‘বাংলাদেশ : কামিং টু আমেরিকা’

নিউইয়র্ক থেকে : মিশিগান অঙ্গরাজ্যের বাংলা টাউনে উদ্বোধন হল বাংলাদেশের লাল-সবুজে আঁকা সর্ববৃহৎ ম্যুরাল ‘বাংলাদেশ ঃ কামিং টু আমেরিকা’।
বাংলা টাউন খ্যাত হামট্রামিক ও ডেট্রয়েট শহরের সীমানায় বিশাল দেয়াল জুড়ে লাল সবুজে বাংলাদেশ। এ টাউনের প্রবেশ দ্বারে চোখ আটকে যাবে বিশাল এ চিত্রকর্মে। আর এর মধ্যদিয়েই বহুজাতিক এ সিটিতে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের জয়গান ধ্বনিত হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
এ টাউনের এক তৃতীয়াংশ অধিবাসীই বাংলাদেশি। কয়েক দশকে এ শহরে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশি অভিবাসীদের আবাস। শহরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশিরা। স্থানীয় অর্থনীতি ও রাজনীতিতে বাংলাদেশীদের অংশগ্রহন বাড়লেও বাংলার এ ম্যুরাল বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে বাংলাদেশি অভিবাসীদের খুব ভালোভাবেই উপস্থাপন করবে। অভিবাসন বিরোধী সরকারের সময় আঁকা এ বিশাল ম্যুরাল নিজেদের অধিকারের, মর্যাদার, ও সৌন্দর্যের এক উজ্জ্বল প্রকাশ বলেই মনে করা হচ্ছে ।
বাংলাদেশি জীবন চিত্রের এ ম্যুরাল রোববার দুপুরে অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধম্যে উদ্বোধন করা হয়েছে। ৫৫ ফুট বিস্তর ও ৪৬ ফুট উঁচু এ ম্যুরা মেক্সিকান অঙ্কনশিল্পী ভিক্টর কুইনোনেজ তৈরী করেছেন। নিউইয়র্কের ‘মার্কা২৭’ নামে পরিচিত এ শিল্পী নিয়ো-ইন্ডিজেনাস (নব্য-আদিবাসী) স্টাইল চিত্রাংকনের জন্য বিপুল জনপ্রিয়।
‘ওয়ান ডেট্রয়েট’ নামের সংগঠনের উদ্যোগে ৫৬ লক্ষ ইউএস ডলার (বাংলাদেশি প্রায় অর্ধকোটি টাকা) খরচ হয়েছে এ ম্যুরালে। ‘ওয়ান ডেট্রয়েট’ অধিকর্তা সমাজকর্মী বিল মায়ার অভিবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির সাথে এ ম্যুরাল নিয়ে অনেক দিন যাবত কাজ করছেন। বাংলাদেশি অভিবাসী নেতৃবৃন্দ খুব ভালোভাবেই নিয়েছেন। ম্যুরালের খরচের অর্ধেক জোগান দিয়েছেন বাংলাদেশি কমিউনিটি। বাকি অর্থ এসেছে সরকারি কোষাগার থেকে। বাংলাদেশি আমেরিকান দ্বিতীয় প্রজন্মের কিছু তরুণ তরুণী এ কাজের নেতৃত্বে ছিলেন। সুবহা, ফারহা, তামান্না, ফারহান, মানিশা প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের একটা বড় অংশের বসবাস মিশিগানের ডেট্রয়েট- হ্যামট্রামিক শহরে। ইউএস সরকারের জরিপ অনুসারে নিউইয়র্ক, লসএঞ্জেলেস ও রাজধানী ওয়াশিংটন মেট্র এলাকার পর মিশিগানের ডেট্রয়েট বাংলাদেশি অভিবাসীদের অবস্থান। পিউ গবেষণা কেন্দ্রের হিসাব অনুসারে পনের হাজারের বেশি অভিবাসি ও কয়েক প্রজন্মে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়াদের নিয়ে এ সংখ্যা অনেক বেশি।
সঠিক দেয়াল নির্বাচন, কোন ছবির উপর ম্যুরাল হবে, ম্যুরালের শিল্পী নির্বাচন, অর্থ সংগ্রহ সব কিছুই হয়েছে শহরের অধিবাসীদের নিয়ে।
লাল সবুজের এ বৃহৎ ম্যুরালে বাম পাশের নিচের অংশে সবুজ চা বাগান, হ্যামট্রামিক শহরের বাংলাদেশি অভিবাসীদের ৮০ জনগোষ্ঠী সিলেট থেকে এসেছেন। ডান পাশের চা বাগানে এক বাংলাদেশি আমেরিকান রমণী, তার পরনে লাল চাদর। লাল সবুজে বাংলার পতাকার প্রতিচ্ছবি। লাল চাদরে পাশে দান পয়াশের নিচের অংশে আঁকা হয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। রমণীর খোলা চুলে দুটি শ্বেত শাপলা। এছাড়া নকশী কাঁথায় সাজানো চাদর। ভাষা শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে আঁকা হয়েছে শহীদ মিনার। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার জন্যে বাঙালির আতœত্যাগের ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে আঁকা হয়েছে বিশাল আকৃতির ‘অ’ ‘আ’ ‘ক’ ‘খ’ বর্ণমালা।
অন্যান্য জাতি গোষ্ঠী নিয়ে দেয়াল চিত্র হলেও বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিয়ে এই প্রথম দেশের বাইরে মার্কিন প্রশাসনের সহায়তায় এত বড় ম্যুরাল।
‘মার্কা২৭’ ও তার সহকারি আর্টিস্ট কার্টিস প্রচন্ড ঠান্ডায় কাজ করেছেন রোববারের এ উদ্বোধনি অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে। এক সপ্তাহের অবিরত পরিশ্রমে এ চিত্রকর্ম। কথা হল মার্কা২৭ এর সাথে। জানালেন শনিবার ভোর ৪ ঘটিকায় তিনি শেষ করেছেন এ চিত্রকর্ম। আরো জানালেন শেষ ৫ দিনের প্রতিদিন ২০ ঘন্টারও অধিক সময় ব্যয় করেছেন এ চিত্র শেষ করতে। চা বাগানের সবুজের কিছু অংশ বাদে বাকি পুরো অংশে তিনি ব্যবহার করেছেন স্প্রে পেইন্ট।
ডেট্রয়েট-হামট্রামিক শহরের সীমানায় ৩১০৫ কার্পেন্টার এভিনিউতে অবস্থিত ব্রিজ একাডেমি মাধ্যমিক স্কুলের বিশাল দেয়াল জুড়ে এ চিত্রকর্মের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, বিভিন রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, মিশিগান অঙ্গরাজ্যের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বাংলা স্কুলের শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীরা গান পরিবেশনা করেন। বাংলাদেশি আমেরিকান নেতৃবৃন্দের মাঝে অনেকে বক্তৃব্য রাখেন। উদ্বোধনে আগত দর্শনার্থীদের মাঝে ঝাল মুড়ি, ফুচকা, চটপটি কটন ক্যান্ডি, চা, কফি বিনামূল্যে পরিবেশন করা হয়।
অনুষ্ঠানে ড. দেবাশিষ মৃধা, চিনু মৃধা, ড. জাকিরুল হক (টুকু), জামি খান, ফেরদৌস গাজী, ড. নাজমুল হাসান শাহীন, মিশিগান রাজ্যের লেফটেন্যান্ট গভর্নর প্রার্থী গারলিন গিলক্রিস্ট, মোহাম্মদ মুসা, আমান মিয়া, মোহাম্মদ আজিম সহ নেতৃবৃন্দ ছিলেন।