Mon. Dec 9th, 2019

BANGLANEWSUS.COM

-ONLINE PORTAL

ডব্লিউটিওতে বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনা প্রসঙ্গে

1 min read
এ বছর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে জেনেভায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির পঞ্চম পর্যালোচনা। একাধিক কারণে পর্যালোচনাটি তাত্পর্যবাহী। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি বোধহয় এই যে, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে এটিই ডব্লিউটিওতে বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির শেষ পর্যালোচনা। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসির কাতার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বের হয়ে আসবে, তা এক রকম নিশ্চিত। আর ডব্লিউটিওর সদস্য হিসেবে বাণিজ্যনীতির পরের বা ষষ্ঠ পর্যালোচনাটি হবে ২০২৬ সালে। বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির চতুর্থ পর্যালোচনাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১২ সালে। সদস্য দেশগুলোর বিশ্ববাণিজ্যে হিস্যা বিবেচনায় নিয়ে এ পর্যালোচনা বৈঠক হয়ে থাকে। এতদিন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও জাপান—এ চার সদস্য দেশের বাণিজ্যনীতি দুই বছর অন্তর পর্যালোচনা করা হতো। বিশ্ববাণিজ্যে এদের হিস্যাই সবচেয়ে বেশি। তবে ২০১৯ সাল থেকে এদের বাণিজ্যনীতি তিন বছর অন্তর পর্যালোচনা করা হবে। বাণিজ্য হিস্যায় এদের পরের ১৬টি বড় সদস্য দেশের নীতি পর্যালোচনা হবে পাঁচ বছর অন্তর। আর বাকি সদস্য দেশগুলোর জন্য এ বিরতিকাল সাত বছর।
বলা দরকার, বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনা পদ্ধতি  (ট্রেড পলিসি রিভিউ মেকানিজম বা টিপিআরএম) হলো ডব্লিউটিওর একটি অবশ্য পালনীয় বিধান, যা কিনা সংস্থাটির সদস্যদের স্বচ্ছতা বাড়ায়। এ পর্যালোচনার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো একজন অন্যজনের বাণিজ্যনীতি ও বাণিজ্য-সংক্রান্ত চর্চা সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে ওয়াকিবহাল হতে পারে। পাশাপাশি ডব্লিউটিওর বিধিবিধান পরিপালন ও অনুসরণ করায় কোন দেশ কী অবস্থায় আছে, সে সম্পর্কেও একটা স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। বস্তুত ১৯৮৯ ডব্লিউটিওর পূর্বসূরি গ্যাটে (জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড বা জিএটিটি) স্বাক্ষরকারী পক্ষগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তারা যার যার বাণিজ্যনীতি গ্যাট কাউন্সিলের কাছে জমা দেবে পদ্ধতিগতভাবে পর্যালোচনার জন্য। এতে ১৯৯৪ সালে গ্যাটের উরুগুয়ে রাউন্ড বা পর্ব সমাঝোতায় যেসব চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ডব্লিউটিও আত্মপ্রকাশ করে, তার মধ্যে টিপিআরএম হলো অন্যতম। বিগত ৩০ বছরে ডব্লিউটিওর ১৬৪টি সদস্যের মধ্যে ১৫৫টি সদস্যের মোট ৪৮৫টি বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনা হয়েছে। প্রথম যে তিনটি দেশের বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনা করা হয়, সেগুলো হলো অস্ট্রেলিয়া, মরক্কো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৮৯ সালের ১৬ নভেম্বর তাদের বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনার প্রতিবেদন গ্যাট কাউন্সিলে দাখিল করা হয়েছিল। আর এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশিবার (১৪ বার) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনা করা হয়েছে ডব্লিউটিওতে। এরপর (১৩ বার) পর্যালোচনা হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের। বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির প্রথম পর্যালোচনাটি হয়েছিল গ্যাটের আওতায়। সেটা ১৯৯২ সালে। এরপর যথাক্রমে ২০০০, ২০০৬ ও ২০১২ সালে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পর্যালোচনাটি সম্পন্ন হয়। এবার সম্পন্ন হলো পঞ্চম পর্যালোচনাটি।
সাধারণত যে দেশের বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনা করা হয়, সে দেশকে তার শুল্ক ও অশুল্ক পদক্ষেপগুলো (এনটিএম), পণ্য আমদানি-রফতানির শুল্কায়ন ও ছাড়করণ প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি, আমদানি বিধিনিষেধ, রফতানি প্রণোদনা, বাণিজ্য অর্থায়নসহ বাণিজ্য ও অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত প্রদান করতে হয়। এসব তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার ও পর্যালোচনা করে ডব্লিউটিও সচিবালয় একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারও একটি লিখিত বিবৃতি দাখিল করে। এগুলোয় প্রতিবেদনে আগের পর্যালোচনার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশের বাণিজ্যসহ সার্বিক অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে একটি চিত্র তুলে ধরা হয়। এসব প্রতিবেদন ও বিবৃতি সভা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডব্লিউটিওর ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। অন্যদিকে বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলো পর্যালোচনাধীন দেশটির অর্থনীতি সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করে থাকে। এগুলো বেশির ভাগই আগে লিখিতভাবে জমা দেয়া হয়, যেন সভার আগেই উত্তরগুলো প্রস্তুত করা যায়। তারপর সভা চলাকালীন নতুন প্রশ্ন আসে। সব প্রশ্নের জবাব তাত্ক্ষণিকভাবে দেয়া সম্ভব না হলে সভা শেষ হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে উত্তর প্রদানের বাধ্যবাধকতা আছে। টিপিআরবির চেয়ারপারসনের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সভার আনুষ্ঠানিকতা হয়। এ সমাপনী বক্তব্যে সভার একটি সারসংক্ষেপ পাওয়া যায়। আর সভা শেষ হওয়ার ৩০ দিন পর সভার কার্যবিবরণী ও অবশিষ্ট প্রশ্নোত্তর ডব্লিউটিওর ওয়েবসাইটে দিয়ে দেয়া হয়। এভাবে বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়।
আবার বাণিজ্যনীতি বলতে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো লিখিত দলিলকে বোঝায় না। বাংলাদেশের কোনো সমন্বিত ও লিখিত বাণিজ্যনীতি নেই। আলাদা আলাদাভাবে আমদানি ও রফতানি নীতি আছে, যেগুলো মূলত আদেশ। আসলে বাণিজ্যনীতি কোনো বিচ্ছিন্ন বা স্বতন্ত্র নীতি নয়। এর সঙ্গে দেশের বিনিয়োগনীতি ও শিল্পনীতির যোগসূত্র আছে, আছে রাজস্বনীতি এমনকি মুদ্রানীতিরও সংযোগ। আবার বাণিজ্যনীতির অন্তর্গত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো শুল্কনীতি। বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট বিধিবিধানগুলোর প্রয়োগ ও বাণিজ্য-বিষয়ক চর্চাগুলো (ট্রেড প্র্যাকটিসেস) খুব গুরুত্বপূর্ণ, যা বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হয়। সব মিলিয়ে কাজটি বেশ কঠিন কিন্তু ফলদায়ী।
এবারের বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনা সভায় যোগ দিতে বাংলাদেশের ১৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল জেনেভা গিয়েছিল। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। বৈঠক শেষে দেশে ফিরে তিনি সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বৈঠকটি ছিল চমত্কার। কেননা বৈঠকে অংশগ্রহণকারী ডব্লিউটিওর সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করেছে, বাণিজ্য ব্যয় কমানোর জন্য গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। এতে কোনোই সন্দেহ নেই যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তথা গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিময়তা দেশের দারিদ্র্য হ্রাস ও বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক সূচকের উন্নতিতে বড় ধরনের অবদান রেখেছে। বাণিজ্যনীতির চতুর্থ পর্যালোচনাকালে (২০১২ সালে) তার আগের পর্যালোচনাকালীন সময় (২০০৬) থেকে ছয় বছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। আর পঞ্চম পর্যালোচনাকালে (২০১৯) এ গড় হার হয়েছে ৬ দশমিক ৮১ শতাংশ। বস্তুত এ ছয় বছরের মধ্যে (২০১২-১৮) দেশের প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের বৃত্ত ভেঙে ৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এ সময়কালের মধ্যেই বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ডে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে (২০১৫)। এ সময়কালেই বাংলাদেশ জাতিসংঘের মাপকাঠিতে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। ফলে ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি তকমামুক্ত হবে বাংলাদেশ।
কিন্তু এসব সাফল্যের প্রশংসা করার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ প্রবৃদ্ধি তথা সাফল্য ধরে রাখতে বাংলাদেশে বিভিন্ন সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে, বাণিজ্য আরো উন্মুক্ত করার কথা বলেছে, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে বিভিন্ন বাধা অপসারণের পরামর্শও দিয়েছে। বাংলাদেশ বাণিজ্যনীতি ও সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ১৫০টির বেশি প্রশ্ন পেয়েছে। আর এসব প্রশ্নের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে, বাণিজ্যনীতি কীভাবে পুনর্বিন্যাসের কথা ভাবছে, বিনিয়োগ আকর্ষণে কী ধরনের কৌশল নিতে যাচ্ছে। যেহেতু বাংলাদেশ এখন এলডিসি কাতার থেকে বেরিয়ে আসার শেষ ধাপে রয়েছে, সেহেতু এসব প্রশ্ন আসা খুব স্বাভাবিক ছিল।
এলডিসি-উত্তর সময়কালে তাত্ক্ষণিকভাবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাণিজ্য সুবিধা বা বাজার সুবিধার অবসানের ফলে হওয়া ক্ষতি নিরসন। বাংলাদেশ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান বাজার সুবিধা ভোগ করবে। তারপর অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো শুল্ক প্রদান করতে হবে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) হিসাব মতে, সার্বিকভাবে বাংলাদেশী পণ্য প্রায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়তি শুল্কের মুখে পড়বে এবং বছরে পণ্য রফতানিতে লোকসান গুনবে ২৭০ কোটি ডলার। ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) অস্ত্র বাদে সবকিছু (ইবিএ) বাজার সুবিধার আওতায় এখন ৯৭ দশমিক ৮০ শতাংশ বাংলাদেশী পণ্য শুল্কমুক্ত। উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পর এসব পণ্যে গড়ে ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ শুল্ক বসবে। আর প্রধান তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে তা হবে ১২ শতাংশ। একইভাবে কানাডায় পণ্য রফতানির গড় শুল্ক হবে ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানিতে এখন গড়ে ১৫ শতাংশ হারে শুল্ক দিতে হয়। এ হার প্রায় একই রকম থাকবে। আবার চীন, ভারতের মতো অগ্রসর উন্নয়নশীল দেশগুলো বাংলাদেশকে যেসব শুল্কছাড় সুবিধা দিয়েছে, সেগুলোও স্বাভাবিকভাবে বহাল থাকবে না। বাড়তি শুল্কের চাপের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়েই বাণিজ্যমন্ত্রী ডব্লিউটিওর সভায় এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও এ উত্তরণকে সুসংহত করতে বিদ্যমান বাজার সুবিধা ছয় থেকে ১০ বছরের জন্য বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এটা শুধু বাংলাদেশের একার জন্য নয়, বরং সব এলডিসির পক্ষে বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কার্যবিবরণী ৫৯/২০৯ অনুসরণ করার কথাও বলেছেন, যেখানে এলডিসির কাতার থেকে মসৃণভাবে উত্তরণের কৌশলের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। যদিও এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও ছয় থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বাজার সুবিধা পাওয়ার কোনো সুযোগ এখন পর্যন্ত নেই এবং ভবিষ্যতেও মিলবে এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবুও বাংলাদেশ একটি কৌশলগত প্রয়াস হিসেবে দাবিটি উত্থাপন করেছে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে ডব্লিউটিওর ১১তম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে বাংলাদেশ বিষয়টি উত্থাপন করেছিল এবং এলডিসির ঘোষণাপত্রে এটি স্থান পেয়েছিল। তখন যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ এলডিসির কাতার থেকে সাত থেকে ১২ বছরের মধ্যে বেরিয়ে আসবে। এটি বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যমান বাজার সুবিধা এবং বিশেষ ও পৃথকীকৃত সুবিধাগুলো যেন এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও বেশ কিছুদিন বজায় রাখা এবং তারপর পর্যায়ক্রমে অবসান ঘটানো হয়, সেজন্য ডব্লিউটিওকে নজর দিতে হবে।
পর্যালোচনা সভায় কোনো কোনো সদস্য বাংলাদেশের ভর্তুকি কাঠামো যৌক্তিকীকরণের বা ভর্তুকি কমানোর জন্য বলেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ পণ্য রফতানিতে ভর্তুকি দেয় নগদ সহায়তার আকারে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা, যার অর্ধেকই গেছে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতে। এর বাইরে শুল্কছাড় ও শুল্ক প্রত্যাবাসনের (ডিউটি ড্র-ব্যাক) মতো সুবিধাও আছে। বিগত অর্থবছরে মোট শুল্ক প্রত্যাবাসনের অর্থমূল্য ছিল প্রায় ১১০ কোটি টাকা। এছাড়া তৈরি পোশাকে এখন দশমিক ২৫ শতাংশ হারে উেস কর কর্তন করা হচ্ছে। আবার এটিই হলো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। তবে কৃষি ভর্তুকি বিষয়ে বাংলাদেশের ভাষ্য ছিল, বাংলাদেশ মূলত ‘সবুজ বাক্সের’ ভর্তুকি দেয়, যা মোটেও বাণিজ্যের জন্য ক্ষতিকর নয় এবং মোট ভর্তুকি ডব্লিউটিও নির্ধারিত সীমার (১০ শতাংশ) অনেক নিচে রয়েছে। আবার সভায় শ্রমিকের নিরাপত্তা ও কারখানার কর্মপরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন এসেছে। আসলে ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১০০-র বেশি নিরীহ শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় সারা বিশ্বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ভাবমূর্তি ও কর্মপরিবেশ ভীষণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এতে দেশের পোশাক কারখানাগুলোকে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়। গত ছয় বছরে বিভিন্ন কারখানার কর্মপরিবেশ যেমন উন্নত হয়েছে, তেমনি শ্রমিকের নিরাপত্তাও আগের তুলনায় বেড়েছে। তার পরও অনেক কিছু বাকি আছে। যদিও ডব্লিউটিও শ্রমমান ও শ্রমিকের বিষয়ে আলোচনার ফোরাম নয়, তার পরও বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তবে বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনায় স্বাভাবিকভাবেই দেশের শুল্ক কাঠামোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে, অন্যান্য এলডিসির ন্যায় বাংলাদেশও শুল্ক তথা আমদানি শুল্ককে রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচনা করে এবং বাণিজ্যনীতির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। বর্তমানে বাংলাদেশের গড় কার্যকর আমদানি শুল্কহার (গড় এমএফএন শুল্ক) হলো, ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ, আর শুল্কস্তর বা ধাপ রয়েছে ছয়টি। যদি শুল্ক স্তর বিবেচনায় নেয়া হয়, তাহলে দেখা যায় সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ হারে শুল্ক রয়েছে সাড়ে ৪৫ শতাংশ ট্যারিফ লাইন তথা আমদানিযোগ্য পণ্যের ওপর। এরপর ১৫ শতাংশ শুল্ক দেড় শতাংশ পণ্যের ওপর, ১০ শতাংশ হারে শুল্ক প্রায় ২২ শতাংশ পণ্যের ওপর, ৫ শতাংশ হারে শুল্ক প্রায় ১৭ শতাংশ পণ্যের ওপর, ১ শতাংশ হারে শুল্ক প্রায় ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ পণ্যের ওপর আর শূন্য হারে শুল্ক প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ পণ্যের ওপর। এর বাইরে অবশিষ্ট প্রায় আধা শতাংশ আমদানিযোগ্য পণ্যের ওপর সুনির্দিষ্ট শুল্ক রয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের ট্যারিফ লাইন বা আমদানিযোগ্য পণ্যের সংখ্যা হলো ৭ হাজার ১৩৫।
আবার বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশ পণ্যের ওপরই মূল্যানুপাতিক শুল্ক (অ্যাড ভালোরেম ট্যারিফ) আরোপ করা হয়। মানে কোনো পণ্যের শুল্কহার প্রযোজ্য হয় সেই পণ্যের মূল্যের (সাধারণত এফওবি মূল্য) ওপর। সে বিবেচনায় বাংলাদেশের শুল্ক কাঠামো বেশ স্বচ্ছ। তবে ডব্লিউটিওতে বাংলাদেশের বেঁধে দেয়া বা ঘোষিত সর্বোচ্চ গড় শুল্কহার (যা বাউন্ড ট্যারিফ হিসেবে অভিহিত) হলো ১৬০ শতাংশ (চলতি অর্থবছরের ট্যারিফ শিডিউলের সঙ্গে সমন্বয় করে; ১৯৯৫ সালে ছিল ১৫৫ দশমিক ৭০ শতাংশ)। অর্থাৎ গড় কার্যকর শুল্কহার ও গড় সর্বোচ্চ শুল্কহারের মধ্যে ব্যবধান হলো ১৪৭ দশমিক ২০ শতাংশীয় মাত্রা। আবার মোট আমদানিযোগ্য পণ্যের মাত্র ১৯ শতাংশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শুল্কহার বেঁধে দেয়া আছে। এসব কারণে বাংলাদেশের শুল্কনীতিকে অনেকটা অনিশ্চিত বলে মনে করা হয়, যদিও বাংলাদেশ বলতে গেলে কখনই কার্যকর ও ঘোষিত শুল্কহারের মধ্যকার বড় ব্যবধান ব্যবহার করেনি। এছাড়া কৃষিতে শুল্ক সংরক্ষণের গড় হার ১৮ দশমিক ১০ শতাংশ আর অকৃষিতে ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ।
অবশ্য গড় হার দিয়ে শুল্ক কাঠামোর জটিলতার মাত্রা পুরোপুরি বোঝা যায় না। তাছাড়া স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের শুল্কহার অগ্রসর উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বেশি থাকাটাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এবারের বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনায় আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশ শুল্কহার কতটা কমাবে ও শুল্ক কাঠামো কতটা সরল করবে, তা গুরুত্ব পেয়েছে। কেননা এলডিসির কাতার থেকে বেরিয়ে আসার বিবেচনাটা এখন অনেক বড়। এলডিসি-পরবর্তী সময়কালে বিশ্ববাজারে বাড়তি শুল্কের মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি নিজস্ব শুল্কহার কমানোর চাপ যে বাড়বে, তার স্পষ্ট আভাস মিলেছে এ সভা থেকে।
তবে এ পর্যালোচনা সভা বাংলাদেশকে বিদেশী বিনিয়োগের অন্যতম গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার একটি পরোক্ষ সুযোগও করে দেয়। এ সভার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড,  অর্থ-বাণিজ্য নীতিমালা, ব্যবসা-বিনিয়োগের সুবিধা-অসুবিধা ইত্যাদি বিষয় মোটামুটি গুছিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধির সামনে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে এর মধ্য থেকে অনেকেই বাংলাদেশকে একটু নতুনভাবে জানতে-চিনতে পেরেছে। সম্ভবত সে কারণেই বাংলাদেশে বিনিয়োগকারীদের কীভাবে মর্যাদা দেয়া হয়, সে সম্পর্কে প্রশ্ন এসেছে, প্রশ্ন এসেছে বিভিন্ন খাতে সংস্কার সম্পর্কে। এসব প্রশ্নের উত্তরে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের রাজস্ব বা করনীতি দেশী ও বিদেশী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না; বরং বিদেশী বেসরকারি বিনিয়োগ (উন্নয়ন ও সুরক্ষা) আইন, ১৯৮০ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সমান ও ন্যায্য মর্যাদা দেয়। তাছাড়া বাংলাদেশ থেকে মুনাফা প্রত্যাবাসন করা সহজ। তিনি আরো জানিয়েছেন, পুঁজিবাজার স্বল্পমেয়াদি বিদেশী বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত এবং প্রয়োজনে আরো উম্মুক্ত করা হবে। এখন দেশে বার্ষিক মোট প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি ডলার।
সভায় মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের বিষয়েও কথাবার্তা হয়েছে। বাংলাদেশ যদিও ডব্লিউটির বাণিজ্য-বিষয়ক মেধাস্বত্ব  (ট্রেড রিলেটেড অ্যাসপেকটস অব ইন্টালেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস বা ট্রিপস) চুক্তির বাধ্যবাধকতা থেকে এলডিসি হিসেবে মুক্ত। তবে এলডিসির জন্য ট্রিপসের ছাড় ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে। আর ওষুধ শিল্প খাতের জন্য ট্রিপসের বাধ্যবাধকতা অবশ্য পালনীয় হবে ২০৩৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। বস্তুত ট্রিপস বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে যাচ্ছে এলডিসি-পরবর্তী সময়কালে।
বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বাণিজ্যের অংশ বা হিস্যা এখন প্রায় ৩৫ শতাংশ, যা দুই দশক আগেও ছিল ২০ শতাংশের নিচে। আবার বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্তির হার (বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রবাসী আয় ও বিদেশী সাহায্যের মাধ্যমে) এখন প্রায় ৪৪ দশমিক ১০ শতাংশ, যা দুই দশক আগে ছিল ২৫ শতাংশ। এ সম্পৃক্তিতে বাণিজ্যের অবদানই সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার কোটি ডলার। সেবা খাতের বাণিজ্য যোগ করলে তা ১০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আর আগামী দিনগুলোয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ করার বিকল্প নেই। এজন্য নতুন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে হবে বাংলাদেশকে, যা ডব্লিউটিওতে এবারের বাণিজ্যনীতি পর্যালোচনা থেকে স্পষ্ট। সংক্ষেপে এগুলো হলো এলডিসি-পরবর্তী সময়কালের জন্য দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ, শুল্ক কাঠামো আরো সরল ও উদারীকরণ এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ।
লেখক: তানিম আসজাদ,অর্থনৈতিক সাংবাদিক

Copyright © Banglanewsus.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.