নরসিংদীর পাহাড়ি অঞ্চলের লটকন প্রায় ৩০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেন-দেন।

প্রকাশিত:বৃহস্পতিবার, ১১ আগ ২০১৬ ০৯:০৮

নরসিংদীর পাহাড়ি অঞ্চলের লটকন প্রায় ৩০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেন-দেন।

বিশ্বজিৎ সাহা, নরসিংদী প্রতিনিধি: লটকন ফলে হাঁসি ফুটেছে নরসিংদীর পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের মুখে। এবার লটকন ফল বিক্রীতে প্রায় ৩০ কোটি টাকা লেন-দেন হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলেও তাদের দাবী। মাত্র সাত-আট বছরের ব্যবধানেই অপ্রচলিত একটি ফল লটকন এখন নরসিংদীর অন্যতম অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বর্তমানে এ এলাকায় লটকনের বাণিজ্যিক উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নত জাতের মিষ্টি লটকনের চাষ ও জনপ্রিয়তা দু’ই বেড়েছে। নরসিংদী জেলায় উৎপাদিত লটকন আকারে বড়, দেখতে হলদে আর স্বাদে মিষ্টি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন বাজারের পাশাপাশি বিদেশের বাজারও রয়েছে এর চাহিদা। এ বছর লটকনের আকার বড় ও দেখতে উজ্জ্বল হওয়ায় বাজারে ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। তাতে লটকন চাঁষিদের মুখে এবার অনাবিল হাঁসি ফুটেছে।
ফুল হয়না পাপড়িও ঝরে না। সরাসরি গাছের কা- থেকে বের হয় লটকল, যার স্থানীয় নাম বুগি। । টক আর মিষ্টিতে ভরপুর নরসিংদীতে উৎপাদিত এ লটকন ফলটি দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন রফতানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। যার ফলে চাষিদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে এই ফল। তাই অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ লটকন বাগানের আবাদ। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে লটকন ফল উল্ল্যেখযোগ্য অবদান রাখছে বলে কৃষকদের দাবী। বিদেশে লটকন রফতানী করেন শিবপুর উপজেলার চৈতন্য গ্রামের এলাকার ইমাম উদ্দিন সরকার, তিনি জানান ক্যামিকেল মুক্ত, কোন ধরনরে রাসয়নিকের ব্যবহার না থাকায় লটকন বিদেশে পাঠাতে কোন সমস্যা হয়না। এবার আমি লটকন বিক্রী করে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা উপার্জনের লক্ষ নিয়েছি। কম খরচ আর অল্প পরিশ্রমের ফলন ও মূল্য দুটোই ভাল হওয়ায় লটকন এখন চাষীদের কাছে অন্য ফসলের তুলনায় অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান বলে পরিচিতি পেয়েছে। বিদেশ ফেরৎ ও বহু বেকার যুবক লটকনের চাষ করে তাদের মুখে ফুটিয়েছে অর্থনৈতিক সাফল্যের হাঁসি । এখন কোয়ালিটি ভেদে লটকন ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা মণ দরে পাইকারি বিক্রি করছেন। খুচরা দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি। ফল বিক্রির ভাবনা তাদেরকে ভাবতে হচ্ছে না। পাইকাররা বাগান থেকেই লটকন কিনে নিয়ে যাচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় সবচে বেশি লটকনের বাগান রয়েছে। বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে লটকন বাগানের চাষ। লটকন গাছে নারী-পুরুষ রয়েছে। ফল আসার আগ পর্যন্ত নারী-পুরুষ চিহ্নিত করা দুষ্কর। চারা লাগানোর কমপক্ষে ৫/৬ বছর পর ফল আসে। এ কারণে প্রথমদিকে চাষিরা লটকন চাষে উৎসাহিত হয়নি। প্রথমদিকে চাষিরা চারার জন্য নার্সারিগুলোর উপর নির্ভর করলেও এখন তারা তা করছে না। এখন নিজেরাই চারা তৈরি করছে। সাধারনত দেখা গেছে এবং এক বিচি বিশিষ্ট লটকন থেকে অধিক নারী গাছের জন্ম নেয়। তা ছাড়া চারা অবস্থায় গাছের বিভিন্ন লক্ষণ দেখে অভিজ্ঞরা নারী চারা শনাক্ত করতে পারেন। বাছাইয়ের এ পদ্ধতি বিজ্ঞান সম্মত না হলেও চাষিরা বেশ সাফল্য পাচ্ছেন। দেখা গেছে বাগানগুলোতে নির্দিষ্ট দূরত্বে ৩টি করে চারা রোপণ করা হচ্ছে। ৪/৫ বছর পর প্রথম ফল এলে নারী গাছ রেখে বাকীগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে। একটি পূর্ণবয়স্ক লটকন গাছে ৫ থেকে ১০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। লটকন চাষি তোফাজ্জল হোসেন জানান, লটকন গাছের পুষ্টির সুষমতা ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গাছের গোড়া থেকে প্রধান কান্ড গুলোতে ঝোপায় ঝোপায় এত বেশি ফল আসে যে তখন গাছের ডাল পর্যন্ত দেখা যায় না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, জেলার শিবপুর, বেলাব ও রায়পুরা উপজেলার মাটি লটকন চাষের জন্য খুবই উপযোগী এলাকা। গত বছর জেলার প্রায় ৫৩৫ হেক্টর জমিতে লটকনের চাষ হয়েছিল। এ বছর আবাদ হয়েছে প্রায় সারে ৫শত হেক্টর জমিতে। বাণিজ্যিক ছাড়াও বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন ঘরবাড়ির পাশে ও পতিত জমিতেও লটকন গাছ রয়েছে, যা কৃষিবিভাগের হিসাবের বাইরে। কৃষিবিভাগের তথ্য মতে, প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে সাড়ে ১৬ মেট্রিক টন লটকন উৎপাদিত হচ্ছে। সেই হিসেবে চলতি বছর লটকন উৎপাদনের সম্ভাবনা ধরা হয়েছে নয় হাজার ৫৭০ মেট্রিক টন।
বর্তমানে ফরমালিনে ভয়ে ফল খাওয়া নিয়ে শংকায় থাকেন অনেকেই । ষেখানে লটকন ফরমালিনমুক্ত ফল হওয়ায় তা সবার কাছে বেশ পছন্দের। সাধারণত দুই দিন এর সৌন্দর্য্য অক্ষুন্ন থাকে। সৌন্দর্য ও স্বাদ অক্ষুন্ন রেখে কিভাবে লটকন দীর্ঘস্থায়ী সংরক্ষণ করা যায়, তা নিয়ে গবেষণা চলছে জানিয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক লতাফত হোসেন জানান, এবার সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় অন্য বছরের তুলনায় ফলন ভালো পাওয়ায় কৃষকদের মুখে এবার হাসি ফুটেছে। ভালোজাতের লটকন মধ্যপ্রাচ্য, লন্ডন ও ইউরোপে রপ্তানি হচ্ছে।

এই সংবাদটি 1,235 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •