তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি :দুর্যোগ, সংকটে ও সম্ভাবনায়

প্রকাশিত:শনিবার, ১১ জুলা ২০২০ ০৯:০৭

জি এম ভূঁইয়া:
মানবসম্পদ উন্নয়ন, নাগরিকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, ডিজিটাল গভর্নমেন্ট ও আইসিটি শিল্পের বিকাশে বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির মূল ভিত্তি। এক যুগেরও কম সময়ে সফলতা উল্লেখযোগ্য। উদ্দেশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ডিজিটাল অর্থনীতিতে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করা। সে অঙ্গীকারে প্রতিটি গ্রাম হবে শহর। বর্তমানে চলমান মহাদুর্যোগ সমগ্র বিশ্বের মতো বাংলাদেশের প্রতিটি জনপদকে স্পর্শ করেছে। জনসমাগম, সাধারণ চলাচল ও অফিস-আদালত একেবারেই সীমিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী করোনাকালে ৩১টি নির্দেশনা প্রদান করেছেন। এ অনুশাসনের মাধ্যমে সব শ্রেণি-পেশাজীবী, কর্মহীন—এমনকি খেটেখাওয়া একটি মানুষও যেন অভুক্ত না থাকে সে বিষয়ে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন। করোনাকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রদত্ত নির্দেশনা সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ত্বরিত সমন্বয়ের সঙ্গে জনবান্ধবসেবা ও সহজলভ্য তথ্যপ্রযুক্তি।
বাংলাদেশের উদ্ভাবনের নেতৃত্ব আজ আর্ন্তজাতিকভাবে স্বীকৃত। এ স্বীকৃতির তালিকায় জাতিসংঘ রয়েছে। নাগরিকসেবাকে সহজীকরণের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে সরকারি দপ্তরসমূহের বিভিন্ন সেবা চিহ্নিত করে তার বর্তমান সেবাপদ্ধতি নিরূপণ করে তা সহজ থেকে সহজতর করা হচ্ছে। এ চর্চার অবতারণায় সেবা প্রদানে পরিবর্তন এসেছে, তাই সেবাগ্রহীতা এখন ঘরে বসেই সেবা গ্রহণ করতে পারে। বিশ্বব্যাপী মহামারির এ প্রাদুর্ভাবে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি বজায় রেখে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নিত্যদিনকার কার্যসম্পাদনে ঝুঁকি ও শঙ্কা থেকেই যায়; সে ক্ষেত্রে পরিবেশ, পারিপার্শ্বিকতা ও পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে আমাদের এ মহাদুর্যোগ মোকাবিলায় উদ্ভাবিত সেবা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। এ লকডাউনে ঘরে বসে একজন নাগরিক শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, সমাজসেবা, জরুরি প্রশাসনিক সেবা, ই-কমার্সের মাধ্যমে ক্রয়সহ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সব সেবা গ্রহণ করতে পারছে। অল্প শিক্ষিত বা তথ্যপ্রযুক্তি স্বনির্ভরহীন প্রান্তিক জনগণ পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত ৫ হাজার ৮৬৫টি ডিজিটাল সেন্টার থেকে তার প্রয়োজনীয় উদ্ভাবিত ও ডিজিটাল সেবা সহজে গ্রহণ করতে পারে। জরুরি পরিষেবা (ফায়ার, অ্যাম্বুলেন্স বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা) গ্রহণে ৯৯৯, সামাজিক সমস্যায় (ত্রাণ সহায়তা, খাদ্য ও ওষুধ প্রাপ্তিতে, পরিবেশের দূষণ ইত্যাদি) ৩৩৩, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের হটলাইন (আইইডিসিআর, দুর্যোগ, নারী নির্যাতন, দুর্নীতিসংক্রান্ত ইত্যাদি) নাগরিকের হাতের মুঠোয়। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এর আওতায় ভাতাভোগীরা নিজ অবস্থান থেকেই বিভিন্ন পেমেন্ট গেটওয়ের (বিকাশ, ইউক্যাশ, শিওর ক্যাশ, মাইক্যাশ ইত্যাদি) সুবাদে টাকা নগদায়ন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনায় ও সরাসরি তত্ত্বাবধানে সর্বশেষ প্রযুক্তিজ্ঞান ও সুবিধাসমূহকে কাজে লাগিয়ে নিত্যনতুন ডিজিটাল সার্ভিস ডিজাইন করা হচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের এটুআই কর্মসূচি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রদেয় স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে অনুসরণীয় কার্যক্রম ও স্বাস্থ্যসেবা জনগণের কাছে সহজে পৌঁছানোর জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরকে কারিগরি সহযোগিতা প্রদান করে যাচ্ছে। সোয়া কোটি পরিবারের ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলমান; যার ফলে ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা, ডুপ্লিকেশন ও দুর্নীতি হ্রাস করে প্রত্যেকটি পরিবারকে স্মার্টকার্ড (QR Code সম্বলিত) দেওয়া হবে। এ প্রাদুর্ভাবে উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন একাডেমি প্রতিষ্ঠাকরণ (আইডিয়া) প্রকল্পের ফুড ফর নেশনের আওতায় স্টার্ট-আপ কর্তৃক কৃষকের ফলিত সবজি মাঠ থেকে সরাসরি সংগ্রহ করে নাগরিকের বাড়ি পৌঁছানো হয়। এরকম আইডিয়া প্রকল্পের স্টার্ট-আপ কর্তৃক হেলথ ফর নেশনের মাধ্যমে রোগীর প্রেসক্রিপশন ও সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ বাড়ি বাড়ি পৌঁছানো হচ্ছে। এছাড়া, এ বিভাগের বিভিন্ন কর্মসূচির পরোক্ষ সহযোগিতায় বেসরকারি পর্যায়ে ওয়ালটনের ভেনটিলেটর ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আক্রান্ত রোগীদের কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন সরবরাহের জন্য জীবন রক্ষাকারী ভেনটিলেটর স্পন্দন ও বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক উদ্ভাবিত স্বল্পমূল্যের কোভিড-১৯ টেস্ট কিট উল্লেখযোগ্য।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের চারটি স্তম্ভকে লক্ষ্য রেখে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। লক্ষ্য হলো—অবকাঠামো স্থাপনপূর্বক দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে উপযুক্ত ও সময়োচিত ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করা। বিদ্যমান অবকাঠামোগত স্থাপনা ও ব্যবস্থাপনাকে কাজে লাগিয়ে এ মহামারির সময়ে দ্রুত, সহজ ও নিরাপদে সেবা গ্রহণ করা এখন ইচ্ছামাত্র। এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে বর্তমান দুর্যোগ মোকাবিলায় নাগরিককে অনেক পথ অতিক্রম করে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় ও যাতায়াতে ভোগান্তি সহ্য করে কোনো সেবা গ্রহণ করতে হয় না; সেবা এখন ঘরের আঙ্গিনায়, ক্ষেত্রবিশেষ হাতের মুঠোয়। এ অবস্থানকে আরো সুদৃঢ় করতে চাই দ্রুত ও সময়োচিত যুগান্তকারী পদক্ষেপের সদ্ব্যবহার। প্রয়োজন সমাজের সব অংশীজনের সামষ্টিক সমন্বয়। তাই বিদ্যমান দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের দেওয়া নির্দেশনা বাস্তবায়নে ডিজিটাল ভাবনার বিকল্প নেই।
n লেখক: সরকারি কর্মকর্তা

এই সংবাদটি 1,227 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •