প্লাস্টিকে হারিয়ে গেল বাঁশ-বেতের ঐতিহ্য !

প্রকাশিত:রবিবার, ০৭ জুন ২০২০ ০১:০৬

প্লাস্টিকে হারিয়ে গেল বাঁশ-বেতের ঐতিহ্য !

হবিগঞ্জ :
পল্লীবাংলার আবহমান ঐতিহ্য বাঁশ-বেতের তৈরী ডালা, কুলা, সাজি ছিকে সব’ই হারিয়ে যাচ্ছে প্লাস্টিকে। পরিবার পরিজন নিয়ে শহরে বসবাস করেন, কিন্তু গ্রামের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ভালোবাসেন এমন শৌখিন মানুষরা বাঁশ-বেত শিল্পকে দৃষ্টিসীমায় রাখতে চান। তাই তারা দৃষ্টিনন্দন বেত ও বাঁশজাত পণ্য দিয়ে ঘর সাজাতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। অনাদিকাল থেকে এ দেশে বেত-বাঁশের তৈরি পণ্যসামগ্রী সাদরে ব্যবহার হয়ে আসছে। দৈনন্দিন জীবনে বাঁশ শিল্পীদের তৈরি বিভিন্ন শৌখিন পণ্যসামগ্রীর জুড়ি নেই। গ্রামাঞ্চলের ঐতিহ্য বিভিন্ন বাহারি নামের বাঁশ দিয়েই এসব পণ্য তৈরি করা হয়।
কুটির শিল্পীদের তৈরি বাঁশ ও বেতের গৃহস্থালি সামগ্রীর একসময় বেশ কদর ছিল। শহরে বসবাসরত সৌখিন লোকজন বাঁশের তৈরি চেয়ার, টেবিল, বইয়ের সেল্ফ, লাইট স্ট্যান্ড, মোড়া সোফাসেট ইত্যাদি ব্যবহার করতেন। কালের পরিবর্তনে ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিনন্দন ও গ্রাম বাংলার গৌরব বাঁশ-বেতের তৈরি হরেকরকম জিনিসপত্রের স্থান দখলে নিয়েছে প্লাস্টিকজাত পণ্য। উদাহরণ হিসেবে বলাযায় বেতের তৈরি কুটির শিল্প সামগ্রী রিকশা, গরুর গাড়ি, বেতের নৌকা, বালতি, ঝুড়ি, ফুলদানী, বেতের ট্রে, ভ্যানগাড়ি, বাঁশের ট্রে, বেতের চালনি, মোড়া, কুলা, ডালা ও বিভিন্ন রকমের আসবাবপত্র গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরিতে বাঁশ-বেত প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করা হতো। উল্লেখিত পণ্য সামগ্রীর সবগুলোই এখন প্লাস্টিকের তৈরী হচ্ছে এবং এগুলো বেশ জনপ্রিয়ও বটে। বিশেষ করে শিশুদের বিনোদন সামগ্রী দোলনা শহর গ্রাম সর্বত্র ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ও সমাদৃত।
তাছাড়া, এখন প্রায়ই দেখা যাচ্ছে শহরের পাড়া মহল্লা ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ফেরিওয়ালারা ব্যাপক হারে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্লাস্টিক সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে। এতে প্লাস্টিকের তৈরী গৃহস্থালি বিভিন্ন সামগ্রী যেমনি সহজলভ্য হচ্ছে তেমনি সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। প্রত্যক্ষভাবে এগুলো বাঁশ-বেতের জিনিসপত্রের স্থান পুরোপুরি দখলে নিয়েছে। অন্যদিকে, এক সময়ে গ্রামাঞ্চলের মানুষের ঘর বাড়িগুলো নির্মাণের মূল উপাদান ছিল বাঁশ ও ছন। এখন আর ওই দৃশ্য চোখে পড়ে না। ঘর বাড়ি তৈরিতে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে টিন ও পাকা খুঁটি। অপরদিকে, চাষাবাদের কাজে গরু ছাগলের হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য বাঁশের বেড়া ছিল একটি অপরিহার্য উপাদান। এখন দেখা যাচ্ছে, সেই বাঁশের বেড়ার গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি পুরোপুরি দখল করেছে দৃষ্টিনন্দন টেকসই বৈশিষ্ট্যের প্লাস্টিক দিয়ে তৈরী বেড়া। এ ক্রম পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত থাকলে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম বাঁশ ও বেতের ব্যবহারের ইতিহাস শুধু বই পুস্তকে পড়বে, আর বিধাতা সুপ্রসন্ন হলে বাঁশ সামগ্রীর নমুনা যাদুঘরে দেখতে পাবে। এ সমস্ত কারণে বেত এবং বাঁশ সামগ্রীর ব্যবহার ও অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।
এ ব্যাপারে আলাপকালে উপজেলার মররা গ্রামের বাসিন্দা, বাঁশ শিল্পী অলি উল্লা জানালেন, বাঁশের মূল্য বৃদ্ধি ও অপ্রতুলতার কারনে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা আর আগের মতো তৈরী ও বিক্রি করতে পারছে না। বাঁশ ও বেতের জিনিসপত্র তৈরী ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত বাঁশের রাজধানী খ্যাত সুরাবই (সুতাং) গ্রামের জান্নাত আলী বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে বাঁশ ও বেতের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে তবে, শৌখিন পণ্য হিসেবে এখনো শহরে বাঁশ পণ্যের চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। ভালো বাঁশের নিখুঁত পণ্য তৈরি করতে পারলে কুটির শিল্পের আওতায় দেশের চাহিদা মিটিয়ে এসব পণ্য বিদেশেও রফতানি করা যায়। এ ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প ও বাঁশ বেতের ব্যবহার পুনরুজ্জীবিত করতে হলে গ্রামে গঞ্জে বাঁশ ও বেত শিল্পীদের সরকারি ও বেসরকারি প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন। তা নাহলে ধীরে ধীরে বাঁশ ও বেতের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে বলে মনে করেন গ্রামের সচেতন মহল।।

এই সংবাদটি 1,225 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •