নীরব কাচারী বাড়ী পতিসর

প্রকাশিত:শনিবার, ০৯ মে ২০২০ ০১:০৫

নীরব কাচারী বাড়ী পতিসর

 

“তুমি রবে নিরবে হৃদয়ে মম”নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার নির্জন প্রত্যন্ত পল্লী বিশ্ব কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত মনিয়ারী ইউনিয়নের (কালিগ্রাম পরগণা) কাচারী বাড়ী পতিসর যেন আজ নির্জনতায় নিরবে চলে গেলো কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬০ তম জন্মদিন। আরো নিস্তব্ধ। কিন্তু ফি বছরেও হয়েছে সব। হবারই কথা ছিল আজ যে ২৫ বৈশাখ বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬০ তম জন্মজয়ন্তি। কৃষ্ণচূড়ায় ফুল এসেছে, সোনালু ফুলের হলদে রঙের চ্ছটা কাছারি বাড়ির বর্হিপ্রঙ্গনের এক কনে প্রকৃতির রুপের মেলা বসেছে। তবে এবার করোনার মহামারির কারনে পতিসরে নিরবে চলে গেল কবির জন্মজয়ন্তি। কবি প্রকৃত জমিদারি কালিগ্রাম পরগনা হলেও এখনো তা রয়ে গেছে আনেকটাই পিছিয়ে। কাছারি বাড়িটি এখন প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের যাদুঘর। নিভৃত পল্লীর কাছারি বাড়িকে ঘিরে সবুজের বড়ই অভাব।

তবুও কবির প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালবাসাকে বুকে বেধে সকল সমস্যাকে মেনে নিয়ে এক অদৃশ্য ভালবাসার টানে রবি ভক্তরা ছুটে আসেন পাখিডাকা নিভৃত পল্লী পতিসরে। আঁকাবাঁকা পাকা সড়ক চলে গেছে নিঝুম- নিস্তদ্ধ-নিভৃত পল্লী¬ নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার মনিয়ারী ইউনিয়নে পতিসরে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছারী বাড়ি । কবির প্রিয় নাগর নদী কাছারীবাড়ির সীমানা ছুঁয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে । নতুন করে সানবাাঁধানো ঘাট হয়েছে সেখানে। এখানে প্রতি বছর কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম জয়ন্তি উপলাক্ষে বসে মানুষের মিলন মেলা। দূর দূরান্ত থেকে কবির ভক্তরা ছুটে আসেন তাদের প্রিয় কবির স্মৃতি বিজড়িত পতিসর কাছারি বাড়ি প্রাঙ্গনে। এ যেনো সব পার্বনকে ছাড়িয়ে যেতো। প্রতি বছর আসতো পতিসরের পরিবার গুলোতে তাঁদের আতœীয় স্বজন কবির জন্মজয়ন্তিকে ঘিরে। কিন্তু এবার করোনার কারনে নেই কোন আয়োজন।

১৮৯১ সালের পর কবি বহুবার এসেছেন পতিসর কুঠিবাড়িতে নাগর নদী পথে বজড়ায় চড়ে। এই পতিসরে বসে কবি রচনা করেছেন কাব্য নাটিকা , বিদায় অভিশাপ, গোরা ও ঘরে বাহিরে উপন্যাসে অনেকাংশ। ছোট গল্পের মধ্যে প্রতিহিংসা, ঠাকুরদা, ইংরাজ ও ভারত বাসী প্রবন্ধ। গানের মধ্যে যেমন “তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা/ তুমি আমার নিভৃত সাধনা,” বধূ মিছে রাগ করোনা, তুমি নব রুেেপ এসো প্রানে, সহ অনেক গান। দুই বিঘা জমি, তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে কবিতাসহ বিভিন্ন কবিতা। কবির স্মৃতি বিজড়িত মনিতলার পূজামন্ডপের সেই তাল গাছটি আজ আর নেই। ঝড়ে ভেঙ্গে গেছে অনেক আগে। তবে রবীন্দ্র গবেষকগনের ধারনা মতে পতিসর কুঠিবাড়ির সামনে যে দুই বিঘার মাঠটি আছে সেটিই কবির রচিত কবিতা দুই বিঘা জমি’র সেই মাঠটি।

সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে কবির দেয়াল ঘড়ি, লোহার সিন্দুক, খাট, টি-টেবিল, টি-পট, আয়না, নাগর বোটের এ্যাংকর, ট্রাক্টরের ভগ্নাংশ, কবির স্নানের বাথটাব, কবির বিভিন্ন বয়সের ছবি, কবির স্বহস্তে লিখিত ৬ পৃষ্ঠার চিঠিসহ নানান সামগ্রী।

কবি তাঁর পুত্রের নামানুসারে প্রতিষ্ঠা করেন “কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইন্সটিটিউট।” ১৯১৩ সালের নবেল পুরস্কারের প্রাপ্ত টাকা থেকে ১ লাখ ৮হাজার টাকা তিনি কৃষকদের উন্নয়ন কল্পে প্রতিষ্ঠিত কৃষি ব্যাংকে জমা দেন। কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর পতিসর কাছারি বাড়িতে সব শেষ আসেন ১৯৩৭ সালে। কাছারি বাড়িতে সংরক্ষন করা হয়েছে কবির নানান স্মৃতি সামগ্রী। কাছারি বাড়ির সামনে সিংহ দুয়ার। ওই দুয়ারের সামনে বিশাল প্রাঙ্গন। সিংহ দুয়ার পেরোলেই কাছারি বাড়ির অভ্যন্তর , সামনে আঙ্গিনা। আঙ্গিনার তিন দিকে উঠে গেছে সিঁড়ি। সিঁড়ি পেরোলেই বারান্দা সংলগ্ন বিশাল বিশাল কক্ষ। এক কোন দিয়ে উঠে গেছে চিলে কোঠার সিঁড়ি।

নওগাঁর বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক অবসর প্রাপ্ত অধ্যাপক আতাউল হক সিদ্দিকী জানান, পতিসর কাছারি বাড়ি যে পরগনায় অবস্থিত সেটাই কবির পৈতিক সূত্রে পাওয়া জমিদারি কালিগ্রাম পরগনা। এবং এটাই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজস্ব জমিদারী। শাহজাদপুর,শিলাইদহর জমিদারী ছিল কবির অপর ভাইদের। কবি যেহেতু এ অঞ্চলে বেশী আসতেন তাই তাঁকেই সবক’টি দমিদারী দেখাশুনা করতে হতো। গত ২০০৯ সালে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বহস্তে লিখিত ৬ পৃষ্ঠার একটি চিঠি উদ্ধার করেন স্থানীয় রবীন্দ্র সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক রবীন্দ্র অনুরাগি এম মতিউর রহমান মামুন। এরপর রবি ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত পতিসর কৃষি ব্যাংকের একটি হিসাবের খাতা উদ্ধার করা হয়।

নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রাণীনগর) আসনের সংসদ সদস্য মো: ইসরাফিল আলম বলেন, এবার করোনা ভাইরাসের কারণে পতিসরে বিশ্বকবির জন্ম বার্ষিকী পালন করা হচ্ছে না। কিন্তু বিশ্বকবি রয়েছেন আমাদের সত্ত্বায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ নওগাঁর মানুষের কাছে গর্ব কারন তার নিজস্ব জমিদারী নওগাঁর পতিসরে। রবীন্দ্রনাথ যেমন শিক্ষানুরাগী ছিলেন সেজন্য তার পুত্রের নামানুসারে রথীন্দ্রনাথ ইন্সটিটিউট খুলেছিলেন। নওগাঁবাসীর দাবী, রবীন্দ্রনাথের নামে পুনাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। রবীন্দ্রনাথের নামে যত জমি আছে, সেই জমির উপরেই বিশ্ববিদ্যালয় করা সম্ভব। রবীন্দ্রনাথ নওগাঁর মানুষের কাছে, হৃদয়ের মানুষ, কাছের মানুষ। তার নবেল প্রাইজের অর্থ দিয়ে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেছিলেন, ক্ষুদ্র ঋনের ব্যবস্থা তিনিই চালু করেছিলেন। – মুরাদ চৌধুরী, নওগাঁ।

এই সংবাদটি 1,225 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •