বাংলাদেশের দুর্নীতির স্বরূপ ও এর প্রতিকার

প্রকাশিত:বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলা ২০২০ ১২:০৭

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াঃ
কিছুদিন আগে ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর কয়েকটি বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এমনকি গণমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। এত অধিকসংখ্যক ছাত্রছাত্রী কেন বিসিএস চাকরির জন্য আবেদন করেন, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়াররা কেন সাধারণ ক্যাডার পদে ঢুকছেন, বেসরকারি চাকরি কিংবা গবেষণার দিকে মেধাবী ছেলেমেয়েরা কেন আকৃষ্ট হচ্ছেন না ইত্যাদি। অনেক লেখালেখি ও মন্তব্যের মধ্যে একজন অবসরপ্রাপ্ত শীর্ষ পর্যায়ের আমলা এবং সুপরিচিত একজন শ্রদ্ধেয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের মতামতের প্রতি আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। শেষোক্ত জনকে আমি শ্রদ্ধা করি এবং তার লেখার আমি একজন একনিষ্ঠ পাঠক। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে একটি অনলাইন পত্রিকায় সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন, ‘দুর্নীতির ব্যাপকতাই বিসিএসের প্রতি মোহ তৈরি করেছে।’ ‘সমাজ-রাজনীতির সর্বত্র দুর্নীতি গ্রাস করেছে। অনিয়মই নিয়ম হয়ে গেছে।’ ‘প্রশাসনের কর্তারা জানেন, দুর্নীতি করে পার পাওয়া যায়।’ তবে তিনি এও বলেছেন, ‘সবাই হয়তো দুর্নীতি করেন না।’ ‘তাঁর মতে, ‘বিসিএস পরীক্ষায় কেন এত মোহ, এ প্রশ্ন গণমাধ্যমের তোলা উচিত। উত্তরও বের করতে হবে। তাহলেই দেখবেন মোহ কেটে যাবে। তখন এ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকেই বিজ্ঞানী, গবেষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হবে।’
‘দুর্নীতির ব্যাপকতাই বিসিএসের প্রতি মোহ তৈরি করেছে’—এ মন্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারছি না। এ মন্তব্যের মাধ্যমে প্রকারান্তরে বোঝানো হয়েছে যে বিসিএস চাকরিতে ঢুকে অবাধে দুর্নীতি করে অর্থ উপার্জনের সুযোগ রয়েছে এবং এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ধনসম্পদের অধিকারী হওয়ার জন্যই মেধাবী ছাত্রছাত্রীরাও বিসিএস পরীক্ষার দিকে ঝুঁকছেন। একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে আমলাতন্ত্রের ভেতর-বাইরে যেমন দেখেছি, তেমনি বাংলাদেশের অন্যান্য পেশা, সমাজ ও রাজনীতি পর্যবেক্ষণেরও সুযোগ হয়েছে।
সার্বিক আলোচনার আগে আমলাতন্ত্র ও এর ‘দুর্নীতির’ বিষয় নিয়েই প্রথমে আলোচনা করতে চাই। এ দেশের আমলাতন্ত্র ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের উত্তরাধিকার। ইউরোপ, আমেরিকা, চীন প্রভৃতি দেশে বহু আগে থেকেই সরকারের উচ্চপদের চাকরিতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে লোক নেয়া হতো। সরকার পরিচালনার জন্য একটি প্রশিক্ষিত নিয়মিত জনবলের প্রয়োজন। সুপিরিয়র পদে চাকরির মোহ এ দেশে নতুন কিছু নয়। ব্রিটিশ ভারতে আইসিএস, আইপিএস, আইএফএস, আইএএস প্রভৃতি পদে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবীরাই স্থান পেত। এর ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান ও বাংলাদেশেও মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রশাসন, পুলিশ, ফরেন সার্ভিস প্রভৃতি পদে যোগ দেন। আগে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরি ক্যাডারভুক্ত ছিল না। ১৯৮২ সালে ক্যাডার সার্ভিস প্রথা প্রবর্তনের পর ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক প্রভৃতি পেশাজীবীর চাকরিও ক্যাডারভুক্ত করা হয়েছে। তবে সার্ভিসের পদবিন্যাসের কারণে সব ক্যাডার থেকে যুগ্ম সচিব-সচিব হওয়ার পথটি এক রকম নয়। প্রশাসন ক্যাডারের জন্য এসব পদ সরাসরি ক্যাডার পদের মতো। কিন্তু অন্যান্য ক্যাডার থেকে ‘বিশেষ’ সুযোগের মাধ্যমে এসব পদে আসতে হয়। একজন ইঞ্জিনিয়ার পিডব্লিউডি, সড়ক ও জনপথ বা অনুরূপ ডিপার্টমেন্টে চাকরিতে যখন নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন, তখন দেখা যায় তার একই ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের সহকর্মীটি যুগ্ম সচিব। অন্যদিকে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে ডাক্তার হওয়ার পর একজন চাকুরেকে প্রথমেই মেডিকেল অফিসার হিসেবে উপজেলা বা গ্রামে যেতে হয়। মেধা ও যোগ্যতার বলে যারা সরকারি মেডিকেল কলেজে লেকচারার হিসেবে চান্স পান, তারা পরবর্তীতে সহযোগী অধ্যাপক কিংবা অধ্যাপক হতে পারেন। একজন সিনিয়র অধ্যাপক ডাক্তার শেষ বয়সে হয়তো অতিরিক্ত সচিবের মর্যাদা পান। ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টগুলোয়ও শীর্ষ পদটি থাকে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার। অন্যান্য ক্যাডারে গ্রেড-১ পদ থাকলে সচিব পদের বেতন পাওয়া গেলেও সচিবের মর্যাদা পান না। কলেজশিক্ষকদের পদোন্নতির অবস্থা আরো জটিল। এ পরিস্থিতিতে বর্তমানে সব সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা বিসিএসে প্রথম, দ্বিতীয় ইত্যাদি পছন্দক্রম হিসেবে প্রশাসন, ফরেন সার্ভিস, পুলিশ, অডিট-অ্যাকাউন্টস, কাস্টমস-ট্যাক্স প্রভৃতি ক্যাডার দেয়ার পর শেষের দিকে ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল বা শিক্ষা ক্যাডার পদের ‘পছন্দ’ দিয়ে থাকেন। ক্যাডারবৈষম্য দূরীভূত না হলে ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তারদের স্ব-স্ব পেশার চাকরি গ্রহণে বাধ্য করা যাবে না।
‘দুর্নীতির ব্যাপকতাই বিসিএসের প্রতি মোহ তৈরি করেছে’—এ মন্তব্য একেবারেই অযৌক্তিক ও বিদ্বেষভাবাপন্ন। সরকারি অফিস ছাড়া দেশে আর কোথাও কি দুর্নীতি নেই? একটি বিষয় সবারই জানা যে আজকাল সরকারি চাকরিতে যেমন নিরাপত্তা, বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি, সম্মান ও অন্যান্য লজিস্টিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, বেসরকারি চাকরিতে তেমনটি নেই। বিদেশী ব্যাংক কিংবা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে পদের সংখ্যা সীমাবদ্ধতা ও চাকরির শর্তাবলির কারণে এসব চাকরি আজকাল আর তেমন আকর্ষণীয় নয়। বেসরকারি উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীর অধীন চাকরির নিশ্চয়তা যেমন কম, বেতনও যথেষ্ট নয়। বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা গবেষণা সংস্থাগুলোর বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও এখন আর মেধাবীদের আকর্ষণ করতে পারে না।
সরকারি অফিসে দুর্নীতিবাজ কর্মচারী যেমন রয়েছেন, দুর্নীতি না করে সৎ জীবনযাপন করেন এমন কর্মকর্তা-কর্মচারীও রয়েছের ভূরি ভূরি। এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী দেশের অগ্রগতির জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে বলেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং সরকার ব্যবস্থা টিকে আছে। নিঃসন্দেহে সরকারের সহায়তাকারী হিসেবে আমলাতন্ত্রের অর্থাৎ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে সৎ ও মেধাবী কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকা প্রয়োজন। বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমেই এরূপ কর্মকর্তা নির্বাচন করা হয়।
সততা, নৈতিকতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ন্যায়বিচার, চারিত্রিক পবিত্রতা, সত্যবাদিতা, দেশপ্রেম প্রভৃতি বিষয় পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একটি অন্যটির পরিপূরক। সব গুণের সমাহার আবার একসঙ্গে পাওয়া যায় না। কারো ক্ষেত্রে দেখা যায়, তিনি ঘুষ নেন না, কিন্তু নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে যথাসময়ে পালন করেন না। কাজ করতে বিলম্ব করেন, ফাইল পড়ে থাকে। দায়িত্ব নিতে ভয় পান, কঠিন কাজ এড়িয়ে চলেন। এক্ষেত্রে তার ‘ঘুষ’ না নেয়ার সততা মূল্যহীন। অনেক ‘সৎ’ অফিসারের ধারণা, দেশে তিনিই একমাত্র সৎ ব্যক্তি। অন্য সবাই তার তুলনায় অসৎ। কেউ কেউ জুনিয়র সহকর্মীর কৃত অপরাধ নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাকে শাস্তি দেন। অফিস-আদালতে গীবত, পরনিন্দা, কাউকে অপবাদ দেয়া, নিজের পদোন্নতির জন্য অন্যকে হেয় করা, দুর্নাম রটানো, অন্যের ক্ষতি ও অনিষ্ট করা ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার; যা আমাদের কালচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘুষ গ্রহণের মতো এগুলোও দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে। সরকারি কাজ হবে জনস্বার্থে এবং জনসেবামূলক। কিন্তু জনসাধারণের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে, পদে পদে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি করা হলে কীভাবে জনসেবা হবে? একটা কথা আমরা মনে রাখি না যে এ দেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকায় আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে এখন সরকারি চাকরি করে বেতন খাচ্ছি। ক্ষমতার অপব্যবহার ও জনসাধারণের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণে জনদুর্ভোগ বাড়ে। একশ্রেণীর কর্মচারী ও সেবাগ্রহীতার ঘুষ গ্রহণ ও প্রদানের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে কাজের জন্য ঘুষ আদান-প্রদান হয়, সেখানে উভয় পক্ষের ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য পায়, সরকার বা দেশের স্বার্থ প্রত্যাখ্যাত হয়।
দুর্নীতি দমন কিংবা প্রতিরোধের জন্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে কিংবা রয়েছে বিচারালয়। সেসব জায়গায় যদি সততা ও নৈতিকতার ঘাটতি থাকে তাহলে দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং ন্যায়বিচার কীভাবে হবে? শুধু সরকারি চাকরিতেই নয়, সততা ও নৈতিক সুআচরণ আমাদের জীবনের সর্বত্রই অত্যাবশ্যক। আমার দীর্ঘ চাকরিজীবনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ কিংবা অধঃস্তন অফিসে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পোদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান, এনজিও, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সব জায়গায় ভালো মানুষ ও অসৎ মানুষ দুই-ই রয়েছে। একশ্রেণীর শিক্ষক যে কী পরিমাণ অসৎ ও নীতিহীন, তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কাজ করার সুবাদে দেখেছি। বহু নীতিহীন ঠকবাজ, স্বার্থপর উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীকে দেখার সুযোগ হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনবিআরে কাজ করার সুবাদে। ব্যাংকের টাকা লুটপাট, ঋণগ্রহণের নামে অর্থ আত্মসাৎ, বিদেশে অর্থ পাচার, ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হওয়া এখন দেশে উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। বিচার ব্যবস্থায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা প্রদান, মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে নিরপরাধকে ফাঁসিয়ে দেয়া, অনৈতিকভাবে কাউকে ন্যায়বিচার বঞ্চিত করা, অপরাধীকে ছেড়ে দেয়া—এসব ঘটনাও হরহামেশা শোনা যায়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একশ্রেণীর কর্মচারীর ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতিও নতুন কিছু নয়।
বাংলাদেশের মানুষের যেমন রয়েছে সংগ্রামী ইতিহাস ও ঐতিহ্য, ধর্মপ্রাণ, অতিথিপরায়ণ, পরোপকারী, সহজ-সরল মানুষ হিসেবে দেশে-বিদেশে প্রচুর সুনাম, তেমনি রয়েছে প্রতারণা, পরনিন্দা, স্বার্থপরতা, পরশ্রীকাতরতা, দুর্নীতি ও অসততার দুর্নাম। বিদেশী ঐতিহাসিক, পরিব্রাজক, শাসক, গবেষক অনেকেই বাঙালি চরিত্রের স্বরূপ উদ্ঘাটন করেছেন। বাংলাদেশের সৈয়দ মুজতবা আলী, আবুল মনসুর আহমেদ, হুমায়ুন আজাদ প্রমুখ লেখকও বাঙালি চরিত্রচিত্রণে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। অনেকের মতে, বিভিন্ন সময়ে বিদেশী শাসকদের দ্বারা শাসিত হওয়া এবং পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয় আমলে স্বৈরাচারী শক্তির ক্ষমতা দখলও দেশে দুর্নীতি বিস্তারের অন্যতম কারণ। বর্তমানে দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, গণমাধ্যমকর্মী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক টাউট, ব্যবসায়ী এমনকি সাধারণ মানুষ কার মধ্যে দুর্নীতি নেই? একশ্রেণীর শিক্ষক ক্লাসে না পড়িয়ে প্রাইভেট পড়ান, প্রাইভেট না পড়লে ছাত্রকে ভালো নম্বর দেন না, ওষুধে ভেজাল, খাদ্যে ভেজাল, বেসরকারি হাসপাতালে গলাকাটা চিকিৎসা খরচ আদায়, চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা, সমবায় সমিতির নামে সাধারণ সঞ্চয়ীদের অর্থ আত্মসাৎ, জোরপূর্বক চাঁদা আদায়, মাপে বা ওজনে কম দেয়া, নির্বাচনে কারচুপি, মজুদদারি—কী নেই এ দেশে? করোনা মহামারীর এ দুর্যোগেও শাহেদ, ডা. সাবরিনা-আরিফের মতো প্রতারকরা ভুয়া করোনা রিপোর্ট দিয়ে অর্থ আত্মসাতের পাশাপাশি দেশে-বিদেশে বাংলাদেশকে হেয় করেছেন। করোনা মহামারীর সময়ে দরিদ্র অসহায় মানুষকে প্রদত্ত অর্থ ও চাল কতিপয় জনপ্রতিনিধি আত্মসাৎ করেছেন। কিছুদিন আগে সম্রাট, জিকে শামীম, পাপিয়াদের দৌরাত্ম্যও মানুষ দেখেছে। একশ্রেণীর আদম বেপারি বিদেশ গমনেচ্ছু মানুষদের টাকা মেরে নিঃস্ব করে দিয়ে অনেককে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একশ্রেণীর ডেভেলপার জমি কিংবা ফ্ল্যাট বিক্রির নামে মানুষের টাকা আত্মসাৎ করছে। দেশের একশ্রেণীর মানুষ দুর্বৃত্তায়নে মেতে উঠেছে। এরা খুন, রাহাজানি, চুরি-ডাকাতি ও নারী ধর্ষণের মতো অপরাধে লিপ্ত। হাসপাতালে স্বজন মারা গেলে কেউ কেউ ডাক্তারের অবহেলার অজুহাতে ভাংচুর করে, ডাক্তার খুন করে। ছেলে ধরার মিথ্যা অভিযোগে স্কুলের সামনে গণপিটুনি দিয়ে অভিভাবক মেরে ফেলে। যত দিন যাচ্ছে, দুর্নীতি, প্রতারণা ও অপরাধের ধরন পাল্টাচ্ছে। বাঙালি এ ব্যাপারে বেশ ইনোভেটিভ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে কাজ করার সুবাদে দেখেছি দেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র ২২ লাখ লোক সরাসরি আয়কর দেয়। আয়করদাতা ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানেরও অনেকে প্রদেয় করের চেয়ে কম আয়কর পরিশোধ করে। বহু ব্যবসায়ী সঠিক ভ্যাট প্রদান করেন না। আয়কর ও ভ্যাট সংগ্রহকারীরাও ঘুষ নিয়ে রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তা করেন। আয়কর প্রদানে যোগ্য সবাই আয়কর দিলে এবং কর ফাঁকি রোধ করা গেলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হতো।
শোনা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ্রেণীর শিক্ষক নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস না করিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন। আবার একশ্রেণীর শিক্ষক আছেন, যারা গবেষণা ও প্রজেক্টের কাজ করে নিজ বিভাগের ছাত্রদের সিলেবাস শেষ করার সময় পান না। ক্লাস ফাঁকি দেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দলীয় আনুকূল্যের কথা শোনা যায় প্রায় সময়ই। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের প্রাপ্যের চেয়ে অতিরিক্ত বেতন-ভাতাদি নেয়ারও অডিট আপত্তি রয়েছে। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল যে উচ্চহারে ছাত্রদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় করে, তাতে অভিভাবকদের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়।
এত কিছুর মধ্যেও সৎ, নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী, সত্যবাদী, দেশপ্রেমিক মানুষের সংখ্যাও অনেক। সেজন্য দুর্নীতির ব্যাপকতার জন্য কেবল সরকারি কর্মকর্তা কিংবা কোনো বিশেষ শ্রেণীকে দোষারোপ করা যাবে না। তারা এ দেশের এ সমাজেরই একটা অংশ। দেশের মানুষের মধ্য থেকে নীতি-নৈতিকতা যখন উঠে যায়, তখনই দুর্নীতি জেঁকে বসে। শুধু ঘুষ গ্রহণই দুর্নীতি নয়। ঘুষ দুর্নীতির একটি অংশ মাত্র।
বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। ঘুষ-দুর্নীতি, গীবত-পরনিন্দা, সম্পদ আত্মসাৎ, মিথ্যাচার, মজুদদারি, প্রতারণা, ওজনে কম দেয়া, ভেজাল দেয়া, ন্যায়বিচার না করা—এসবের জন্য কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি রয়েছে আমাদের ধর্মে। দেখা যায়, ধর্মবিশ্বাসী অনেকেও ইসলামের কঠোর আদেশ-নিষেধ পালন করেন না। এসব দেখে মুসলমানের ঘরে জন্ম নেয়া কিছু অবিশ্বাসী লোক আবার মুসলিম ও ইসলাম ধর্মের নিয়মাচারের বিরুদ্ধাচরণেরও সুযোগ পেয়ে যায়। তার পরও জোর দিয়ে বলা যায়, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা মানুষকে সুপথে আনতে পারে। শৈশব থেকে পারিবারিক পরিবেশে সন্তানদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নীতিনৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। ছেলেমেয়েদের পরীক্ষা পাসের প্রতি যেমন গুরুত্ব দিতে হবে, তাদের চরিত্র গঠনের প্রতিও অভিভাবকদের মনোযোগী হতে হবে।
দেশে আইনের শাসনের ঘাটতি হলেও দুর্নীতি বাড়ে বলে অনেকে মনে করেন। সরকার এবং দেশ ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কর্তব্য হওয়া উচিত আমাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোয় যোগ্য ব্যক্তি পদায়ন করে এগুলোয় সততা ও নিরপেক্ষতার লালন করা। সব সরকারি অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন ও সব সাংবিধানিক ও অনুরূপ প্রতিষ্ঠান ও কমিশন থেকে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি উপড়ে ফেলা এখন সময়ের দাবি। সুশাসন ও আইনের শাসনই হলো দুর্নীতি দমনের চাবিকাঠি।
মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া: সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান

এই সংবাদটি 1,228 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •