Sun. Oct 20th, 2019

BANGLANEWSUS.COM

-ONLINE PORTAL

ব্যাংকারের অসহায়ত্ব

1 min read
বাংলাদেশের ব্যাংকাররা যত নিয়ম-কানুনের মধ্যে ব্যাংকিং সেবা প্রদানে ব্রত থাকুক না কেন, মাঝে মধ্যে এমন পরিস্থিতিতে তাদের পড়তে হয়, যে পরিস্থিতিতে নিয়ম-কানুন ভুলে ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষার্থে তারা অতি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়েন। আর সে সময় ব্যাংকাররা চরম অসহায়ত্ব বোধ করেন। ওই ঝুঁকি না নিলে ব্যাংকের বিশাল ঋণ খাদে পড়ে যাওয়ার শংকা থাকে, আর ঝুঁকিটা নিলে ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার বিপদে পড়ার আশংকা থাকে। তা সত্ত্বেও ব্যাংকাররা নিজেদের ব্যক্তিগত দিকটাকে অবজ্ঞা করে ব্যাংকের স্বার্থটাকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন—নিজেদের শত অসহায়ত্বের মধ্যেও।
তৈরি পোশাক কারখানা যখন তলাবিহীন ঝুড়ি: দেশে রফতানি আয় বাড়ানোর প্রত্যয়ে ব্যাংকাররা রফতানিকারকদের উৎসাহিত করে থাকেন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে ব্যাংকাররা বিশেষ নজর দেয়ার কারণে আজ বিশ্বে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রফতানিতে চতুর্থ স্থান দখল করেছে। দেশে মোট রফতানির ৮৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ (২০১৭-১৮) তৈরি পোশাক খাতের অবদান। ব্যাংকাররা যদি এ খাতটিকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে এড়িয়ে চলতেন, তাহলে এ খাতের অগ্রগতি এতটুকু হতো না। কিন্তু এ খাতকে টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যাংকারদের এমন ঝুঁকি নিতে হয়, তাতে ব্যাংকারদের ক্যারিয়ারের সঙ্গে জীবনও বিপন্ন হওয়ার শংকা দেখা দেয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত (আরএমজি) বিদেশীদের কাছে এখনো আকর্ষণীয়। কারণ এ খাতে মজুরির হার প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনো অনেক কম। তাই পণ্যমূল্যও এখানে কম। স্বল্প মুনাফা ও বিড়ম্বনার কারণে শ্রমনিবিড় শিল্প থেকে উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলো সরে আসছে। কিন্তু আমরা পারছি না। শ্রমনিবিড় শিল্পের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর হয় সত্যি, কিন্তু শ্রমনিবিড় শিল্প পরিচালনায় শ্রমিকদের সন্তুষ্ট রেখে উৎপাদন চেইন ঠিক রাখা একটা কঠিন ব্যাপার। মাসিক বেতন ৭ তারিখের পরিবর্তে ৮ তারিখ হলেই হাজার হাজার শ্রমিক যখন রাস্তায় নেমে পড়েন, তখন জনদুর্ভোগে পড়ে সাধারণ জনগণের মনোভাবও শ্রমিকদের পক্ষে চলে যায়। সবাই মনে করেন, মালিকপক্ষ ইচ্ছা করেই বেতন দিচ্ছে না, শোষণ করছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ এবং মালিকও ব্যাংকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে; প্রাপ্যতা থাক বা না থাক, বেতন যে করেই হোক দিয়ে দিতে হবে। কিন্তু একটি কারখানায় যদি কোনো অর্ডার না থাকে, তখন ব্যাংক থেকে ঋণ আকারে বেতনের টাকা অনুমোদন করা সম্ভব হয় না। মালিকের অক্ষমতা কিংবা বাজারের মন্দা পরিস্থিতি কিংবা কমপ্লায়েন্সের অভাবের কারণে বেতনের টাকা অনুমোদন করা যদি সম্ভব না হয়, এ সমস্যার গভীরে যাওয়ার কেউ তখন চেষ্টা করে না একমাত্র ব্যাংকার ছাড়া।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যাংকার বিশেষ ঋণ সৃষ্টি করে বেতনের টাকার জোগান দেন। শতকোটি টাকা ঋণের চাকাকে চলমান রাখার স্বার্থে ব্যাংকার জামানতহীন এ ধরনের বিশেষ ঋণ দিয়ে থাকেন। কিন্তু প্রায়ই এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে জামানতহীন ঋণের বোঝা ব্যাংকারের স্কন্ধে বইবার আর সহ্য ক্ষমতা থাকে না। এর পরও ব্যাংকার শিল্প ইউনিটটিকে চলমান রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। কিছু সচতুর আরএমজি ব্যবসায়ী ব্যাংকারের এ অসহায়ত্বকে ভালোভাবে কাজে লাগান। কারখানা বন্ধ করে দেবেন বলে ব্যাংকারদের হুমকি দেন। শিল্প ইউনিটটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য সব দায় যেন ব্যাংকারের, মালিকের যেন কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এ ধরনের অসাধু আরএমজি ব্যবসায়ীর এহেন মনমানসিকতার কারণে অনেক ব্যাংক আরএমজি ব্যবসা থেকে সরে আসছে, যা দেশের অগ্রগতির জন্য মোটেও সুখের সংবাদ নয়। আরএমজি ইউনিটটি যখন তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হয়, এ পরিস্থিতিতে বিশেষ বিবেচনায় দেয়া ঋণগুলোর আদায় কঠিন হয়ে পড়ে। পোশাক খাতে এ অস্বাভাবিক ঝুঁকি এবং ব্যাংকারদের চাপ থেকে মুক্তির উপায় বের করতে না পারলে খাতটি ভবিষ্যতে মৃত খাতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
হাতে আছে ঋণের চাঁই, নবায়নে আগ্রহ নাই: দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তিন ধরনের মেয়াদে গ্রাহকদের ঋণ দিয়ে থাকে—স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি। সর্বোচ্চ এক বছর মেয়াদে যে ঋণ দেয়া হয়, সেটি স্বল্পমেয়াদি; সর্বোচ্চ পাঁচ বছর মেয়াদ পর্যন্ত যে ঋণ, সেটি মধ্যমেয়াদি এবং পাঁচ বছরের অধিক মেয়াদের ঋণ দীর্ঘমেয়াদি। স্বল্পমেয়াদি ঋণকে চলমান ও এককালীন এ দুই ভাগে ভাগ করা যায়। চলমান ঋণগুলোর একটি লিমিট থাকে, যে লিমিটের মধ্যে গ্রাহক তার প্রয়োজন মোতাবেক ঋণ উত্তোলন করেন এবং জমা দিয়ে ঋণ সমন্বয় করেন। মেয়াদ শেষে অর্থাৎ এক বছর পর ওই ঋণ পুরোপুরি সমম্বয় করে নবায়নের জন্য আবেদন করতে হয়। ব্যাংক গ্রাহকের লেনদেনে যদি সন্তুষ্ট হয়, তখন পরবর্তী এক বছরের জন্য পুনরায় ঋণটি নবায়ন করা হয়। এটা নিয়মের কথা। কিন্তু বাস্তবতা একটু অন্য রকম। নিয়মের কথা বললে গ্রাহকদের কাছে ওই ব্যাংকার ‘সবচেয়ে সেকেলে’ তাই আধুনিক সেবা দেয়ার মানসে ব্যাংকাররাও নিয়মের কথা না শুনিয়ে গ্রাহকদেরকে অনিয়মে থাকতে যেন উদ্বুদ্ধ করেন। চলমান ঋণগুলো মেয়াদপূর্তিতে পুরোপুরি সমন্বয় করতে গ্রাহকরা আইনত বাধ্য হলেও প্রায় সব গ্রাহকই মেয়াদপূর্তিতে তাদের দায়দেনা সমন্বয় না করে নবায়ন করতে চান। আর ব্যাংকাররা দুয়েকবার ফোন করে যদি সাড়া না পান, শেষ পর্যন্ত অন্তত বছরের সুদটা আদায় করে ঋণের লিমিট নবায়ন করে দেন। পুরো দেনা সমন্বয়ের জন্য বসে থাকলে ঋণটা খেলাপির তালিকায় চলে যেতে পারে—এ ভয় যতটুকু না গ্রাহকের, এর চেয়ে বেশি ভয় কাজ করে ব্যাংকারের মধ্যে। মাছ ধরার চাঁইয়ে যখন মাছ ঢোকে, সেখান থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। আমাদের গ্রাহকদের হাতে রয়েছে ওই ঋণের চাঁই, যেখানে একবার ঢুকলেই হলো, আর বের হওয়া যেন সম্ভব নয়।
ব্যাংকাররা শত চাপ দেয়ার পরও ওই চাঁই থেকে ঋণের অর্থ বের হয় না। আর তাই ব্যাংকাররাও এ অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করে ফেলেছেন বলে প্রতীয়মান হয়। যদি নবায়নের সময় সম্পূর্ণ ঋণ সমন্বয়ের নিয়মটাকে কঠোরভাবে পরিপালন করা যেত, তাহলে গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধে সক্ষমতাটা যাচাই করা যেত এবং গ্রাহকের ব্যবসার পরিস্থিতি ভালো প্রতীয়মান না হলে ব্যাংকার ঋণটাকে নবায়ন না করে ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান রক্ষা করতে পারতেন। কাবুলিওয়ালারা যখন এ দেশে সুদের কারবার করত, তখন মেয়াদপূর্তিতে ঋণদাতা কাবুলিওয়ালা ঋণগ্রহীতার কাছে এসে বলত, ‘সুদ চাহিয়ে, আসলি নেহি মাঙ্গতা’ অর্থাৎ সুদটা দিলেই আমি খুশি, আসল ফেরত দেয়ার প্রয়োজন নেই। বিশ্বায়নের যুগে এসে ব্যাংকাররা যদি ওই কাবুলিওয়ালাদের মতো সুদ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন, তবে আমরা এদিক থেকে এগোলাম কই!
কালো আর ধলো বাহিরে কেবল ভেতরে সবারই সমান রূপ: বিশ্বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের যত প্রসার ঘটছে, বাণিজ্য বিরোধও তত বাড়ছে। একসময় সাদাদের সঙ্গে বাণিজ্য করার সময় কালোরা (বাঙালিরাও) অনেক কিছু ছাড় দিত, যেমন ক্রেডিট রিপোর্ট না নেয়া, অ্যাড কনফারমেশন না নেয়া, তাদের শর্তে কাজ করা ইত্যাদি। কিন্তু হালে সাদাদের ওপর কালোদের অগাধ বিশ্বাসে যেন চিড় ধরেছে। কথা দিয়ে কথা রাখছে না তারা। শর্ত দিয়ে শর্ত ভঙ্গ করছে, মালামাল প্রি-ইন্সপেকশন করে কোয়ালিটি সার্টিফিকেট দিলেও সাদাদের বন্দর থেকে পণ্য ফেরত দিয়ে অস্বাভাবিক ডিসকাউন্ট চেয়ে বসছে। অসহায় বাংলাদেশী রফতানিকারকরা পণ্য ফেরত আনতে যে খরচ যাবে, তাতে লাভ তো দূরে থাক, আসল খরচটাও উঠে আসার সম্ভাবনা থাকে না বলে সাদাদের অন্যায় শর্ত মাথা পেতে নিচ্ছেন। আর ব্যাংকাররা পড়ে যান সমস্যার অতল গহ্বরে। দেশও হারায় কোটি কোটি ডলারের রফতানি আয়। এর পেছনে ব্যাংকারদের প্রধান অসহায়ত্বের কারণ হলো এলসির পরিবর্তে চুক্তির (কন্ট্রাক্ট) অধীনে রফতানি করা। এলসিবহির্ভূত রফতানিতে রফতানিকারকের ব্যাংক কিংবা রফতানিকারক ইউসিপি ৬০০-এর অধীনে কোনো সুরক্ষা পায় না। সাদারা এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের রফতানিকারকদের পথে বসাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি চুক্তির অধীনে রফতানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, এ দেশের রফতানি বাণিজ্যে বিরোধ সর্বাংশে কমে যাবে, আর দেশের স্বার্থটাকেও রক্ষা করা হবে। কোনো উন্নত দেশ থেকে এদেশে এলসিবহির্ভূত আমদানি হয় না। তাহলে আমরা কেন এলসিবহির্ভূত রফতানিতে উৎসাহিত করে পুরো রফতানি বাণিজ্যকে বিপদে ঠেলে দিচ্ছি? কোনো রফতানিকারক যদি চুক্তির অধীনে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি করতে আসে, কোনো ব্যাংকারের তা প্রত্যাখ্যান করার জো নেই, কারণ সরকারই রফতানিকারককে এ সুবিধা দিয়েছে। ব্যাংকাররা এ জায়গায় বড় বেশি অসহায়। সাদাদের প্রতি অতি আস্থার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি সাদার ভেতরে কদাকার রূপও যে থাকে, তা যেন চিরন্তন সত্যতে পরিণত হয়েছে।
লঘু পাপে গুরু দণ্ড: বর্তমানে ঋণ শ্রেণীকরণের নীতিমালা অনুসারে কোনো মেয়াদি ঋণের পরপর তিনটি মাসিক কিস্তি কিংবা ত্রৈমাসিক একটি কিস্তি খেলাপ হলে সম্পূর্ণ ঋণটাই শ্রেণীকৃত হয়ে যায়। আরেকটু খোলাসা করে বলা যায়, যদি ১০০ কোটি টাকার একটি ঋণের মাসিক কিস্তির পরিমাণ যদি ১ কোটি হয়, তাহলে পরপর তিনটি মাসিক কিস্তি অর্থাৎ ৩ কোটি টাকার কিস্তি খেলাপ হলে ওই ১০০ কোটি টাকাই খেলাপির তালিকায় চলে আসে। আর এত বড় ঋণ খেলাপির তালিকায় ওঠা মানে ব্যাংকের বিশাল অংকের সঞ্চিতি সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হওয়া। যদি ঋণটি নিম্নমানের শ্রেণীকৃত হয়, তখন ব্যাংকে ২০ কোটি টাকা সঞ্চিতি রাখতে হবে। আর যদি গ্রাহক একটি কিস্তি অর্থাৎ ১ কোটি টাকা পরিশোধ করেন, তাহলে ব্যাংক ওই ২০ কোটি টাকার বাধ্যতামূলক সঞ্চিতি থেকে বেঁচে যায়। অর্থাৎ গ্রাহকের ১ কোটি টাকা আদায় না হলে ব্যাংক খেসারত দেয় ২০ কোটি টাকা। এ যেন লঘু পাপে গুরু দণ্ড। ব্যাপারটা ব্যাংকারদের অসহায়ত্বের চরম গহ্বরে ফেলে দেয়। বিষয়টি এমন যে, হয়েছে মাথাব্যথা, এর চিকিৎসা হলো আইসিইউতে প্রেরণ করা। মাথাব্যথা নিয়ে চলাফেরা করা যায়, কিন্তু আইসিইউতে প্রেরণ করা হলে রোগী মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকে। মরার আগে মৃত্যুসনদ দেয়ার নামান্তর।
এ ধরনের অসহায়ত্বের বিষয়গুলো যতদিন বিরাজ করবে, ততদিন বিশুদ্ধ ব্যাংকিং নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে বিশুদ্ধ ব্যাংকিংয়ের যেহেতু কোনো বিকল্প নেই, তাই ব্যাংকারদের অসহায়ত্বের দিকগুলো তিরোহিত করে বিশুদ্ধ ব্যাংকিং নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।
লেখক: ড. এসএম আবু জাকের,ব্যাংকার

Copyright © Banglanewsus.com All rights reserved. | Developed By by Positive it USA.

Developed By Positive itUSA