বিশ্বরাজনীতির খেলা এবং করোনা ভাইরাস

প্রকাশিত:বুধবার, ০৬ মে ২০২০ ০১:০৫

বিশ্বরাজনীতির খেলা এবং করোনা ভাইরাস

মো. বিপ্লব আলী

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার কর্তৃত্ব বিশ্বরাজনীতি থেকে অবসান হয়। আবির্ভাব হয়েছিল আমেরিকান প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের ১৪ দফা নীতি, এটি দ্বারা পৃথিবীতে যুদ্ধ বিগ্রহ, গোত্র দ্বন্দ্ব, জাতিগত বৈষম্য, কর্তৃত্ববাদ রাজনীতি এবং উগ্র জাতীয়তাবাদের অবসান ঘটিয়ে নতুন একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গঠনের প্রত্যয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার এই নীতি ব্যর্থ হয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বরাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। পৃথিবীব্যাপী ঔপনিবেশ শাসন প্রতিষ্ঠাকারী দেশ ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তাদের ঔপনিবেশ শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটাতে থাকে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার আবির্ভাব হয়। আর এই প্রেক্ষাপটে আলোচনায় আসে উদারতাবাদ রাজনৈতিক দর্শন। উদারতাবাদের সাধারণ অর্থ হলো রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিস্বাধীনতা নীতি প্রতিষ্ঠা করা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হব হাউসের মতে, ‘উদারতানীতি হলো এমন একটি মতবাদ, যেখানে প্রতিটি মানুষের স্বাধীনতা জীবনের কণ্ঠস্বর তাদের চিন্তা বিকাশে বিকশিত হয়।’ উদারনীতিবাদের প্রধান প্রতিপাদ্য হলো স্বাধীনতা। রাশিয়ার নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করে পৃথিবীব্যাপী সমাজতান্ত্রিক ব্লক তৈরি করে।

অন্য দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পুঁজিবাদী ব্লক তৈরি করলে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব তথা স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক জোট, সামরিক জোট, পারমাণবিক বোমা, এমনকি হাইড্রোজেন বোমা এবং মহাকাশ যুদ্ধের মতো প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তী উদারতাবাদ তত্ত্ব ব্যর্থ হলে আলোচনায় এসেছিল বাস্তববাদ মতাদর্শ। বাস্তববাদ মূলত সামাজিক জীবনে স্বতন্ত্রবাদী দিকটিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিরোধের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল বাস্তবায়নেও বিশ্বাস করে। বাস্তববাদী অর্থনীতি ও সংস্কৃতি যথাযথ নির্ধারণে বিশ্বাসী এবং বাস্তবতা চরিত্রগতভাবে শ্রেণিবদ্ধ। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীতে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে আলোচনায় আসে ‘ক্লাস অব সিভিলাইজেশন’ তত্ত্ব। যেখানে ইসলামিক জঙ্গি ও সন্ত্রাসের কথা বলা হয়েছে। নাইন/ইলেভেন-পরবর্তী বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে আমেরিকা। এই সূত্র ধরে ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইয়েমেন ও সিরিয়াতে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, যা আজ পর্যন্ত অব্যাহত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো মহামারি হলো করোনা ভাইরাস। করোনা ভাইরাসের বর্তমান রূপ কোভিড-১৯। এটি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে পৃথিবীকে স্থবির করেছে। গত বছর ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে করোনা ভাইরাসের সূচনা হলেও পৃথিবীব্যাপী কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব ছড়িয়েছে। কানাডার প্রেসিডেন্ট জাস্টিন ট্রুডো, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রীও করোনা ভাইরাস থেকে রেহাই পাননি। আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়সহ আজ পৃথিবীব্যাপী মৃত্যুর মিছিল বয়ে চলেছে কিন্তু কোভিড-১৯ প্রতিরোধে বিশ্ব সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযোগ, চীনের ল্যাব থেকে এই ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছে তাই বেইজিংকে এর ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে চীনঘেঁষা বলেছেন কিন্তু বেইজিং সরাসরি এই অভিযোগ অস্বীকার করে। বর্তমানে বিশ্বরাজনীতি খেলার মাঠে চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত পর্বে অবস্থান নিয়েছে। করোনা ভাইরাস পরবর্তী সময়ে হয়তো বিশ্বে নতুন চ্যাম্পিয়ন তথা মোড়লের দেখা পাওয়া যাবে।

n লেখক :ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

এই সংবাদটি 1,225 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •