দিলওয়ার

প্রকাশিত:শনিবার, ৩০ জুলা ২০১৬ ০৪:০৭

দিলওয়ার

Dilwar kobi_0তাপসী চক্রবর্তী লিপি ::: দিলওয়ার। কেবলমাত্র একটি নাম নয়। মানুষের আশা-আকাঙ্খার মূর্ত প্রতীক। অধিকার বঞ্চিত মানুষের আলোর শিখা। অন্তরের মানুষ। মানুষের অন্তরের নীবিড় ছায়ায় তার বাস। তিনি গণমানুষের কবি।

বাংলা কাব্য সাহিত্যে অনন্য প্রতিভার অধিকারী দিলওয়ার। সিলেটের ভার্থখলায় ১৯৩৭ সালের ১লা জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। কীন ব্রিজের দক্ষিণ পারে সুরমা নদীর তীর ঘেষা তার বাড়ি। বাল্য-কৈশোর এমনকি শেষদিন পর্যন্ত এ বাড়িতেই তিনি কাটিয়েছেন তার জীবন। চির নিদ্রায় তিনি এখানেই ঘুমিয়ে আছেন।

বাল্য, কৈশোর, বার্ধক্যেও শুনেছেন সুরমার কলতান, মাঝি-মাল্লার উদাস কণ্ঠস্বর। কীন ব্রিজে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয়ের অপরূপ সৌন্দর্য যেমন অবলোকন করেছেন তেমনি কুলি-মজুর-শ্রমিকের ঘামে ভেজা শরীরও প্রত্যক্ষ করেছেন। তাই সাধারণ মানুষের আনন্দ-বেদনা ও স্বপ্ন সম্ভাবনা তার কাব্য সাধনার মূল উপজীব্য।

মানবতাবাদী বিবেক সম্পন্ন মুক্ত বুদ্ধির অধিকারী কবি দিলওয়ার। তার কাব্যে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, বেদনা, অধিকার, স্বপ্ন প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি মানুষকে ভালবাসেন- এ ভালবাসা অকৃত্রিম সৎ ও আন্তরিক।

“হে মন প্রফুল্ল হও। শোন তার মৃত্যুহীন গান মানুষ সকল সত্য। এই সত্যে আমি অনিধান।” বাংলার মানুষের আনন্দ বেদনার নিত্য সহচর কবি দিলওয়ার।

সাধারণ মানুষের দুঃখ বেদনা তাকে নাড়া দিত। তাই দৃঢ় প্রত্যয়ে আর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরে তিনি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, রাজা বাদশা, অলৌকিক মানুষও মারা যান। কারণ, মানুষ মরণশীল। কিন্তু তিনি জানতেন, মেহনতী মানুষের কথা। তাদের মানবেতর জীবনের কথা। তাই দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন-

“রাজা-বাদশা এমন কী
অলৌকিক মানুষরাও মারা
যান। কিন্তু মেহনতী
মানবতার মৃত্যু নেই।”

তার কবিতায় প্রকাশিত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। দেশ, মাটি আর দেশের মানুষকে কেন্দ্র করে অর্থাৎ গণ মানুষের মুক্তির আহ্বান তার কবিতায় প্রকাশিত। এ আহ্বান দেশ থেকে দেশান্তরে, যুগ থেকে যুগান্তরে ছুটে চলে। সুনিষ্ট সনেট কাব্যের ‘জনৈক মানুষের স্বীকারোক্তি’ কবিতায় বলেন-

‘সানন্দে স্বীকার করি, এই আমি বহু, বহুবিধ
দোষ ত্র“টি নিয়ে চলি। কথা বলি, লিখি। নানারূপ
চিত্রের কল্পনা করি। মানব মনের অন্ধ কূপ
সাগ্রহে দেখতে যাই। লক্ষ্য করি যন্ত্রণা ‘লিবিডো’।”

এখানেই কবি দিলওয়ারে কবি মানস ফুটে ওঠে। তার অহংকার ছিল, গর্ব ছিল প্রথমত মানুষ এবং জাতিতে বাঙ্গালী। তাই নির্ভীক চিত্তে তিনি বলেছিলেন- “আমার জন্ম জন্মান্তরের বিনীত অহংকার হচ্ছে আমি মানুষ, আমি বাঙ্গালী।”

যেদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন সেই দেশেকে তিনি প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন। শুধু দেশ নয় দেশের মানুষের প্রতি ছিল অফুরন্ত ভালবাসা। তাই দেশকে ‘দুর্জয় বাংলা’ আর দেশের মুক্তিকামী জনতাকে ‘দুর্জয় জনতা’ বলেছেন।

শুধু কাব্য নয় সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তিনি বীর বেশে বিচরণ করেছেন। সিলেট বেতার কেন্দ্র উদ্বোধন হয় তার লেখা ‘তুমি রহমতের নদীয়া দোয়া কর মোরে হযরত শাহজালাল আউলিয়া’ গান দিয়ে। তার অনেকগুলো গণসঙ্গীত আছে যা মানুষকে জাগরিত করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তার এ গানটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল-

“আয়রে চাষী মজুর কুলি মেথর কুমার কামার
বাংলা ভাষা ডাক দিয়েছে বাংলা তোমার আমার।”

বাংলার মাটিতে হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ খ্রিস্টানের মনকে তিনি এক সুতায় বাঁধতে চেয়েছিলেন। তাই একটি গানে বলেছেন-‘সব মন এক মন সব প্রাণ এক প্রাণ বুক তার বিশ্বের আয়না।’ তার বেশ কিছু গানে ওস্তাদ রাম কানাই দাস সুরারোপ করেছিলেন এবং সিলেট জেলা উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর শিল্পীরা তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন শহর-বন্দর-গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছে। কবি ‘আমরণ মুক্তিযুদ্ধ নামে নাটক লিখেছিলেন। এই নাটকের একটি গান ছিল যা খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

“মা আমার গলা ধরে বলেছে
হয়নিরে শেষ তোর যুদ্ধ
হয়নিরে সব প্রাণ শুদ্ধ
মা, আমার গলা ধরে বলেছে।”
[সুর-ওস্তাদ রাম কানাই দাস, পরিবেশনা- সিলেট জেলা উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী]

প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার কবি দিলওয়ার। একাত্তরে অসহযোগ আন্দোলনের সময় ক্ষুদে কলেবর ছড়া সংকলন ‘কাতুকুতু’ প্রকাশিত হয়। সংকলনটির সহ সম্পাদক ও প্রকাশক সেলু বাসিত আর সম্পাদক ছিলেন মাহমুদ হক।”

৯ চৈত্র ১৩৭৭/২৩ মার্চ ১৯৭১ এ প্রকাশিত সংকলনটি উনিশ শ একাত্তরের গণ আন্দোলনের স্বাধীনতাকামী শহীদ বাঙালিদের স্মৃতিতে নিবেদিত।” এই কাতুকুতুকে কবি দিলওয়ার ছড়া লিখেছিলেন।
[লেখক: বেলাল মোহাম্মদ, সোপান ১লা বৈশাখ ১৪০৯ বাংলা]

সমস্বর লেখক ও শিল্পী সংস্থা নামে একটি সংগঠন দিলওয়ারের উদ্যোগে গড়ে। ‘সমস্বর’ নামে সংকলনও প্রকাশিত হত। ঊনসত্তরের গণ আন্দোলন ও একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে এ সংগঠনটির বিশেষ ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী সিলেট জেলা শাখার প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১লা বৈশাখ ১৩৮২ বাংলায়।

এ সম্মেলনে কবি দিলওয়ারকে সিলেট জেলা উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি নির্বাচন করা হয়। তারই যোগ্য নেতৃত্বে বেশ কয়েক বছর উদীচী সিলেট শাখা সৌরভে গৌরবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালায় ডক্টর কাজী আব্দুল মান্নান-এর সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বলা যায় …” অতএব মানুষের অপ্রতিহত অভিযাত্রায় যারা পদচিহ্ন রেখে যাচ্ছে, সেই গতিশীল, ক্রিয়াশীল, কর্মী মানুষের পাশে শিল্পী দাঁড়িয়ে আছেন, সেই শিল্পী দিলওয়ার, সেই শিল্পী রবীন্দ্রনাথ, রমাঁ রোলাঁ, সেই শিল্পী গোর্কীও।”

গণমানুষের কবি দিলওয়ার ২০১৩ সালের ১০ অক্টোর ভার্থখলায় তারাই নিজের বাড়ি ‘কবি তীর্থে’ মৃত্যুবরণ করেন। কবির ইচ্ছেনুযায়ী নিজের ঘরের কাছে চিরনিদ্রায় শায়িত হন। নশ্বর দেহের অবসান হয়েছে সত্যি কিন্তু অবিনশ্বর সাহিত্য কর্ম যুগ যুগ ধরে পাঠকের অনুভূতিতে জাগরুক থাকবে। তিনি বেঁচে থাকবেন অসংখ্য পাঠকের হৃদয়ে।

 0

Google +0  0  0

 

সর্বশেষ

এই সংবাদটি 1,247 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •