পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বৃহত্তম ঈশ্বরদী জংশন আধুনিকীকরণের প্রতিশ্র“তি বাস্তবায়ন হয়নি

ঈশ্বরদী (পাবনা) সংবাদদাতাঃ
বাংলাদেশ পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বৃহত্তম ঈশ্বরদী জংশন আধুনিকীকরণে প্রতিশ্র“তি দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়ন হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ এই জংশন স্টেশন আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ না থাকায় সমস্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঈশ্বরদীবাসীর প্রাণের দাবী উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত ঈশ্বরদীর ঐতিহ্যবাহী রেলওয়ে জংশনটির উন্নয়ন ও রি-মডেলিং। আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদের পাঁচ বছর ও বর্তমান মেয়াদের তিন বছর পার হলেও ঈশ্বরদী রেল জংশন স্টেশন ও ইয়ার্ডে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগেনি। ব্রিটিশ শাসন আমলে নির্মিত ঈশ্বরদী রেলওয়ে স্টেশন ও ইয়ার্ডটি আধুনিকায়নের জন্য বিগত জোট সরকারের আমলেও পদক্ষেপ নেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
এদিকে বিগত নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইস্তেহারে উল্লেখ ছিল, ঈশ্বরদীর জংশন স্টেশনকে আধুনিকায়ন করা হবে। ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া (পাবনা-৪) আসনের পর পর চারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বর্তমান ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে একাধিকবার উপস্থাপন করেছেন। এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঈশ্বরদী জংশনটি রি-মডেলিংয়ের জন্য প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত বাস্তবায়নের কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
বৃটিশ আমলে ১৮৬২ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতবর্ষের ট্রেন চলাচল শুরু হয়। সে সময় পাকশীতে পদ্মা নদীর তীরে সাঁড়াঘাটে ছিল রেল স্টেশন। পরবর্তীতে কালের পরিবর্তনের সাথে সাথে ১৯১০ সালে পাকশীতে পদ্মানদীর উপর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯১৫ সালে এ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্থাপিত হয়।
দুই কিলোমিটার দীর্ঘ ইয়ার্ড ও স্টেশনটিতে ১৭টি রেললাইন স্থাপন করা হয়। মূলত: এই সময় হতেই দেশের উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের রেল যোগযোগ স্থাপিত হয়। যেকারণে ঈশ্বরদীর উপর দিয়ে প্রতিদিন অনেক যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেন চলাচল করে। সুদীর্ঘ প্রায় ১শ বছরে সময়ের প্রয়োজনে অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটেছে। হয়নি শুধু ঈশ্বরদী জংশন ষ্টেশনের আধুনিকীকরণ।
বর্তমানে এই স্টেশনের উপর দিয়ে ২৪ ঘন্টায় বিভিন্ন শ্রেণীর ২৮ টি যাত্রীবাহী ট্রেন ও ১২টি মালবাহী ট্রেন চলাচল করে। এগুলোর মধ্যে ১৭টি আন্তঃনগর, ৬টি মেইল ট্রেন ও ৭টি লোকাল ট্রেন। ৪টি প্লাটফরম বিশিষ্ট রেলওয়ে জংশন স্টেশনটি পরিচালনার জন্য বর্তমানে ১৯টি বিভাগে প্রায় আড়াই হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। ১৯১০ সাল হতে রেল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চলাচলের জন্য ঈশ্বরদী ও পাকশীর মধ্যে ‘পাইলট’ নামে একটি ট্রেন চালু করা হয়। ঈশ্বরদী স্টেশন এবং হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণকালে পাকশী পদ্মানদীর পাদদেশে গড়ে তোলা হয় পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে অফিস। এই অফিস থেকে সেই সময় সারা ভারতবর্ষের মধ্যে রেল চলাচল নিয়ন্ত্রণ হতো। ঈশ্বরদী রেল স্টেশন বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত। প্রতি ২৪ ঘন্টায় এই স্টেশনে দুই থেকে তিন হাজার যাত্রী আসা-যাওয়া করে। এখানে বিশ্রামাগার, টয়লেট ও ফুটপাথ দখল করে থাকে হকার, চোরাচালানী ও বখাটেরা। বিদ্যুৎ ও পানির সমস্যা সব সময়ই রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের সদস্যরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন না। আইন-শৃঙ্খলারও যথেষ্ট অভাব রয়েছে ঈশ্বরদী জংশন স্টেশন ও ইয়ার্ড জুড়ে।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে ঈশ্বরদী স্টেশন ইয়ার্ড মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাচালানীদের দখলে থাকে বেশিরভাগ সময়। নিরাপত্তার দায়িত্বে নিযুক্ত কতিপয় সদস্য এদের সহযোগিতা করে থাকে। এছাড়াও বিভিন্ন ট্রেনে এই ইয়ার্ড থেকে চোরাচালানী পণ্য ও মাদকদ্রব্য ভর্তি করে নিয়ে যায় বিভিন্ন জেলায়। বিষয়গুলো রেলের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হওয়ার পরও বিভিন্ন বিভাগের সাথে সমন্বয়হীনতার কারণে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
টিকেট বিক্রির কাউন্টার সংলগ্ন টেম্পুস্ট্যান্ড, মালগুদাম, আইডব্লিউ অফিস, সাউথ কেবিন এলাকা, পিডব্লিউআই অফিস এলাকা, কলাবাগান এলাকা ও লোকোশেড এলাকায় দীর্ঘদিন থেকে প্রকাশ্যে মদ, গাঁজা, ফেনসিডিল ও হেরোইন বিক্রি হচ্ছে। অথচ দেখার কেউ নেই। এছাড়া বিভিন্ন রুটে চোরাচালানের মালামাল ট্রেনযোগে ঈশ্বরদী নিয়ে আসা হয়। চোরাচালানের এসব মালের মধ্যে ফেনসিডিল, সার, গেঞ্জি, শাড়ি, সালোয়ার-কামিজের পিস উল্লেখযোগ্য। চোরাচালানের এসব মাল ঈশ্বরদী বাজারসহ বিভিন্ন হাটবাজার ও শহরের পাড়া-মহল্লায় বিক্রি করা হচ্ছে।
ঈশ্বরদী জংশনটিকে ঘিরে প্রায় ৯শ’ রেলওয়ে বাসা রয়েছে। সম্প্রতি বাসাগুলোর বেশিরভাগই ড্যামেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব ড্যামেজ বাসাগুলো দেখাশোনার দায়িত্ব আইডব্লিউ অফিসের। রেল কর্মচারীরা এসব বাসায় বসবাস না করলেও অবৈধ দখলদারদের কাছ হতে মাসিক ভাড়া আদায় করা হয় বলে ভাড়াটেদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এই আদায়কৃত ভাড়ার টাকা রেল কর্তৃপক্ষের ফান্ডে জমা হয় না। এসব বাসায় অবাধে চলে মাদক ও চোরাচালান ব্যবসা। ঈশ্বরদী রেল জংশন, স্টেশন ও ইয়ার্ড থেকে বৈধভাবে রেল কর্তৃপক্ষের কোটি কোটি টাকা আয় হলেও যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়নি।
নিরাপত্তার কারণে এখন যাত্রীরা বর্তমানে ট্রেনমুখী। যাত্রীসেবা পূর্ণাংগভাবে নিশ্চিত করা হলে ট্রেনে যাত্রীর সংখ্যা আরও বাড়বে, ট্রেন ভ্রমণেও উদ্ধুদ্ধ হবে এবং রেল লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এই স্টেশনটিকে ঘিরে হাজারো সমস্যা থাকলেও রেল কর্তৃপক্ষ সমাধানের জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.