বাংলাদেশের ইসরাইল নীতি কী হবে এখন?

প্রকাশিত:শনিবার, ২২ আগ ২০২০ ০৮:০৮

বাংলাদেশের ইসরাইল নীতি কী হবে এখন?

 

আনিস আলমগীর , সাংবাদিক ও কলামিস্ট
গত বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট, ২০২০ সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরাইল পরস্পর পরস্পরকে স্বীকার করে নেওয়ার এক অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকরা একে বলছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে একটি ভূ-রাজনৈতিক ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে’। মিসরের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের জেরুসালেমে যাওয়ার মতো, বা হোয়াইট হাউসের লনে ইতজাক রাবিনের সঙ্গে ইয়াসির আরাফাতের করমর্দনের সঙ্গেও এর তুলনা চলে না- তারপরও অনেকের বিশ্বাস এই সম্পর্ক বদলে দিবে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের চিত্র।
মিসর, জর্দান, তুরস্কের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি পুরনো হয়ে গেছে। তুরস্ক প্রথম মুসলিম রাষ্ট্র যারা ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। ইরানের সঙ্গেও রেজা শাহ পাহলভীর সময় ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল কিন্তু ১৯৭৯ সালে আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতোল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের পর ইরান সেই সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটায়। এখন যোগ হল ইউএই।
এক যুক্ত বিবৃতিতে ইসরাইল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গতিশীল দুটি সমাজ এবং অগ্রসর দুটি অর্থনীতির মধ্যে এই সরাসরি সম্পর্কের সূচনা পুরো অঞ্চলকে বদলে দেবে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ত্বরান্বিত হবে এবং মানুষে-মানুষে সম্পর্ক তৈরি হবে।’ বলা হয়েছে, একটি আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে এই সম্পর্কের বিনিময়ে ইসরাইল পশ্চিম তীরের যেসব ফিলিস্তিনি এলাকা তার সীমানায় ঢোকানোর পরিকল্পনা করছিল, তা আপাতত স্থগিত রাখবে। অবশ্য এক টেলিভিশন ভাষণে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেছেন, তিনি পশ্চিম তীরের কিছু অংশ ইসরাইলের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা স্থগিত রাখলেও তা বাতিল করেন নি, এই পরিকল্পনা এখনো আছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু, দুজনেই অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই সমঝোতা থেকে কিছু ফায়দা তুলতে পারেন। নেতানিয়াহু দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে যে বিপদের মধ্যে আছেন, সেখান থেকে মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর জ্ন্য এটিকে কাজে লাগাতে পারবেন। আর আগামী নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্প এটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য বলে প্রচার করবেন। ট্রাম্পই প্রথম টুইট করে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদের মধ্যে এই চুক্তিকে এক ‘ঐতিহাসিক মূহুর্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন।
ট্রাম্পের সিনিয়র উপদেষ্টা ও হহুদি জামাতা জেরাড কুশনার বলেছেন, আমি জানি, আরব আমিরাত-ইসরাইলের চুক্তির ফলে ইসরাইলিরা যেমন উচ্ছ্বসিত তেমনি অনেক মুসলিমরা সহজেই মসজিদে আকসায় যেতে পারবে। ইসরাইলিরা যেমন দুবাই হয়ে বিমান সেবা পাবে তেমনি দুবাই হয়ে অন্য দেশের মুসলিমরাও মসজিদে আকসায় যেতে পারবে। এরইমধ্যে চুক্তিকে স্বাগত জানানোয় মিসর, ওমান ও বাহরাইনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই পদক্ষেপকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখছে। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এর নিন্দা করে বলেছেন, ‘এটি জেরুসালেম, আল-আকসা এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।’ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ফিলিস্তিনি দূতকে এরই মধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস বলেছে, এটি ফিলিস্তিনি জনগণের পিঠে ছুরিকাঘাত।
ইরানও খুব কঠোর ভাষায় এই সমঝোতার নিন্দা করেছে। ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের সিদ্ধান্তকে ‘বিপজ্জনক’ এবং ‘বোকামি’ বলে বর্ণনা করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ফিলিস্তিনদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য ইউএই কখনোই ক্ষমা পাবেনা। খুবই কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে তুরস্কও। তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়িপ এরদোয়ান বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ হজম করা যায় না।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, বিশ্বের বহু মুসলিম রাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে সংহতি প্রকাশ করে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর অদ্যাবধি ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের স্বার্থরক্ষা করা ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে তাদের সঙ্গে ইসরাইলের বিরোধ নেই। এরকম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। বাংলাদেশের সঙ্গে ইসরাইলের কোনো সীমান্ত নেই। উভয় রাষ্ট্রের অবস্থান সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে। বাংলাদেশের অবস্থা আরব স্বার্থের জন্যই সহমরণের মত। কিন্তু দুঃখের বিষয় আরব রাষ্ট্রগুলো মুসলিম বিশ্বের অনুরূপ দৃঢ় সংহতি গত ৭২ বছর কোনো কাজে লাগাতে পারেনি। বরঞ্চ ধীরে ধীরে তারা ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে ফেলেছে।
মুসলিম বিশ্বের মোড়ল, মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম দেশ সৌদি আরব তলে তলে গত দুই বছরব্যাপী ইসরাইলের সঙ্গে মধুর সম্পর্ক স্থাপন করে রেখেছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই শুধু। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক স্থাপনের পর তারাও আমেরিকার চাপের মুখে সে পথে হাটবে বলে জল্পনা-কল্পনা চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৯ আগস্ট হোয়াইট হাউস নিউজ কনফারেন্সে বলেছেন, তিনি আশা করেছিলেন যে ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষিত চুক্তিতে সৌদি আরব যোগ দেবে, যা দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ককে পুরোপুরি স্বাভাবিক করার দিকে নিয়ে যাবে।
অবশ্য বার্লিন সফরকালে ১৯ আগস্ট সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান ফিলিস্তিনের সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাবনাটি উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সম্পর্কের যে কোনো সাধারণীকরণের পূর্ব শর্ত হিসেবে ইহুদি রাষ্ট্রটি ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। ‘একবার এটি অর্জন করা গেলে সমস্ত কিছু সম্ভব’, তিনি যোগ করেন।
বাস্তবতা হচ্ছে, শেখ শাসিত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের প্রকাশ্য ঘোষণা প্রদান করায় অন্যরাও সে পথে হাঁটবে। আরবরা যখন ইসরাইল প্রশ্নে ঐক্য ভেঙ্গে ফেলেছে তখন বাইরের মুসলিম জগত নিস্ফলা ঐক্যের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে লাভ কি! ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আরব রাষ্ট্রগুলো যখন পাকিস্তানের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে পাকিস্তানকে সাহায্য করেছে তখনও কিন্তু বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার ফিলিস্তিন ইস্যুতে আরবদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে পিছপা হয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ইসরাইলের ভূমিকা ছিল বিস্ময়কর। ‘৭১ সালের ২ জুলাই ইসরাইলি পার্লামেন্ট বাঙালিদের উপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বেপরোয়া ধ্বংসলীলায় নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়। এমনকি ইসরাইল রেডক্রস বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা, শরণার্থীদের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঔষধ কাপড় ও খাবার পাঠায়।
শুধু তাই নয় ইসরাইল বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্র যারা ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করেছিল। অথচ আরবরা তখন বাঙালিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি কোনো সহানুভূতি প্রকাশ করেনি বরং পাকিস্তানকে সাহায্য করেছিল। তবুও বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার সব সহানুভূতিকে অপেক্ষা করেছিল। কোনো অসহায় মানুষ সমুদ্রে পড়ে গেলে সামান্য অবলম্বন পেলেও তা ধরে বাঁচতে চায়। এখানে ইসরাইলের স্বীকৃতি কোনো সামান্য কিছু নয়। একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রের সমর্থন। বাংলাদেশ তার চরমতম দুর্গতির সময়ও মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি হোক এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত ছিল। মুসলিম উম্মাহর প্রধানসারির দেশগুলোর ভূমিকায় যথন পরিবর্তন আসছে, বাংলাদেশ এখন কী করবে!
গত ৭২ বছর ইসরাইলের বিরোধিতা করে তেমন কোনো উপকার মুসলিম বিশ্ব ফিলিস্তিনিদের জন্য আদায় করতে পারেনি। ১৯৯৮ সালে আলোচনার মাধ্যমে ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানের যে প্রক্রিয়া আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন নিয়েছিলেন সেই উদ্যোগের ফলে সেই বছর ২৩ অক্টোবর ‘শান্তির বিনিময়ে ভূমি’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। আগের যেকোনো প্রচেষ্টা থেকে তা ফলপ্রসূ ছিল।
৭২ বছর ইসরাইলের অস্তিত্ব মেনে নিতে চায়নি মুসলিম বিশ্ব কিন্তু ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তি সম্পাদনের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিরা কিছু জায়গার অধিকার পেয়েছিল। অস্ত্রচুক্তির পর দুই রাষ্ট্রের কাঠামোতে ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানের একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল কিন্তু বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দুই রাজনৈতিক সমাধান চাচ্ছেন না যে কারণে উদ্যোগটা এখন হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। এখন দেখছি পরস্পর পরস্পরকে মেনে নেওয়া বা স্বীকৃতি দেওয়ার আরেক নতুন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মনে হয় এই উদ্যোগই হবে ফলপ্রসূ উদ্যোগ। কারণ বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কোনো সমস্যা সমাধান হবে না।
আমার মতে, ইসরাইল রাষ্ট্রের বাস্তবতাকে স্বীকার করে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের উচিত ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে সমস্যা সমাধানে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা। সম্পর্ক থাকলে কথা বলা যায়, অল্প-বিস্তর চাপ দেয়া যায়। ইসরাইল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে যেসব এলাকা দখল করেছিল তাতো একে একে সব গ্রাস করে ফেলছে। অসলো চুক্তির কথামতো ফিলিস্তিনিরা গাজায় বসতি করেছে সত্য কিন্তু পশ্চিম তীরেতো ইহুদিরাও বসতি স্থাপন করছে। দুই রাষ্ট্রের বাস্তবতাই ইসরাইল-ফিলিস্তিনের সমস্যার সমাধান ছিল। কিন্তু সেখানে যদি প্রয়োজনে কম্প্রোমাইজ করে শান্তি স্থাপন করা যায় সেটি ফিলিস্তিনিদের জন্য নয় শুধু- বিশ্ব শান্তির জন্যও মঙ্গল।
আর একটি বিষয় আমার কাছে এখনও বিস্ময়কর- মুসলিম, খ্রিস্টান আর ইহুদি- তিন ধর্মের লোকই আল্লাহতে বিশ্বাসী, তারা বিশ্বাস করে তাদের ধর্মগ্রন্থ আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত। অন্ততপক্ষে মুসলমানদেরতো এই বিশ্বাস স্থাপন করতেই হয় যে, এই তিন ধর্মের নবী তাদেরও নবী এবং তিন ধর্মের ধর্মীয় কিতাবেও তাদের বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়। তাহলে এই হানাহানি বন্ধের জন্য তারা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিও কাজে লাগায় না কেন!
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
anisalamgir@gmail.com

এই সংবাদটি 1,228 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •