জেগে উঠছে আদিম যোদ্ধারা!

প্রকাশিত: ৫:১৭ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১, ২০২০

জেগে উঠছে আদিম যোদ্ধারা!

প্রকৃতির কি বিশেষ অনুভূতি আছে? প্রকৃতি কি নিজেকে রক্ষার জন্য মাঝেমধ্যে শক্ত কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে? ১০ হাজার বছর আগের কথা চিন্তা করে দেখুন একবার। তখন এই প্রকৃতিজগতে একটি শুয়োপোকার যেই প্রভাব ছিল, মানবজাতির তার চেয়ে বেশি প্রভাব ছিল না। ঐ সময় দুনিয়ায় মানুষ ছিল দশমিক ১ শতাংশ আর বন্যপ্রাণ ছিল ৯৯ দশমিক ৯৯ ভাগ। আজ মানুষ হয়েছে ৩২ ভাগ, গবাদি প্রাণিসম্পদ ৬৭ ভাগ আর বন্যপ্রাণী মাত্র এক ভাগ! দুনিয়া জুড়ে নির্দয়ভাবে উধাও হয়েছে বন্যপ্রাণী। প্রকৃতির বৃহত্ একটি অংশকে উচ্ছেদ করে নিজের বসতি গড়েছে মানুষ। প্রকৃতিতে এক মানুষ ছাড়া আর সব প্রজাতির বিচরণস্থল ও তাদের বিকাশের পথ ক্রমশ আটকে দেওয়া হয়েছে। সভ্যতা গড়ার নামে মানুষ নষ্ট করে দিয়েছে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে এত বেশি পরিমাণে কার্বন নিঃসারণ করেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন পুরো পৃথিবীকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে।

মনে পড়ে শেষ কবে শহুরে বাসাবাড়িতে বসে সকালে ঘুম ভেঙেছে পাখির কিচিরমিচির শব্দে? ভোরের বাতাসে শেষ কবে পেয়েছেন শুদ্ধতার অনুভূতি? কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে নাকি ডলফিনদের জলকেলি দেখা যাচ্ছে! শেষ কবে এমন সুনসান সৈকত পেয়েছে ডলফিনরা? শোনা যায়, ১৯৯১ সালে নাকি শেষবারের মতো কক্সবাজারে ডলফিনদের খেলে বেড়াতে দেখা গেছিল। আর এখন, এই ২০২০ সালে, করোনার কালবেলায়। সারা পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ কোভিড-১৯-এর ভয়ে ঘরে বসে ঠকঠক করে কাঁপছে, আর প্রকৃতি জগত্ হেসে উঠছে খিলখিলিয়ে, নিজেদের খেয়ালখুশিতে খেলে বেড়াচ্ছে সভ্যতা শুরুর আগের জামানার মতো। বাতাসে নেই বিষাক্ত ধোঁয়া, ধুলিকণার বাড়াবাড়ি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের বায়ুমান যাচাইবিষয়ক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘এয়ার ভিজ্যুয়াল’ গত শনিবার জানিয়েছে, বায়ুমান সূচক (একিউআই) ইনডেক্সে ১০ নম্বরে নেমে এসেছে ঢাকা। অথচ গত ছয় মাস ধরেই দিনের বেশির ভাগ সময় ঢাকা প্রথম স্থান দখলে রেখেছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩০০-এর ওপরে গেলে তাকে দুর্যোগ অবস্থা বলে। এই সূচক ৩৯১ পর্যন্ত উঠেছিল। অথচ শনিবার সেই সূচক নেমে হয়েছে ১২১-এ! বায়ুদূষণ কী ভয়াবহ নীরব ঘাতক, তা বুঝতে ছোট্ট কিছু পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর শুধু বাংলাদেশেই পৌনে ২ লাখ লোক মারা যায়। এমনটিই জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। আর সারা বিশ্বে মারা যায় ৮৩ লাখ মানুষ। যত লোকের অকালমৃত্যু হয়, তার প্রায় ১৫ শতাংশই মারা যায় নানা ধরনের দূষণে।

করোনা ভাইরাস যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, মানুষকে বন্দি করে রাখলে প্রকৃতিতে কী কী পরিবর্তন আসে, প্রকৃতি কীভাবে নিজেকে সারিয়ে তোলে, কীভাবে কার্বন নিঃসারণ তলানিতে চলে যায়, কীভাবে মহাকালের ঘড়ি উলটো দিকে চলতে শুরু করে! করোনা, যার অর্থ মুকুট (গ্রিক শব্দ), সেই মুকুটধারী ভাইরাসটির পরিবারের গুষ্টি একদম আনকোরা এবং ছোটো নয়। করোনা গোত্রের ভাইরাসকে প্রথম খুঁজে পাওয়া যায় ১৯৬০ সালে। এই ভাইরাস-পরিবারে দুই শতাধিক সদস্য থাকলেও মানুষের ভেতর সংক্রমণের জন্য ইতিপূর্বে ছয়টি ভাইরাস চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে এই মুহূর্তে বিশ্বত্রাস তৈরি করেছে ২০১৯ সনে চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া আলোচিত ‘নোবেল করোনা ভাইরাস (২০১৯ এনসিওভি)’। এটি হলো মানুষে সংক্রমিত হওয়া করোনার সপ্তম প্রজাতি। এই কোভিড-১৯ ভাইরাসটি গবেষণাগারে তৈরি কি না—এ নিয়ে বিপুল বির্তক হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন জার্নালে। তবে এমন জটিল ভাইরাস যে প্রাকৃতিক অভিযোজন থেকেই তৈরি হয়েছে সে বিষয়টি বিশেষজ্ঞরা অনেকবার স্পষ্ট করে বলেছেন। সেটা মানুষের শরীরে বাদুড় থেকে এসেছে, নাকি বনরুই থেকে—সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো বিশ্বে কেন একের পর এক এমন সব জটিল জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে চলেছে? এক সংক্রমণের ধাক্কা সামাল না দিতেই হাজির হচ্ছে আরেক বিপদ। সার্স, মার্স, নিপাহ, ইবোলা, হেনিপা, বার্ড ফ্লু ভাইরাসের ভয়াবহতাকে কিছুটা সামলানো গেলেও কোভিড-১৯ কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো বিশ্বকে। সুতরাং প্রকৃতিতে কেন এমন সব মারণ জীবাণু জেগে উঠছে, এর উত্তর খোঁজা জরুরি বলে মনে করেন বিশ্বের বিজ্ঞানীরা। আর সেসব বিষয়ে কত ধরনের প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে নেচার, সায়েন্স, দি নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ইনফেকশাস ডিজিস, সিডিসি, ডাব্লিউএইচওর জার্নালে। সেসবের সুলুকসন্ধানে মাথা খারাপ হয়ে যেতে পারে। তার আগে একটু খোঁজ নিয়ে দেখা যাক পৃথিবীর আদিমতম যুদ্ধের বিষয়ে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •