‘পুড়ির বাড়িত ইস্তারি’ অমানবিক প্রথায় বন্দী পিতা

প্রকাশিত: ৯:২১ অপরাহ্ণ, মে ১২, ২০২০

‘পুড়ির বাড়িত ইস্তারি’ অমানবিক প্রথায় বন্দী পিতা

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি :
অতিথি পরায়ন সিলেটের মানুষের রয়েছে অতিথি আপ্যায়নে রয়েছে দারুণ সুখ্যাতি। বিশেষ করে সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার আপন ঐতিহ্য-রমজান মাসে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে ইফতারি নিয়ে যাওয়ার রেওয়াজটি বহুকাল ধরে চলে আসছে। সিেেলটের আঞ্চলিক ভাষায় এটাকে ‘পুড়ির বাড়িত ইস্তারি’ বলা হয়।
রমজান মাস এলে নিজ বাড়িতে বানানো ইফতারি মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যেতেন তার অভিভাবকেরা। এখন সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে ‘পুড়ির বাড়িত ইস্তারি’ দেয়ার রেওয়াজেও এসেছে পরিবর্তন। অতীতের ন্যায় সেই নিজ বাড়িতে তৈরী ইফতারি এখন আর মেয়ের বাড়িতে কেই নিয়ে যান না। সে স্থান এখন দখল করে নিয়েছে হাটবাজারে বানানো বিভিন্ন পদের ইফতারি। বাজারের তৈরী বাহারী ইফতারী এখন পাঠানো হচ্ছে মেয়ের শশুর বাড়ীতে। মেয়ের বাড়ীতে এই ইফতারি প্রেরণের বিষয়টি ধনীদের কাছে দারুণ খ্যাতির ব্যাপার হলেও অসহায় গরিব মানুষের কাছে এ
যেন এক আতঙ্কের নাম। আমরা কেউ দিচ্ছি আর কেউ নিচ্ছি। আমাদের চোখের সামনেই চলছে এটা অবিরত। কিন্তুু আমরা কেউ কি একবার ভেবে দেখেছি, এই ইফতারি দিতে কনের গরিব পিতার-মাতার উপর কি পরিমাণ চাপ যাচ্ছে। একেকটি ইফতারি দিতে নূন্যতম চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মিষ্টি সহ আনুসাঙ্গিক অন্যান্য জিনিষ দিতে হয়। এক্ষেত্রে ঐ দরিদ্র পিতার যদি পাঁচ কন্যা থাকে তাহলে সেই পাঁচ কন্যর সকলের বাড়ীতে ইফতারি দিতে কি যে অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। আপনি জানেন কি এই ইফতারি দিতে কেউ কেউ ঘরের গরু-ছাগল বিক্রি করে। কেউ ধার-কর্জ করে ইফতারি পাঠাচ্ছে। বর্তমানে ইফতারি যেন ‘ফরজ’ হয়ে আছে। এই অমানবিক প্রথার অবসান হওয়া দরকার। শিক্ষিত বা অশিক্ষিত জাতির মাঝে কোন পার্থক্য এই ইফতারির ক্ষেত্রে নেই। আমাদের সবার মধ্য থেকে এই ইফতারি কে ঘৃণার চোখে দেখতে হবে। তাহলেই সম্ভব, পরিবর্তন হবে অমানবিক এই সামজিক রীতির।
কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের হারিছ মিয়া পেশায় একজন ছোটখাটো ব্যবসায়ী। তার স্ত্রীর আবদার মেয়ের বাড়িতে ‘পহেলা ইফতারি’ ঘটা করে পাঠাতে হবে। তবে মেয়ের বাড়িতে ইফতার পাঠাতে হবে যতই হোক মেয়ের মুখ উজ্জ্বল করতে এই সামাজিক প্রথা মানতে হবে। হারিছ মিয়ার মতো মেয়ের বাড়িতে ইফতারি পাঠানোর এই প্রথা রক্ষা করতে গিয়ে শুধু কমলগঞ্জ নয় গোটা মৌলভীবাজার জেলার মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে নানাভাবে হিমশিমের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। প্রবাসী অধ্যূষিত এ জেলার অনেক পরিবারের কাছে মেয়ের বাড়িতে (ফুড়ির বাড়ি) ইফতারি দেওয়ার প্রথা ঐতিহ্য মনে হলেও মধ্যবিত্ত পরিবার গুলোর কাছে এ যেন এক মুর্ত্তিমান আতঙ্কেরই নামান্তর।
কমলগঞ্জের বিভিন্ন বাজার ঘুরে ইফতারি কিনতে আসা বেশ ক‘জন অভিবাবকের সাথে আলাপ হয় এ প্রতিবেদক, এতে বেশ কয়েকজনের সাথে ইফতারি নিয়ে আলোচনা করেন। ইফতারি কিনতে আসা সামসুজ্জামানের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আমার “তিনটি মেয়ে” প্রতিবছরই আমার মেয়েদের বাড়িতে ইফতার পাঠাতে হয় ।
কেন ইফতারি দেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাবারে এটা এখন একটা স্টাইল হয়ে দাড়িয়েছে। যদি ইফতারি না পাঠাই তবে মেয়েগুলোর মুখ ছোট হয়ে যাবে। শমসের নগরের ভাই ভাই রেষ্টুরেন্টের সামনে লাইন ধরে মিষ্টি, জিলাপি, সাদা নিমকি কিনতেছেন অনেক ক্রেতা । যাহা ইফতারি হিসাবে যার যার মেয়েদের বাড়িতে পাঠাবেন। মাধ্যম হিসাবে কেউ সিএনজি কেউ আবার নোহা রিজার্ভ করে ইফতারি নিয়ে মেয়ের বাড়িতে যাবেন। এমনি একজন শরিফপুর ইউনিয়নের বাসিন্দ মশিউর রহমান চেহারা মলিন করে ইফতারি কিনতেছেন। কাছ ঘেষে তার অনুভূতি জানতে চাইলে তার কাছ থেকে পাওয়া গেলো দুঃখ ভারাক্রান্ত জবাব, ‘আমি হয়ত নিঃস্ব হয়ে যাব। একদিকে করোনাভাইরাসে আমার সব ব্যবসা বন্ধ। তার উপর মেয়েদের বাড়িতে ইফতারি। এ যেন ‘মরার উপর খারার ঘা’ তবে আত্মসম্মান রক্ষার্থে ইফতারি দিতেই হবে ।’
প্রতি বছর রমজান মাসে মৌলভীবাজার জেলায় শুরু হয়ে যায় মেয়ের বাড়িতে ইফতারি পাঠানোর ধুম। বিত্তবানদের কাছে মেয়ের বাড়িতে ইফতার পাঠানো অনেকটা আনন্দের মনে হলেও চরম বিপাকে পড়তে হয় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। ফলে মৌলভীবাজার জেলার দরিদ্র পরিবারগুলোর কাছে ইফতারি পাঠানোর প্রথা এখন আতঙ্কের আরেক নাম। এদিকে জেলার বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন বিভিন্ন সময়ে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে “পুড়ির বাড়িত ইস্তারি” নামক প্রথা থেকে বের হয়ে আসার আহবান জানিয়ে আসলেও কোন প্রতিকার মিলছেনা। সমাজের সচেতন মহল মনে করেন যদি প্রতিটি গ্রাম, ইউপি, পরিবারের মধ্যে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে উন্মুক্ত আলোচনা করা যায় তবে হয়তে একটা প্রতিকার সম্ভব হবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ