নওগাঁ ৫ বছরে পাটের আবাদ কমেছে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর

প্রকাশিত:রবিবার, ১৬ আগ ২০২০ ০৮:০৮

নওগাঁ ৫ বছরে পাটের আবাদ কমেছে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর

তমাল ভৌমিক, নওগাঁ :
উত্তরের শষ্য ভান্ডার নামে পরিচিত জেলা নওগাঁয় দিন দিন কমছে পাটের আবাদ। গত ৭/৮ বছর পাটের চাষ করে নায্য মূল্য না পাওয়ায় গত ৫ বছরে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ কমেছে। কৃষকরা ও পাট শিল্প রক্ষা আন্দোলনের সাথে জড়িত নেতা মনে করছেন, পাট কেনা বেচা করতে বড় বাজার গড়ে তুলতে না পারা, পাট শিল্প কারখানা বন্ধ, শিল্প গড়ে তুলতে না পারা, জেলা কৃষি বিভাগের অসহযোগিতা এরই মধ্যে অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন পাট চাষ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার পাট চাষে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে না পারলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পাঠ চাষ প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে। সোনালী আঁশের সোনালী সেই দিন এখন শুধুই অতীত হতে চলছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে নওগাঁয় ৬ হাজার ১০হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত ১৯ সালে ৬ হাজার ১শ’ ৫০হেক্টর, ১৮ সালে ৬ হাজার ৯শ’ ৩০হেক্টর, ১৭ সালে ৮ হাজার ২৫হেক্টর এবং ১৬ সালে ৮ হাজার ৮শ’ ৬০হেক্টর জমিতে পাট পাষ করা হয়েছিল। কৃষি বিভাগের হিসেব মতো গত ৫ বছরে নওগাঁয় ২ হাজার ৭শ’ ৯৬ হেক্টর জমিতে পাট চাষ কমেছে। প্রতি বছর গড়ে ৫শ’ ৬০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ কমছে নওগাঁ।
জেলার ১১টি উপজেলায় কমবেশি পাটের আবাদ হয়ে থাকে। তবে চলতি মৌসুমে জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাট চাষ করা হয়েছে মান্দায় ১ হাজার ৭শ’ ৪৫ হেক্টর। বদলগাছীতে ১ হাজার ৫শ’ ৫০ হেক্টর, ধামইরহাটে ১ হাজার ৩শ’ ৬০ হেক্টর, নওগাঁ সদরে ৮শ ১০ হেক্টর উল্লেখ্যযোগ্য।
জেলায় ভারতীয় উচ্চ ফলনশীল তোষা জাতের সবচেয়ে বেশি পাট চাষ হয়ে থাকে। এছাড়া দেশীয় বঙ্গবীর ও ৯৮৯৭ জাতের পাটের আবাদ করা হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, এক বিঘা পাট চাষে খরচ হয় প্রায় ৭ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা। ভারতীয় তোষা জাতের পাট প্রতি বিঘায় পাটের ভালো ফলন হলে প্রায় ১০/১২ মণ উৎপাদন হয়ে থাকে। প্রতি মণ পাট বাজারে কেনা বেচা হয়ে থাকে দেড় হাজার টাকায়। পাট চাষের চেয়ে সবজি চাষে বেশি লাভ হওয়ায় পাট চাষিরা দিনদিন সবজি চাষে ঝুঁকে পরছেন। দেশী জাতের পাট প্রতি বিঘায় ৬/৭ মণ উৎপাদন হয়ে থাকে। ফলে কৃষকদের লোকসান গুণতে হয়। একারণে কৃষকরা দেশীয় জাতের পাট চাষ করে না।
আশির দশকে নওগাঁয় ব্যাপক হারে সোনালী আঁশ পাট চাষ করা হতো। সে সময় পাটের নায্য দাম না পাওয়া পাট চাষিদের প্রতিবছর লোকসান গুণতে হতো। ১৯৮০/৮৫ সালের দিকে জেলায় শুরু হয় ইরি-বোরো ধান চাষ। সে সময় পাট চাষিরা সরকারি সহযোগিতা না পাওয়ায় পাট চাষ বন্ধ করে দিয়ে ঝুঁকে পরে ধান চাষের দিকে।
সদর উপজেলার মুক্তার গ্রামের শরিফুল ইসলাম জানান, আগে এইসব মাঠে ব্যাপক পাট চাষ হতো। পাটের নায্য দাম না পাওয়ায় এখন কৃষকরা সবজি, আম, কলা, ধান চাষ করছেন।
রাণীনগর উপজেলার বাঁশবাড়ীয়া গ্রামের শিক্ষক সুরেশ সরকার জানান, বাড়িতে পাটের প্রয়োজন হওয়ায় ৭/৮ বছর আগে ৫ কাঠায় পাট চাষ করতেন। পাট চাষে ঝামেলা হওয়ায় পাট চাষ বন্ধ করে ধান চাষ করা হয়। তার মতো এলাকার শতশত লোক পাট চাষ বন্ধ করে দিয়েছেন।
সদর উপজেলার মুক্তার গ্রামের আমজাদ হোসেন, কাশেম সরদারসহ অন্যরা জানান, পাটে বিভিন্ন রোগবালাই দেখা দিলেও কৃষি বিভাগের সহযোগিতা পাওয়া যায় না। ফলে অনেক জমিতে পাট মরে যায়। প্রতি বিঘায় খরচের তুলনায় লাভ কম হয়। আবার কৃষি বিভাগ থেকে হাতে গোনা কিছু লোকদের পাট বীজ ও সার দেওয়া হলেও প্রকৃত পাট চাষিদের দেওয়া হয়না। তারা আরো জানান, পাটের সোনালী অতীত ফিরিয়ে আনতে দরকার সরকারী উদ্যোগ। সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা, বিনা মূল্যে প্রকৃত চাষিদের মাঝে বীজ-সার প্রদান ও পাটের দাম সময় মত নির্ধারণ করে সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে সরকারী ভাবে পাট কেনার মধ্য দিয়ে আবারও পাটের সোনালী অতিত ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লি¬-ষ্টরা।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সামছুল ওয়াদুদ জানান, পাট আবাদের পর দামের অনিশ্চয়তা, শ্রমের দাম বৃদ্ধি, ধানসহ সবজিতে বেশি লাভ হওয়ায় পাট চাষ থেকে কৃষকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অপরপ্রশ্নে তিনি বলেন, কৃষি বিভাগ থেকে পাট চাষিদের সব সময় সহযোগিতা করা হয়।

এই সংবাদটি 1,231 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •