দাবি না মানলে নির্বাচন হতে দেয়া হবে না: রাজশাহীতে মির্জা ফখরুল

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবি না মানলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে দেয়া হবে না। শুক্রবার বিকালে রাজশাহীর আলিয়া মাদ্রাসার মাঠে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিভাগীয় জনসভায় এ কথা বলেন তিনি।

নির্বাচনের সমান মাঠ তৈরি না হওয়ায় ঘোষিত তফসিল গ্রহনযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।একাদশ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিকালে মাদ্রাসা মাঠে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জনসভায় বিএনপি মহাসচিব এই মন্তব্য করেন।তিনি বলেন, ‘‘ আমাদের কথা খুব পরিস্কার নির্বাচনের সমান মাঠ তৈরি করতে হবে, সকল দলকে সমান অধিকার দিতে হবে, দেশনেত্রীকে মুক্তি দিয়ে তাকে কাজ করতে দিতে হবে।”
‘‘ অন্যথায় কোনো নির্বাচন তফসিল গ্রহনযোগ্য হবে না।’’

জনসভার প্রধান অতিথি ফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন অসুস্থতার জন্য রাজশাহী যেতে না পারলেও মোবাইলে জনসভার উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনের ‘তড়িঘড়ি’ করে তফসিল ঘোষণার নিন্দা জানান।তিনি বলেন, ‘‘ তড়িঘড়ি করে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। এটা জনগনকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা, এটা সংবিধান পরিপন্থি, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কাজ হয়েছে বলে আমরা মনে করি।”

বেলা ২টায় শুরু হয়ে এই জনসভা শেষ হয় সন্ধ্যা সোয়া ৫ টায়। বিকালে সাড়ে তিনটার মধ্যে মঞ্চের সামনে ও ডানে-বামে নেতা-কর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতিতে জনসভা জনসমুদ্রে রূপ নেয়। হাজার হাজার মানুষের ঢল মাঠ ছাড়িয়ে আশপাশের সড়ক-গলিতে গড়ায়।

জনসভাটি ৭ দফা দাবিতে হলেও নেতা-কর্মীদের অনেকে হাতে দেয়া গেছে বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক ধানের ছড়া ও জাতীয় পতাকা। জনসভায় বিভিন্ন সময়ে খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে নেতা-কর্মীরা মুহুর্র মুহুর্র শ্লোগান দেয়। মাঠে দুই পাশের দেওয়ালে টানানো হয়েছে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ছবি সম্বলিত ব্যানার।

গত ১৩ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর এটি তাদের চতুর্থ জনসভা।জনসভার মঞ্চে লেখা ছিলো- ‘‘মঞ্চের ব্যানারে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহনযোগ্য নির্বাচন, ‘মাদার অব ডেমোক্রেসী’ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তিসহ ৭ দফা দাবি’ এই কথা লেখা আছে।

সরকারের দমননীতির সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘‘ আজকে মামলা-মোকাদ্দমা দিয়ে সারাদেশকে অস্থির করে তুলেছে। এটা ছাড়া তাদের কোনো অস্ত্র নাই। মামলা একটা অস্ত্র পেয়েছে, সেই অস্ত্র দিয়ে ঘায়েল করতে চায়। ঘায়েল যে করতে পারিনি আজকে জনসভায় তার প্রমাণ।”

‘‘ তারেক রহমান আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তিনি আজকে বিদেশে নির্বাসিত। মিথ্যা মামলায় তাকে সাজা দিয়ে সেখানে নির্বাসিত করে রাখা হয়েছে। আজকে হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে মিথ্যা মামলা দিয়ে আটক করে রাখা হয়েছে, মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে।”

রাজশাহী জেলা নেতা আবুল খায়ের চাঁদসহ নেতা-কর্মীদের মুক্তির দাবিও জানান বিএনপি মহাসচিব।খালেদা জিয়াসহ নেতা-কর্মীদের মুক্তি না হলে নির্বাচন গ্রহনযোগ্য হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব বলেন, ‘‘জেগেছে জনতা। সরকারকে বলব, দেখে যান রাজশাহীর মাদ্রাসা মাঠ। পুলিশ দিয়ে রাস্তা-ঘাট বন্ধ করে দিয়েছেন তারপরও মাদ্রাসা মাঠে জায়গা নাই।”‘ আমাদের স্পষ্ট কথা, ‘দাবি মানতে হবে। জান দেবো, দাবি আদায় করে ছাড়বো। এবার আর রক্ষা নাই। এবার হবে ভোটের লড়াই, এই লড়াইয়ে গণতন্ত্রের। এই লড়াইতে জিততে হবে।” খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ ৭ দফার দাবির চলমান আন্দোলন সারাদেশে ‘গ্রামে-গঞ্জে’ ছড়িয়ে দেয়ার আহবানও জানান রব।

এলডিপির সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল অলি আহমেদ বলেন, ‘‘ নির্বাচন হবে কিনা, নির্বাচনে আমরা অংশগ্রহন করবো কিনা এখনো সেই সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে সেটা হচ্ছে আমাদের বেগম জিয়াকে মুক্ত করতে হবে।”‘‘ তরুনদের প্রতি বলব, আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যেভাবে জান দিতে গিয়েছিলাম আপনাদেরকে সেই জান দেয়ার কথা বলব না। কিন্তু রাস্তায় তো সকলে দাঁড়াতে পারেন বেগম জিয়ার জন্য। একটু হাত তুলে প্রশাসনকে দেখান, প্রধানমন্ত্রী দেখুক- কতগুলো হাত, কতগুলো লোক। আপনারা ক্ষমতা পেয়ে গেলে এতোগুলো লোক আসবে না। একটু জোরে তালি বাজান সরকার শুনক।”

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘‘ আপনারা যদি খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে চান তাহলে ঐক্যফ্রন্টকে অটুট রাখতে হবে। বেগম জিয়ার মুক্তির জন্য ছটফট করতে হবে না। তাহলে আপনাদের লড়তে হবে। লড়তে হলে মানতে হবে। এবার যখন
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘‘ আজকের জনসভায় খালেদা জিয়ার মুক্তির শ্লোগান উঠেছে। কিন্তু একবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ফ্রন্টের নেতাদের পক্ষে শ্লোগান উঠেনি।”‘‘ আমি মনে করি বাংলাদেশের রাজনীতি বলতে খালেদা জিয়া। বাংলাদেশে এমন কোনো জায়গা নেই তাকে বন্দি করে রাখা সম্ভব নয়। অবশ্যই খালেদা জিয়ার মুক্তি হবেই।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘‘ আগামী নির্বাচন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া, বিএনপিকে ছাড়া এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছাড়া দেশে অংশগ্রহন নির্বাচন হতে পারে না, কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না।”‘‘ এখন আমাদের দায়িত্ব শেখ হাসিনার বাক্স থেকে গণতন্ত্রকে উদ্ধার করা। আসুন আমরা যে ৭ দফা দিয়েছি, সেই ৭ দফার আন্দোলন চালিয়ে যাই। এই দাবি পুরনের মাধ্যমেই আগামীতে দেশে অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন হবে ইনশাল্লাহ।”

স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, ‘‘আমরা সংঘাত-সংঘর্ষ এড়াতে আলোচনার পথ বেঁছে নিয়েছিলাম কিন্তু সংলাপ সফল হয়নি। কারণ এই সরকার ক্ষমতা ছাড়তে চায় না।”‘‘ আমাদেরকে প্রস্তুতি নিতে হবে। সরকারকে বিনা চ্যালেঞ্জে আমরা ছেড়ে দিতে পারি না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আর কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না।”

স্থায়ী মির্জা আব্বাস বলেন, ‘‘ আমরা নির্বাচনে যেতে চাই। কিন্তু সরকার যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে তাতে নির্বাচনে যাওয়া সম্ভব নয়।”

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, ‘‘ সিলেটে চাইলাম আলিয়া মাদ্রাসা দেননি, চট্টগ্রামে লালদিঘী ময়দানে চাইলাম দিলেন রাস্তায়। রাজশাহীতে পুলিশ কীরকম হয়রানি করা হয়েছে। আমরা গাড়িও আটকিয়ে বাঁধা দেয়া হয়েছে। এই পুলিশ হয়রানি বন্ধ করুন।”

নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘‘ আমরা কোনো হিংসা চাই না। ভোটের মতো ভোট করেন, আমরা ভোট করতে চাই। পারবেন না সবাই। সবাই মিলে নৌকা যাতে জিততে না পারে তার জন্য ভোট দেবেন না, ঐক্যবদ্ধ হবেন না, ঘর থেকে বেরুবেন না, ওই নৌকার পতন ঘটিয়ে তবেই ছাড়বো সেই পথে আমাদের যেতে হবে।”

‘‘নির্বাচন কমিশনকে এখনো বলব, ২৩ মার্চ ডিসেম্বর না করে ২৩ জানুয়ারি করলে সমস্যা কোথায়? তফসিল বদলান। মাত্র ১০ দিনের মধ্যে তিন শ আসনে আমরা এই জোট নির্বাচনে অংশ গ্রহন করবো। আমরা আন্দোলন করছিলাম সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্যে। আর আপনারা এমন একটা ফাঁদ পেতেছেন যাতে আমরা নির্বাচনে যেতে না পারি। ওই ফাঁদ, ওই বেড়াজাল, ওই অত্যচার ছিন্নভিন্ন আমাদেরকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।”

চেয়াপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মিজানুর রহমান মিনুর সভাপতিত্বে ও মহানগর মহানগর সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলনের পরিচালনায় জনসভায় জেএসডির আবদুল মালেক রতন, এম এ গোফরান, গণফোরামের, সুব্রত চৌধুরী, জগলুল হায়দার আফ্রিক, মোশতাক আহমেদ, রফিকুল ইসলাম প্রতিক, নাগরিক ঐক্যের এসএম আকরাম, শহীদুল্লাহ কায়সার, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের হাবিবুর রহমান তালুকদার বক্তব্য রাখেন।

বক্তব্য রাখেন বিএনপির গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, আমীনুল হক, আমানউল্লাহ আমান, অধ্যাপক শাহজাহান মিয়া, হাবিবুর রহমান হাবিব, কামরুল মুনির, আবদুস সালাম, হারুনুর রশীদ, নাদিম মোস্তফা, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, রাজশাহীর সাবেক সিটি মেয়র কেন্দ্রীয় নেতা মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, সাবেক সাংসদ সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া।

গণস্বাস্থ্য সংস্থার ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ২০ দলীয় জোটের শরিক এলডিপির রেদোয়ান আহমেদ, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জমিয়তের উলামায়ের ইসলামের মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী, বিকল্পধারা বাংলাদেশ এর একাংশের শাহ আহমেদ বাদল বক্তব্য দেন। জনসভায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার সিনিয়র মন্ত্রী মশিয়ুর রহমান যাদু মিয়ার মেয়ে পিপলস পার্টি অব বাংলাদেশ(পিপিবি) আহবায়ক রিটা রহমানকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। গতকাল তার দল ২০ দল যোগ দেয়।

জনসভায় বিএনপির হেলালুজ্জামান লালু, আবদুল লতিফ খান, আবদুল মান্নান তালুকদার, সিরাজুল হক, মাহমুদা হাবিবা আবদুল মমিন তালুকদার খোকন, আকবর আলী, সেলিম রেজা হাবিব, নজরুল ইসলাম আজাদ, ইশতিয়াক আজিজ ‍উলফাত, হাসান জাফির তুহিন, ভিপি সাইফুল ইসলাম, প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা, রফিকুল করিম খান পা্পপু, ফয়সাল আমিন, মজিবুর রহমান, আনোয়ার হোসেন বুলু, পারভেজ আরিফিন সিদ্দিকী, জনগোমেজ, দেবাশীষ রায় মধু, খায়রুন্নাহার,শায়রুল কবির খান, শামসুদ্দিন দিদার প্রমূখ নেতারা ছিলেন। জনসভা উপলক্ষে মাদ্রাসা মাঠের চারপাশে ব্যাপক সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।