টাঙ্গাইলে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ছাদে আরও একতলার কাজ – বাড়ল দ্বিগুণ ঝুঁকি

প্রকাশিত:বুধবার, ১০ আগ ২০১৬ ০৭:০৮

টাঙ্গাইলে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ছাদে আরও একতলার কাজ – বাড়ল দ্বিগুণ ঝুঁকি

কে এস রহমান শফি, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি:
টাঙ্গাইল পুরাতন বাসস্ট্যান্ড পৌর সুপার মার্কেট ভবন স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ের রিপোর্টে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার পরও সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র সেটির ছাদ ভাড়া দিয়েছেন একটি প্রতিষ্ঠানকে। বর্তমান মেয়র ২য় তলা ও ৩য় তলার নির্মাণ কাজ ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রাণহানির আশঙ্কা থাকায় সেটি বন্ধের নির্দেশ দিলেও তা মানছেন না ভাড়াটিয়া প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। ছাদ ভাড়া দেয়াকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে বলে জানা গেছে।
টাঙ্গাইল পৌর পরিষদের ২৩.০৮.২০১৫ তারিখের সিদ্ধান্ত এবং ১০.০৯.২০১৫ তারিখের পাবলিক মার্কেট বরাদ্দ কমিটির সভায় মার্কেটের ২য় তলার ছাদের ১৮ হাজার ৩০ বর্গফুট জায়গা ভাড়া দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় । পৌর পরিষদের এ ধরনের ভাড়া দেয়ার ক্ষমতা না থাকলেও তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মেয়র মানবেন্দ্র পার মিল্টনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দু’টি সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সালামী বাবদ ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা পেয়ে পৌরসভার পক্ষে সচিব ও ভাড়াটিয়ার পক্ষে রজনীগন্ধা কনসোর্টিয়াম-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম শিবলী সাদিক ০৯.১১.২০১৫ তারিখে চুক্তিপত্র করেন । চু্িক্তপত্র করলেও ভবন নির্মাণের কোন নকশা অনুমোদন না করেই ভাড়াটিয়ারা ২য় ও ৩য় তলার নির্মাণ কাজ শুরু করেন। তবে ভাড়াটিয়ারা দাবি করেছেন তাদের কাছে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মির্জা আরিফ ও সহকারি প্রকৌশলী শিব্বির আহমেদ আজমী স্বাক্ষরিত অনুমোদিত নকশা রয়েছে। তবে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেছেন তারা লে-আউটের অনুমোদন দিয়েছেন।
এদিকে বর্তমান মেয়র জামিলুর রহমান মিরন গত ২৩ জুন রজনীগন্ধা কনসোর্টিয়াম-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নির্মাণ কাজ বন্ধসহ বরাদ্দ বাতিল করে চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ০৪.১০.২০১২ তারিখে ৯২৩ স্মারকে মার্কেটের ভবনের নিচতলার কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশে ফাটল দেখা দেয়ায় এর ওপরে ২য় ও ৩য় তলায় উর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করা সঠিক হবে না বলে মতামত প্রদর্শন করে। সে মতামত উপেক্ষা করে পৌরসভার তৎকালীন বরাদ্দ কমিটিকে অন্যায়ভাবে প্রভাবিত করে আপনার নামে একটি বরাদ্দপত্র হাসিল করেন যা জনস্বার্থের পরিপন্থী। প্রধান প্রকৌশলীর চিঠির আলোকে বরাদ্দপত্র প্রদান আইনত অবৈধ। অবৈধ বরাদ্দপত্রের বদৌলতে মার্কেটের উর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের কাজ শুরু করেছেন যা ঝুঁকিপূর্ণ। এই নির্মাণ কাজ অব্যাহত থাকলে যে কোন সময় স্থাপনাটি ভেঙ্গে যেতে পারে। এতে করে ব্যাপক প্রাণহানির ও সম্পদের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণ কাজ বন্ধ না করলে নিচতলার দোকানদারসহ জনসাধারণের জীবনহানীর আশঙ্কা রয়েছে। ভবনের বাস্তব অবস্থা নিরুপণের জন্য এবং ভবনের সম্প্রসারণ যুক্তিসঙ্গত কিনা তা নিরুপণের জন্য বুয়েট-এর বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষা করে মতামত নেয়া যেতে পারে। বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামত না পাওয়া পর্যন্ত নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার জন্য জনস্বার্থে নির্দেশ দেয়া হয়।
পৌরসভার চিঠির জবাবে রজনীগন্ধা কনসোর্টিয়াম-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক গত ৩০ জুন দেয়া চিঠিতে জানান, একাধিক পত্রিকা মারফতে অবগত হয়ে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মতো পৌর আইন মেনে প্রতিযোগিতামূলক ভাবে পৌর বরাদ্দ কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ও পৌরসভার সাধারণ সভায় সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন প্রাপ্তির পর সকল আইনি প্রক্রিয়া মেনে রজনীগন্ধা কনসোর্টিয়ামের পক্ষে চুক্তিপত্র করতে পত্র তিনি চুক্তিবদ্ধ হন। পরবর্তী সময়ে নির্মাণ ব্যয় ৫ কোটি ৪২ হাজার ৪২৯ টাকার একটি এস্টিমেট ও দ্বিতল ভবনের একটি নকশা অনুমোদন করে পৌর প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানে ৭০ ভাগ নির্মাণ কাজ শেষ করি। চিঠিতে তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিবেদনটি পৌর কর্তৃপক্ষ তাদের দেখাননি বা সে বিষয়ে কিছু জানাননি।
পৌর মেয়র গত ৩০ জুন পুনরায় দেয়া চিঠিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালককে লিখেছেন, ২৩.০৬.২০১৬ তারিখের চিঠির নির্দেশনা উপেক্ষা করে নির্মাণ কাজ চলমান রেখেছেন যা আইন পরিপন্থী। এই ঝুঁকিপূর্ণ বিপদজনক নির্মাণ কাজ বন্ধ না করলে নিচতলার দোকানদারসহ জনসাধারণের জীবনহানীর আশঙ্কা রয়েছে। পত্র প্রাপ্তির সাথে সাথে নির্মাণ কাজ বন্ধ করার অনুরোধ করা হয়।
জানা যায়, টাঙ্গাইল পৌরসভা ১৯৮৭ সালে শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে পৌরসভার নিজস্ব ভূমিতে প্রতি ফ্লোরে ২১ হাজার ১৪৮ বর্গফুট বিশিষ্ট ৬তলা ফাউন্ডেশনের নীচতলায় কাজ শেষ করে ৮২টি দোকান বরাদ্দ দেয়। ২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পৌর পরিষদের সভায় ২য় ও ৩য় তলার নির্মাণের জন্য ৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকার প্রাক্কলন করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২-১৩ অর্থ বছরে প্রাক্কলন বাড়িয়ে ৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা করা হয়।
পৌরসভার তৎকালীন মেয়র সাহিদুর রহমান খান মুক্তি মার্কেট নির্মাণ কাজের প্রকল্প ও প্রাক্কলন অনুমোদনসহ মার্কেট নির্মাণ কাজের প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য ২০১২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি দেন। স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সহকারি সচিব মোঃ খলিলুর রহমান ২৫ সেপ্টেম্বর এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলীকে চিঠি দেন।
এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী মোঃ ওয়াহিদুর রহমান মার্কেট পরিদর্শন শেষে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে ৪ অক্টোবর পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন দেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কেট ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত নথি, সাব সয়েল ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট, ফাউন্ডেশন ও সুপার স্ট্রাকচার ডিজাইন/ড্রইং পাওয়া যায়নি। পৌরসভার পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে নথি তাদের সংরক্ষণে নেই। মার্কেট ভবনের প্রায় ৫০ ভাগ বিমে ভার্টিক্যাল ক্র্যাকস দেখা গেছে যা আপাতদৃষ্টিতে পুওর কনক্রিটিং-এর কারণে মনে হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি বিমে সেয়ার ক্র্যাক দেখা গেছে। ২টি কলামে করোসন/বন্ড ক্র্যাক পরিলক্ষিত এবং কিছু কিছু স্থানে কনক্রিট খসে পড়েছে।
শেষে পরামর্শ দেয়া হয় : বিদ্যমান মার্কেট ভবনের প্রথম তলার কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশে ফাটল পরিলক্ষিত হওয়ায় এর ওপরে ২য়/৩য় তলা উর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করা সঠিক হবে না। মার্কেট ভবনের জমির অবস্থান ও দু®প্রাপ্যতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান একতলা ভবন ভেঙ্গে পরামর্শক ফার্ম নিয়োগ করে বহুমুখী ব্যবহারের লক্ষ্যে আধুনিক স্থাপত্য নকশা অনুসরণে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণের কার্যক্রম হাতে নেয়া যেতে পারে। এ মুহূর্তে বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলে বিদ্যমান ভবনের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণপূর্বক ব্যবহার অব্যাহত রাখা যেতে পারে।
পৌর মেয়রের কয়েক দফা চিঠিতে ভবনের সম্প্রসারণ কাজ বন্ধের নির্দেশ উপেক্ষা করে নির্মাণ কাজ অব্যাহত রাখায় পৌর পরিষদ ও পৌরবাসী হতভম্ব হয়েছে। পৌর মেয়র জামিলুর রহমান মিরন বলেছেন, এটি অবৈধ স্থাপনা। স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়কে অবহিত করে খুব শীঘ্রই এটি ভেঙ্গে ফেলার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এই সংবাদটি 1,225 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •