নতুন স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা

প্রকাশিত:বুধবার, ১২ আগ ২০২০ ১১:০৮

নতুন স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা
তারেক শামসুর রেহমান
চীন-মার্কিন সম্পর্ক এখন এমন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে যে কোনো কোনো পর্যবেক্ষক একে নয়া স্নায়ুযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর ইউরোপে প্রভাববলয় বিস্তারকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হয়েছিল। এই স্নায়ুযুদ্ধ বিশ্বকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছিল—একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী বিশ্ব, অন্যদিকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষের দিকে এই ‘বিরোধ’ চরমে উঠেছিল, যখন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন কোথাও কোথাও সামরিকভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল (আফগানিস্তান), কোথাও আবার ‘সোভিয়েত মডেলের’ সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল (ইথিওপিয়া, মোজাম্বিক, দক্ষিণ ইয়েমেন ইত্যাদি)। এর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরই পূর্ব ইউরোপে যে সমাজতান্ত্রিক সরকারগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাদের ক্ষমতার উৎস ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। ওয়ারশ সামরিক জোট গঠন করে (১৯৫৫) সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে তার সামরিক কমান্ডের আওতায় এনেছিল। তবে এটা ঠিক, এর আগেই ১৯৪৯ সালে ন্যাটো সামরিক জোট গঠন করে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইউরোপকে তার ‘নিয়ন্ত্রণে’ নিয়ে নিয়েছিল। এভাবেই মতাদর্শগত লড়াই (পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্র) জন্ম দিয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধের। এই স্নায়ুুযুদ্ধ বহাল ছিল ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত, যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায় এবং সমাজতন্ত্রের পতন ঘটে। এর পর থেকে কার্যত যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালালেও একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে যুক্তরাষ্ট্র এখন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। আর এই চ্যালেঞ্জটি এসেছে চীনের কাছ থেকে। চীন বেশ কিছুদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত করে আসছে। চীন অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্বে আবির্ভূত হয়েছে। এই অর্থনৈতিক শক্তি মার্কিন স্বার্থকে আঘাত করেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী (২০ জুলাই ২০২০) চীন ২০২৪ সালের মধ্যেই বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। এটা যদি হয়, তাহলে বিশ্বকে কর্তৃত্ব করার যুক্তরাষ্ট্রের সব উদ্যোগ ব্যর্থ হবে। ২০২৪ সালে অর্থনীতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হবে দুই নম্বরে। ভারত থাকবে তিন নম্বরে, আর জাপান চার নম্বরে। অথচ ১৯৯২ সালের পরিসংখ্যান বলছে, চীনের অবস্থান ছিল তখন ১০ নম্বরে (যুক্তরাষ্ট্র প্রথম, জাপান দ্বিতীয়, জার্মানি তৃতীয়)। ২০০৮ সালে চীন উঠে আসে তিন নম্বরে (যুক্তরাষ্ট্র এক, জাপান দুই, জার্মানি চার)। এই মুহূর্তে চীন বিশ্বের দুই নম্বর অর্থনীতি। আর মাত্র চার বছরের মাথায় চীন বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতিতে পরিণত হবে। সুতরাং মার্কিন নীতিনির্ধারকদের এটা যে চিন্তার খোরাক জোগাবে, তা বলাই বাহুল্য। মার্কিন অর্থনীতি যে বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়েছে, তা করোনাভাইরাস-সংক্রান্ত পরিস্থিতির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করায় ব্যর্থতা, করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে না পারা (২ আগস্ট পর্যন্ত মোট মৃত্যু ১,৫৭,৯০৫ জন, বিশ্বে সর্বোচ্চ), বেকারের সংখ্যা ৪০ মিলিয়ন অতিক্রম করা (২৮ মে ২০২০, নিউ ইয়র্ক টাইমস), তথাকথিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’-এর নামে এক ধরনের শ্বেতাঙ্গ প্রাধান্যের কথা বলে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের যে গ্রহণযোগ্যতা তা হ্রাস পেয়েছে। এমনই এক পরিস্থিতিতে চীন তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। করোনার পর অর্থনীতি অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তাই চীনকে নিয়ে ভয় মার্কিন নীতি প্রণেতাদের।
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা চীন-মার্কিন সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছে।
প্রথমত, বাণিজ্যঘাটতি। এই ঘাটতির পরিমাণ চীনের অনুকূলে ২০১৮ সালে ছিল ৪১৯.২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৫ সালে ছিল ৩৪৬.৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ চীন যুক্তরাষ্ট্রে বেশি রপ্তানি করে, সেখান থেকে আমদানি করে কম। এই ঘাটতি কমাতে গেল বছর ট্রাম্প প্রশাসন চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় চীনও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছিল। ঘাটতি কমাতে ট্রাম্পের নানা উদ্যোগ এক ধরনের ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’র জন্ম দিয়েছিল, যার সমাধান হয়নি।
দ্বিতীয়ত, হংকং ও চীন কর্তৃক নিরাপত্তা আইন চালু, উইঘুর মুসলমানদের ব্যাপারে চীনা ভূমিকার কারণে মার্কিন কংগ্রেসে আইন পাস হয়েছে এবং শীর্ষস্থানীয় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, করোনাভাইরাস ছড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র চীনকে অভিযুক্ত করছে।
চতুর্থত, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের প্রভাব সংকুচিত করতে ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্র জাপান ও ভারতের সঙ্গে আলাদা নৌ মহড়া চালিয়েছে।
পঞ্চমত, গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িত থাকার অভিযোগে চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার ও হিউস্টনে চীনা কনস্যুলেট অফিস বন্ধ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ষষ্ঠত, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী লন্ডনে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য চীনা জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দিতে যাচ্ছে।
লেখক : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এই সংবাদটি 1,230 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •