দুপুর পর্যন্ত সংঘর্ষ পিটুনি, আহত ৩৫

ডেস্ক নিউজ: নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত বাণিজ্যমন্ত্রী ও শ্রম প্রতিমন্ত্রীর আশ্বাস, মজুরি পর্যালোচনা কমিটি গঠন ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হলেও রাজপথ ছাড়েনি পোশাক শ্রমিকরা। বেতন বৃদ্ধি ও বেতনকাঠামোর বৈষম্য নিরসনের দাবিতে গতকাল শনিবারও রাজধানী, সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছে। এদিন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয়েছে কমপক্ষে ৩৫ শ্রমিক। যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধেও শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের মূল মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পোশাক কারখানার মালিকরা।

টানা ষষ্ঠ দিনের মতো গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর টেকনিক্যাল এলাকার অ্যাপারেল এক্সপোর্ট লিমিটেড কোম্পানি নামে একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সড়কে নেমে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ সময় তারা কয়েকটি যানবাহনে ভাঙচুরও চালায়। শ্রমিকদের অভিযোগ, সকালে চন্দন নামে এক হেল্পার সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী বেতন দাবি করলে তাকে মারধর করা হয়। এতে তার মাথা ফেটে যায়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে। খবর পেয়ে বেলা ১১টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। শ্রমিকদের সঙ্গে দফায় দফায় কথা বলে তাদের সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করে।বেলা ১টার দিকে বহিরাগত কিছু যুবক শ্রমিকদের ধাওয়া দেয় ও মারধর করে। এতে পাঁচ শ্রমিক আহত হয়। এ ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। বেলা ২টার দিকে মিরপুর রোডে যান চলাচল শুরু হয় বলে জানান দারুসসালাম থানার ওসি শেখ মো. সেলিমুজ্জামান। মিরপুর ১৪ নম্বরেও শ্রমিকরা সকালে সড়ক অবরোধ করে। ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পর দুপুরে শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়া হয়।

আশুলিয়া : এদিন সাভারের আশুলিয়ায় সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে অন্তত ৩০টি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। দুপুর ২টার পর আবার রাস্তায় নামে তারা। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ লাঠিচার্জ, জলকামান ও টিয়ার শেল ব্যবহার করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে। শিল্পপুলিশের পরিচালক সানা শামীনুর রহমান বলেন, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে শিল্প এলাকায় ৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রস্তুত রয়েছে। বিক্ষোভ থামাতে শনিবার সকাল থেকেই বিজিবি, র‌্যাব, থানা পুলিশ ও শিল্পপুলিশ মোতায়েন করা হয়।

সকালে আবদুল্লাহপুর বাইপাস সড়কের ফ্যান্টাসি কিংডমের সামনে ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা রড-লাঠি নিয়ে প্রায় ২০টি গাড়ি ভাঙচুর করে। এ সময় পুলিশের লাঠিচার্জে প্রায় ৩০ শ্রমিক আহত হয়। তাদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। দুপুরের পর নরসিংহপুর এলাকায় হা-মীম গ্রুপ, ডেকো গ্রুপ ও শারমিন গ্রুপের কয়েক হাজার শ্রমিক ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে। হা-মীম গ্রুপের শ্রমিক শারমিন, পারভিন ও নাজমা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেতন বৈষম্যের অভিযোগে শ্রমিকরা আন্দোলন করায় কারখানার স্টাফ ও ভাড়াটে লোকজন তাদের মারধর করে আটকে রাখে। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা জাকির হোসেন নামে এক স্টাফকে মারধর করে কারখানার ভেতরের পুকুরে ফেলে দেয়। পরে কারখানার লোকজন তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় নারী ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি করে।

আন্দোলনে অংশ না নেওয়ায় কয়েকটি কারখানার শ্রমিকদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটেছে। অন্য কারখানার শ্রমিকরা এ হামলা করে বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীরা। বেরন এলাকার শারমিন গ্রুপের এএম ডিজাইন কারখানার শ্রমিক আলামিন বলেন, দুপুরে খাবার খেতে বাসায় যাওয়ার পথে পাশর্^বর্তী স্টারলিংক কারখানার আন্দোলনকারী শ্রমিকরা তাদের মারধর করে।

মারধরে যুবলীগ নেতা : শ্রমিকদের জোর করে কাজ করতে বাধ্য না করায় আশুলিয়ায় এসবি নিটিং লিমিটেড কারখানার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মুরাদ সরকারকে (২৪) মারধরের অভিযোগ উঠেছে থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মঈনুল ইসলাম ভুঁঁইয়ার বিরুদ্ধে। গুরুতর অবস্থায় আহত ওই শ্রমিককে বাইপাইল এলাকার এশিয়ান হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কারখানায় ভর্তি করা হয়েছে।

মুরাদ জানান, বিকেলের দিকে বগাবাড়ি এলাকায় তার ডিশ অফিসে বসে থাকা অবস্থায় আশুলিয়া থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও ধামসোনা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মঈনুলের ড্রাইভার কলার ধরে তাদের অফিসে নিয়ে যায়। পরে তাকে রড দিয়ে পিটিয়ে আহত করে। এরপর তার ক্ষতস্থানে ব্যথানাশক স্প্রে করে এবং ওষুধ খাইয়ে এ বিষয়ে কাউকে না জানানোর হুমকি দেয়। আহত শ্রমিকনেতার স্ত্রী অভিযোগ করেন, যুবলীগ নেতা ওই কারখানায় ঝুট ব্যবসা করেন।

জানতে চাইলে মঈনুল ইসলাম মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, তাকে ডেকে নিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (ওসি তদন্ত) জাবেদ মাসুদ বলেন, এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

টঙ্গীতে গ্রেপ্তার ৫ : গাজীপুরের টঙ্গীতে পোশাক কারখানায় ভাঙচুর ও সহিংসতার অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১। তারা হলোÑ মো. শামীম (২৪), মো. রোমান (২৭), আলমগীর হোসেন (২৪), আবু সাঈদ (৩২) ও সোহেল সরকার (২৪)। র‌্যাব জানায়, সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করে একশ্রেণির সন্ত্রাসী পোশাক খাতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। এ ঘটনায় জড়িতের অভিযোগে টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বাড়ি ময়মনসিংহ, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ ও ফেনী জেলায়।

অর্ধশত পোশাক কারখানায় ছুটি : শ্রমিক অসন্তোষের মুখে এদিন মহানগরসহ জেলার প্রায় অর্ধশত কারখানায় ছুটি দেয় কর্র্তৃপক্ষ। গাছা থানার ওসি মো. ইসমাইল হোসেন, বাসন থানার ওসি মুক্তার হোসেন ও টঙ্গী (পূর্ব) থানার ওসি মো. কামাল হোসেন জানান, শনিবারও গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করে। কোনাবাড়ী, টঙ্গী, গাজীপুরা, ভোগড়া, চান্দনা চৌরাস্তা, ইসলামপুর, সাইনবোর্ড, বোর্ডবাজার ও নলজানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পোশাক কারখানার শ্রমিকরা মিছিল নিয়ে কারখানা থেকে বেরিয়ে আসে। সকালে তারা ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ ও গাড়ি ভাঙচুর শুরু করলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে শিল্পপুলিশ, থানা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন আহত হয়। শিল্পাঞ্চল পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাহেব আলী পাঠান জানান, সহিংসতা এড়াতে জেলার প্রায় অর্ধশত পোশাক কারখানায় শনিবারের জন্য ছুটি দেয় কর্র্তৃপক্ষ।