পুতিন এবং রাশিয়ার অসমাপ্ত অর্থনৈতিক উন্নয়ন

কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত রাশিয়ার প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে ভ্লাদিমির পুতিন তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে চতুর্থবারের মতো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। এ জয়ের মাধ্যমে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পুতিনের ক্ষমতা পাকাপোক্ত হলো। এর আগে ২০০০-৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন পুতিন। দেশটির গঠনতন্ত্রে পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট হওয়ার অনুমোদন না থাকায় ২০০৮-১২ সাল পর্যন্ত দিমিত্রি মেদভেদেভ দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন এবং পুতিন তার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। কার্যত মেদভেদেভ ছিলেন একজন ছায়া প্রেসিডেন্ট, যেখানে পুতিনের ইশারায়ই দেশটির সবকিছু পরিচালিত হতো। ২০০৮ সালে রাশিয়ার গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আনা হয়, যাতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার মেয়াদ চার বছর থেকে বাড়িয়ে ছয় বছরে উন্নীত করা হয়। ফলে ২০১২-১৮ সাল পর্যন্ত তৃতীয় মেয়াদে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশ পরিচালনা করেন পুতিন।

পুতিন যে সময় রাশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, সেটা রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য ছিল এক ক্রান্তিলগ্ন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে নতুন এক রাশিয়ার জন্ম হয়। এ নবজন্মা রাশিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই উচ্চাশা পোষণ করেছিলেন। সাম্যবাদের সাত দশকের বেড়াজাল ভেঙে গণতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতির উন্নয়ন সহজতর নয়, সে কথা বোধগম্য; কিন্তু একটা অচল অর্থনৈতিক প্রথাকে ভেঙে তার জায়গায় বাজার অর্থনীতির বাস্তবায়ন অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে— এমন ধারণা অমূলক নয়। যদিও বরিস ইয়েলিসন ১৯৯১ সালে প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের প্রচারণায় তার পূর্বসূরিদের ‘একনায়ক’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের অনুদার অর্থনৈতিক নীতির কঠোর সমালোচনা করেছিলেন, তিনি নিজেও কিন্তু বাজার অর্থনীতিতে রাশিয়ার প্রত্যাবর্তনের কোনো ইঙ্গিত করেননি। তদুপরি রাশিয়ার জনগণ ‘সাম্যবাদ’ প্রথার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তত্পর ছিল এ কারণে যে, রাজনৈতিক কর্মীদের অদূরদর্শিতা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সুবিধা ভোগ দেশটির আপামর জনসাধারণকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে রেখেছিল। অন্য কথায় বলতে গেলে, সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক নেতারা সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে যত ক্ষেপণাস্ত্র ও ট্যাংক তৈরি করেছিলেন, জনগণের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য সে পরিমাণ খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারেননি। বরিস ইয়েলিসন সে অবস্থা থেকে উত্তরণের আহ্বান জানিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করেছিলেন।

এ কথা বলতে হবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়ার প্রকৃত গণতন্ত্রে উত্তরণের যে একটা আশু সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, সেটাও পরবর্তীতে অর্জন হয়নি; বরং রাশিয়ায় শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট ক্ষমতার যে ঐতিহ্য আজ বিদ্যমান, সেটা ইয়েলিসন ১৯৯৩ সালের গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে খুব পাকাপোক্ত করেছিলেন। রাজনৈতিক এ উন্নয়ন ছাড়া স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী এক দশকে রাশিয়ার অর্থনীতিতে মূলত উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে অর্থনীতির উন্নয়নে ইয়েলিসনের প্রচেষ্টার কোনো কমতি ছিল না। রাজনৈতিকভাবে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও তথাকথিত পশ্চিমা ধাঁচের ‘শক থেরাপি’ অনুকরণের মাধ্যমে রাশিয়ার রুগ্ণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার প্রচেষ্টা সাধুবাদ পাবে সে কথা নিশ্চিত। আর এ শক থেরাপির মূল প্রতিপাদ্য ছিল দামের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ক্রমান্বয়ে উদারীকরণ করে বাজার অর্থনীতির প্রবর্তন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ভর্তুকি হ্রাসের মাধ্যমে বিরাষ্ট্রীকরণ।

তবে শক থেরাপির ‘শক’ বিশেষ করে দামের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি জনগণের জন্য ছিল অসহনীয়। শক থেরাপির প্রথম বছর অর্থাৎ ১৯৯২ সালে রাশিয়ার মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় বার্ষিক ২ হাজার ৫২০ শতাংশে। জনগণের কষ্টার্জিত আয়ের একটা অংশ, যা ব্যাংক বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমানো ছিল, তা রাতারাতি মূল্য খুইয়ে কাগজে পরিণত হয়। ভর্তুকি তুলে দেয়ায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যায়। ফলে কর্মক্ষম অনেক লোক কর্মহীন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বিনিময় বাজারে বিদেশী মুদ্রার বিপরীতে রুবলের (রাশিয়ার মুদ্রা) অস্বাভাবিক মূল্যহ্রাসে দেশী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারলেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও জোগান ছিল চরম অস্থিতিশীল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচন মুদ্রানীতির মাধ্যমে রুবলের অস্বাভাবিক দরপতন ঠেকাতে চেষ্টা করে। এতে কিছুটা সফল হলেও জাতীয় আয় ও ব্যয়ের সামঞ্জস্য ছিল না মোটেও।

বিশেষ করে পশ্চিমা ধাঁচের অর্থনৈতিক রূপরেখা (ওয়াশিংটন কনসেনসাস বা ওয়াশিংটন ঐক্য) যার আদলে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী রাশিয়ার অর্থনৈতিক সংস্কার করা হয়েছিল, সেটা রাশিয়ার আর্থসামজিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য ছিল না। এর অশুভ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছিল সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণে। কীভাবে বেসরকারীকরণ করা হবে বা ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পদ রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো বিদ্যমান আছে কিনা, সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে কত দ্রুত বেসরকারি করা হবে, সেটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। আর এটা সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর আশু উদ্ভাবন করা হয়েছিল, যা টেকসই ছিল না মোটেও। এ কথা বলা নিষ্প্রয়োজন, ‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’ প্রস্তাবিত বাজার নীতিগুলো রাশিয়ার জন্য সঠিকভাবে কাজ করেনি; বরং সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ‘সর্বজনীন সম্পদ’ বিরাষ্ট্রীকরণের মাধ্যমে কতিপয় গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়। এতে সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে দুর্নীতি।

 

রাজনৈতিক ও অর্থনীতির এমন ক্রান্তিলগ্নে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুতিনের আবির্ভাব। ইয়েলিসন সরকারের চেয়ে পুতিন রাশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতি বেশি মনোযোগী ছিলেন— এমন কথা পুতিনের মিত্ররাও জোরগলায় বলতে পারবেন না; বরং প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমের সবটুকু ফায়দা পুতিনের চেয়ে বেশি কেউ ভোগ করেছেন বলে রাশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না। বিনিময়ে অবশ্য পুতিন রাশিয়াকে অনেক কিছুই দিয়েছেন, যা অন্য কারো পক্ষে এত অল্প সময়ে দেয়া সম্ভব বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন না। যেমন— রাশিয়া কিছু ক্ষেত্রে তার প্রকৃত ক্ষমতার চেয়েও বেশি দাপট বজায় রেখেছে, পারমাণবিক শক্তি যার একটি উদাহরণ। আবার জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে দেশটির ভেটো দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির তথ্য হ্যাকিং প্রমাণ করে রাশিয়ার সাইবার ক্ষমতা পশ্চিমা বিশ্বের নির্বাচনে অনধিকার চর্চা করার মতো পর্যায়ে পৌঁছেছে।

অর্থনৈতিক দিক দিয়েও পুতিন রাশিয়াকে একটা টেকসই উন্নয়নের দিকে ফেরাতে সমর্থ হয়েছেন— এ কথা হলফ করেই বলা যায়। গত শতকের শেষ দশকে রাশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন গড়ে ২ শতাংশ করে কমেছে। পুতিন তার প্রথম দুই মেয়াদে এ প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশেরও বেশিতে উন্নীত করতে সমর্থ হন। ২০০০ সালে রাশিয়ার জনগণের মাথাপিছু দেশজ উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৭৭২ মার্কিন ডলার (বর্তমান মূল্যে), যা ২০০৮ সালে ১০ হাজার মার্কিন ডলার মাইলফলক অতিক্রম করে। ২০০০ সালের ৪৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতিকে পুতিন তার দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দিকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করেন।

সম্ভবত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতেও পুতিন ছিলেন খুবই তত্পর। রাশিয়ায় বেকারের হার গড়ে ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ (১৯৯৩-২০০০) থেকে কমে ৮ দশমিক ২২ শতাংশে (২০০১-১০) নেমে আসে, যা পরবর্তীতে ৫ শতাংশে নেমে আসে পুতিনের তৃতীয় মেয়াদের শেষের দিকে। সাধারণ জনগণের কাজের ব্যবস্থা করতে পারলে তারা রাজনীতি নিয়ে খুব বেশি একটা হইচই করে না, সেটা রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যায়। আয় বণ্টনের বৈষম্যের খুব বেশি উন্নতি না হলেও প্রান্তিক জনগণের আয় বেড়েছে পুতিনের শাসনামলে। আর এসব নিয়ামকই পুতিনকে চতুর্থ মেয়াদে জয়লাভ করতে সহায়তা করেছে নিঃসন্দেহে।

পুতিনের আসল চ্যালেঞ্জ হবে রাশিয়ার অর্থনীতির ঊর্ধ্বগতির যে শুভ সূচনা হয়েছে তা যথাযথভাবে ধরে রাখা এবং এটি আরো বেগবান করা। একদা বিশ্বের দুই পরাশক্তির একজন, রাশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ জার্মানির মাত্র ৪০ শতাংশ আর ফ্রান্সের ৫০ শতাংশের একটু বেশি। জন্মের আয়ুষ্কালের ভিত্তিতে রাশিয়ার স্থান বিশ্বে ১৫৩তম, হন্ডুরাস ও কাজাখস্তানের উপরে। ক্রয়ক্ষমতার সমতাভিত্তিক মাথাপিছু গড় আয় অনুযায়ী রাশিয়ার অবস্থান এখন বিশ্বে ৭৩তম, যা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর চেয়ে অনেক কম। এছাড়া রাশিয়ার শিল্পায়ন ক্রমান্বয়ে কমে এসেছে এবং দেশটির রফতানির বেশির ভাগই এখন আসে প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে। বলা বাহুল্য, বিশ্বের যে কয়টি প্রধান তেল উৎপাদন ও রফতানিকারক দেশ আছে, রাশিয়া তাদের মধ্যে অন্যতম। বর্তমান বাজারে তেলের অস্বাভাবিক দরপতনে রাশিয়াসহ তেল উৎপাদনকারী দেশের অর্থনীতি বেশ হুমকির মুখে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য সংস্থা এসব দেশের সরকারকে ব্যয়ের কৃচ্ছ্র সাধনে জোরেশোরে তাগিদ দিচ্ছে। তবে রাশিয়া এ পথে কতটুকু হাঁটতে পারবে তা এ মুহূর্তে অনিশ্চিত।

বিশ্ব এখন নতুন এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির বুনিয়াদ যে এখন অনেকটাই অচল রাশিয়া ও চীনে, সেটা আরো পরিষ্কার করে দিয়েছে পুঁজিবাদকে নিজেদের সংস্করণে গ্রহণের মধ্য দিয়ে। তবে এক্ষেত্রে রাশিয়া একটু ভিন্ন। অনেক প্রত্যাশা নিয়ে বাজার অর্থনীতিকে আলিঙ্গন করার যে প্রত্যয়, সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। লাগসই বাজার অর্থনীতিতে উত্তরণের পরিবর্তে দেশটি রূপান্তর হয়েছে এক ধরনের গোষ্ঠীকেন্দ্রিক পুঁজিবাদে, যেখানে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিই হচ্ছে অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। আরো পরিষ্কার করে বলা যায়, রাশিয়ার অর্থনীতি আত্মকেন্দ্রিক এবং লোভের যে সুযোগ তৈরি করেছে, তাতে লোভ সংবরণ করা যে কারো জন্যই কঠিন। তবে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বর্তমানে এমন এক প্রয়াস দরকার, যা শুধু একটি গোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়ন না করে সবাইকে সমৃদ্ধির অংশীদার করবে। চতুর্থ মেয়াদে পুতিন কতটুকু সফল হবেন তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে কত সুকৌশলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারবেন তার ওপর।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.