসলিম লীগের পান্ডারা ১৯৪৮ সালে এই আশ্রমটি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়। আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা নাসির উদ্দিন সরকারকে পিটিয়ে মৃত মনে করে জঙ্গলে ফেলে যায়। মুসলিম লীগের পান্ডাদের হামলায় বুকের পাজর ভেঙ্গে গুরুতর আহত হন নাসির উদ্দিন সরকার। হামলার পর টিকে থাকে শুধু আশ্রমের অফিস ঘরটি। এরপর থেকে এই আশ্রমের কার্য্যক্রম ক্রমশ: বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তিতে ২০০৬ সালে স্থানীয় গ্রামবাসীর উদ্যোগে একটি ট্্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে সেই পুরনো অফিস ঘরকে কেন্দ্র করে পূনরায় গড়ে তোলা হয়েছে গান্ধি আশ্রমটি। গান্ধি আশ্রমের সাথে যুক্ত হয়েছে মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘর। এই গান্ধি আশ্রম ও মুক্তিসংগ্রাম যাদুঘর বর্তমানে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে হয়ে উঠেছে ইতিহাস শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র । হয়ে উঠছে ইতিহাসের বাতিঘর।।
প্রতিদিন কাপসহাটিয়ার গান্ধি আশ্রম ও মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘরে শিক্ষার্থী ছাড়াও আসেন অনেক দেশী-বিদেশী দর্শনাথী। এখানে স্বদেশী আন্দোলন সময়কার আশ্রমে ব্যবহৃত চরকা, চেয়ার টেবিল, পুরনো সিন্দুক, তৎকালে আশ্রমের ছাত্রীদের তৈরী নানান সূচীকর্ম,পাঠাগারের দুর্লভ বই। রয়েছে মুক্তিসংগ্রামের নানা স্মৃতিচি‎হ্ন, ছবি, বিভিন্ন বধ্যভূমির মাটি। প্রদর্শন করা হয় ইতিহাসের প্রামাণ্যচিত্র । আশ্রমের মূল আদর্শকে ধারণ করে বর্তমানে এখানে গ্রামের মানুষকে স্বনির্ভর করতে বিনামূল্যে কম্পিউটার ও সেলাই প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।
এক একর জমির উপর মনোরম পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত জামালপুরে প্রত্যন্ত গ্রাম কাপাসহাটিয়ার গান্ধি আশ্রম ও মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘর হাজারো দর্শনার্থীর ইতিহাস চেতনাকে করছে সমৃদ্ধ। এই আশ্রম নিভূতে দর্শনার্থীর মনে ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশপ্রেম,সংগ্রামের সাহস ও প্রেরণা। এই প্রতিষ্ঠানটিকে অনুসরণ করে দেশের অন্যন্য গ্রামগুলোতে ইতিহাস নির্ভর এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে নতুন প্রজন্ম খুঁেজ পেতে পারে তার সংগ্রাম ও দেশপ্রেমের ঠিকানা।
গান্ধি আশ্রম ও মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘর এবং ট্্রাস্টি বোর্ডের পরিচালক উৎপল কান্তি ধর জানালেন, বাঙ্গালীর মুক্তি সংগ্রামে এই অঞ্চলের বহুমাত্রিক ইতিহাস সংরক্ষণের লক্ষ্যেই গান্ধি আশ্রমের পাশাপাশি মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘর নির্মিত হয়েছে। এই অঞ্চলের লড়াই সংগ্রামের স্মারক, তথ্য উপাত্ত, আলোকচিত্র, দলিলপত্র সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে এই জাদুঘরকে সমৃদ্ধ এক সংগ্রহশালায় পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি আমরা।

এই সংবাদটি 1,288 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ