পাঠক কতটা ঠক

লেখালেখির জগতে একটা জটিল দার্শনিক প্রশ্ন হচ্ছে, লেখক কি পাঠক তৈরি করেন, না পাঠক লেখক? যদি লেখক হন পাঠক তৈরির কারিগর, তাহলে আরেকটা প্রশ্নও উঠে আসে: সেই লেখক যখন তাঁর প্রথম বইটি লেখেন, কাকে মনে রেখে লেখেন, কারণ তাঁর পাঠক তো তখনো তৈরিই হয়নি! নাকি তিনি অন্য লেখকের পাঠককে উদ্দেশ্য করে লেখেন, তাঁদের দলে ভেড়ান? আর যদি পাঠক সৃষ্টি করেন লেখককে, তিনি কি সব সময় তাঁদের সঙ্গে থাকেন? তাঁদের প্রত্যাশামতো লেখেন?

প্রশ্নটা নিয়ে বিতর্ক হতে শুনি, কিন্তু কোনো সদুত্তর পাই না। এ কথা সবাই স্বীকার করবেন, হুমায়ূন আহমেদ এক বিশালসংখ্যক পাঠক তৈরি করেছিলেন। সেই পাঠকেরা অন্য লেখকদেরও পাঠক হয়েছেন। আবার তাঁদের বিশাল সমর্থন পেয়ে তিনি ক্রমাগত লিখে গেছেন, নন্দিত হয়েছেন। তাহলে এ কথাও তো বলা যায়, পাঠকেরাও প্রকারান্তরে তাঁকে তৈরি করেছেন, কারণ তাঁদের প্রত্যাশার খুব একটা বাইরে তিনি যাননি—নিরীক্ষাধর্মী, আঙ্গিকসচেতন উপন্যাস বলতে গেলে লেখেননি। যদিও তা লিখলে তিনি নতুন পাঠক হয়তো পেতেন, পুরোনোরাও হয়তো তাঁকে সঙ্গ দিত।

তার মানে, লেখক যেমন পাঠক তৈরি করেন, পাঠকও তৈরি করেন লেখককে। তাঁরা একে অপরের পরিপূরক, সম্পূরকও বটে। কোনো লেখকের বইয়ের কাটতি না থাকলে তিনি যখন হতাশ হয়ে তাঁর কলম তুলে রাখেন, বলা যায় তিনি পাঠক তৈরিতে ব্যর্থ; তাঁর অনুপস্থিত পাঠকেরা তাঁকে তৈরি করার দায়িত্ব নেন না। তবে অন্যভাবে তাঁকে তৈরি হওয়ার একটা সুযোগ হয়তো তাঁরা করে দেন। পৃথিবীতে এমন অনেক লেখক আছেন, যাঁরা তাঁর প্রথম বইটির অসাফল্যে ভেঙে না পড়ে দ্বিতীয়, এমনকি তৃতীয় বইটিও লিখেছেন এবং বহুল পঠিত হয়েছেন। আর একবার বহুল পঠিত হওয়ার মানে পাঠকদের প্রত্যাশামতো সেই লেখকও তৈরি হয়েছেন।

অনুপস্থিত পাঠক অথবা অ-পাঠকের প্রচুর শক্তি থাকে। ঢাকার বইমেলায় যে প্রচুর নতুন লেখক আত্মপ্রকাশ করেন প্রতিবছর, তাঁরা এই পাঠক শ্রেণিকে মনে রেখেই তো লেখেন। তাঁরা যদি সাড়া দেন, তাঁদের—লেখকের—জন্ম হয়ে যায়। না দিলে কালের (অর্থাৎ কয়েক বছরের) গর্ভে তাঁরা হারিয়ে যান।

এবারের বইমেলার শুরুতে এক সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, অনেক যে অলেখক, মানহীন লেখক সমানে বই লিখে যাচ্ছেন, এটা কি পাঠকের সঙ্গে প্রতারণা করা নয়? আমি বললাম, তা কেন হবে, তাঁরা খারাপ লিখলে তাঁদের বই না পড়লেই তো চলে। সাংবাদিক বললেন, না, অনেক বইয়ের ঝকঝকে প্রচ্ছদ দেখে, লেখকদের নিয়ে প্রচারণা দেখে (প্রধানত ‘ফেসবুক’ নামের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে) পাঠকেরা বই কেনেন। তবে দু-এক পৃষ্ঠা পড়েই বুঝতে পারেন, তাঁরা ঠকেছেন।

লেখকেরাও তাহলে ঠক হতে পারেন! হয়তো। সবাই তো আর লেখক নন, কেউ কেউ লেখক। অনেকে নিশ্চয় আছেন, যাঁরা, যাকে বলে লেঠক। তাঁরা সেভাবেই হয়তো পাঠকের চোখে ধরা পড়েন।
কিন্তু সব পাঠকই আসলে সৎ, অর্থাৎ তাঁরা বই কেনেন, বই পড়েন বইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে? অন্য কাউকে না হলেও নিজেকে ঠকানোর ব্যাপারটা কি তাঁরা কখনো করেন না?
তাহলে একজন দলীয় এমপি, নেতা বা মন্ত্রীর বই কেনার জন্য কিছু পাঠক কেন হুমড়ি খেয়ে পড়েন? কোনো বই না পড়ে সেই বই বা তার লেখককে শাপান্ত করেন? কোনো সাহসী শৈলীর বই দু-পৃষ্ঠা পড়ে ‘ধ্যাৎ’ বলে ফেলে রাখেন? যে পাঠক শুধু সুখপাঠ্য বইয়ে ডুবে থাকেন, তিনি কি ব্যতিক্রমী দুর্দান্ত কিছু বইয়ের স্বাদ গ্রহণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করেন না?

গত বইমেলায় আমি অন্তত দুটি বই কিনেছিলাম, দুই তরুণ লেখকের, যা পড়ে আমি অভিভূত হয়েছিলাম। অথচ তাঁদের প্রকাশক মেলা শেষে জানালেন, এঁদের কারোরই ত্রিশ কপির বেশি বই বিক্রি হয়নি। দুঃখের হাসি হেসে প্রকাশক আরও জানালেন, এই ত্রিশ কপিরও কয়েকটি কিনেছেন লেখকদের বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজন। অর্থাৎ তাঁরা ঠিক পাঠক নন, সমর্থক।

দুই
এই লেখায় এক সাংবাদিকের কথা বলেছি। তো, সেই সাংবাদিক আমাকে আরও জিজ্ঞেস করেছিলেন, পাঠক কীভাবে বাড়ানো যায়?
আমি বললাম, ভালো লেখার মাধ্যমে। কিন্তু বলেই বুঝলাম, ‘ভালো’ কথাটা হয়তো ঠিক হলো না, কারণ এটা আপেক্ষিক। ভালো-মন্দের বিচারে গেলে ঠকতে হয়। আপেক্ষিক কোনো কিছুই চূড়ান্ত কোনো বিচার তৈরি করতে পারে না।
সাংবাদিক প্রকাশকদের নিয়ে একটা প্রশ্ন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু একটু দূরে মঈনুল আহসান সাবেরকে দেখে তাঁর দিকে ধাবিত হতে তাঁকে প্রলুব্ধ করলাম। সাবের একই সঙ্গে বড় লেখক ও মাঝারি প্রকাশক। বেশির ভাগ প্রকাশক আবার একজন লেখকের সব বই প্রকাশ করলেও তাঁর কত বই বিক্রি হলো, তাঁর রয়্যালটি কত পাওনা হলো, এসব বিষয় প্রকাশ করেন না।
সাবের অবশ্য করেন। কারণ তিনি লেখকের বেদনা ও আকাঙ্ক্ষার কথাটাও বোঝেন।
পাঠকের সংখ্যা কীভাবে বাড়ানো যায়, সেই প্রশ্ন সব লেখককেই নিশ্চয় ভাবায়। কিন্তু তার আগে পাঠক কীভাবে তৈরি করা যায়, তা নিয়ে আরও কিছু কথা পাড়া যায়। যেমন একজন পাঠক তৈরি হন বইপ্রেমী, নিদেনপক্ষে বইসহ, পরিবার থেকে—অর্থাৎ যে পরিবার এই দৃশ্য-চমকের যুগেও বইকে সহ্য করে যায়। পাঠক আরও তৈরি করতে পারেন স্কুলের শিক্ষকেরা। যদি পরিবারের সমর্থনে স্কুল-কলেজের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিবছর কয়েক লাখ পাঠক উঠে আসত, তাহলে সারা বছর বইমেলা চললেও বইয়ের জোগান দিয়ে কুলানো যেত না।
আমি যখন স্কুলে পড়ি, আমাদের বাংলা পড়াতেন নাসিরুদ্দিন স্যার। পড়ুয়া মানুষ তিনি। আমাদেরও পড়ুয়া বানাতে তাঁর নিরলস চেষ্টা ছিল। তিনি চমৎকার লিখতেনও। আটলান্টিকের ওপার হতে নামে তাঁর একটি ভ্রমণকাহিনি বেরিয়েছিল। একবার ক্লাসে ব্ল্যাকবোর্ডে তিনি চক দিয়ে ওপরের দিকে লিখলেন ‘বই না পড়ার পক্ষে যুক্তিগুলি কী কী?’ তারপর কিছুক্ষণ বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। পরে আমাদের দিকে ফিরে একটু হেসে বললেন, ‘দেখলে তো যুক্তিগুলি?’
একটাও যুক্তি নেই। ব্ল্যাকবোর্ড ফাঁকা। আমরা যা বোঝার বুঝে নিলাম।
আমাদের শহরে আরেকজন স্যার ছিলেন, ইংরেজি পড়াতেন এইডেড স্কুলে। সেই স্কুল আমার বন্ধুদের। তিনি একদিন বললেন, ‘কেউ যদি আমাকে অনেক বেতনের একটা চাকরি দিত, যাতে কাজ বলতে থাকত একটাই—সারা দিন বই পড়া, তাহলে আমি সবচেয়ে সুখী হতাম।’
এর কিছুদিন পর তিনি বললেন, ‘চাকরিটাতে কোনো বেতন না দিলেও আমি তা নিতাম, এবং সবচেয়ে সুখী হতাম।’
স্যারের খুব শখ ছিল বই পড়ার। কেনারও বোধ করি। কিন্তু বড় এবং অভাবের সংসারে বই কেনা একটা বাহুল্যমাত্র। তারপরও বন্ধুদের সঙ্গে একদিন স্যারের বাসায় গিয়ে দেখি, তাঁর ছোট বাসার বসার ঘরটির চৌকির নিচে অনেক বই। ওই একটাই জায়গা ছিল বই রাখার।
আমি যে শহরে বড় হয়েছি, সেই শহরে বেশ কয়েকটি গ্রন্থাগার ছিল। আমরা নিয়মিত সেগুলোতে যেতাম। আমার এক বন্ধু একদিন জিজ্ঞেস করল, ‘রেলস্টেশনে, বাজারে, রেস্টুরেন্টে ঢুকে আমরা হইচই করলেও লাইব্রেরিতে ঢুকে ফিসফিস করে কথা বলি কেন?’
আমি বললাম, ‘যেহেতু লাইব্রেরিতে আমরা বই পড়ি।’
‘না।’ বন্ধুটি বলল, ‘লাইব্রেরিতে যেহেতু বই আছে। বইয়ের ভেতরে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা জমে থাকে। সেগুলোর সামনে আমাদের সামান্য কথাগুলো লজ্জা পাবে ভেবে আমরা কথা বলি না, অথবা বললেও আস্তে বলি, যাতে তারা শুনে না ফেলে।’
লাইব্রেরির কথায় সৈয়দ মুজতবা আলীর বলা একটা কৌতুক মনে পড়ল। এক পা-ঠক এক লাইব্রেরিতে গিয়ে জোরে জোরে কাউন্টারের মহিলাকে বললেন, ‘একটা কফি আর স্যান্ডউইচ পাওয়া যাবে?’ মহিলা নিচু গলায় বললেন, ‘জনাব, এটা লাইব্রেরি।’ লোকটি চারদিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘একটা কফি আর স্যান্ডউইচ হবে?’
লোকটা আসলে অ-পাঠক, পা-ঠক নয়। বই না পড়লেও বইয়ের রাজ্যে যে গলা নামাতে হয় তিনি তা জানেন।

তিন
আমাদের বাবা-মায়ের কারণে, শিক্ষকদের উৎসাহে পাঠক না হয়ে উপায় ছিল না। তবে পাঠক হিসেবে কিছুটা ঠক যে ছিলাম না, তা বলা যাবে না। তা না হলে পড়ার বই, অর্থাৎ পাঠ্যবই নিয়ে কেন আমাদের লুকোচুরি ছিল? ইতিহাসের বইয়ের ওপর স্বপন কুমার সিরিজের বই বসিয়ে দিয়ে এমন একটা ভাব করতাম যে মা দেখে, যাকে বলে, অভিভূত হয়ে যেতেন। ভাবতেন, আমার ছেলে ভালোই পড়ছে।
মাকে ঠকানো সহজ ছিল। কিন্তু বাবার সঙ্গে এই ঠককাণ্ড করতে গিয়ে একবার ধরা পড়ে যে সাজা হলো তা বলার মতো নয়। বাবার দেওয়া দণ্ডে স্বপন কুমার নির্বাসনে গেলেন। যাবজ্জীবনের জন্য।

চার
সবচেয়ে ভালো হয় লেখক যদি নিজের ভালো পাঠক হন, পা-ঠক নন। তাহলে একটা বই অনেক দিন তাঁর করোটির ভেতর লেখা হতে হতে যখন কাগজে ছাপা হয়ে বেরোবে, তাঁর পাঠকেরা ঠকবেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.