মধু আহরণে ব্যস্ত বেড়ার মৌ-চাষিরা

প্রকাশিত:শুক্রবার, ০৩ জানু ২০২০ ০৬:০১

মধু আহরণে ব্যস্ত বেড়ার মৌ-চাষিরা

বেড়া, (পাবনা) :
ফুলের কানে গুন গুনিয়ে ভ্রমর যায় গান শুনিয়ে,বা ঐ ফুল ফোটে বনে যাই মধু আহরণে,কবির ভাবনায় মৌমাছি আর মধু নিয়ে রয়েছে হাজার কবিতা গল্প। বিশুদ্ধ মধুর প্রাপ্্যতা নিশ্চিত করছে পাবনার বেড়া সহ পাশের উপজেলায় গড়ে উঠা ইব্রাহিম,খলিল,তারেক,জুলহাস,লিমনদের মত মৌ চাষিরা। উপজেলা সহ পার্শ্ববর্তী উপজেলা গুলোতে প্রচুর পরিমানে সরিষার চাষ হয়ে থাকে। মৌ চাষিরা তাদের মৌবাক্স নিয়ে বছরের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছে। উৎসাহিত হয়ে উঠছে এলাকার বেকার যুবকেরা। মৌ চাষিরা কাঠের বাক্স দিয়ে কৃত্রিম বাসা তৈরী করে মৌমাছি পালন করছে। এ ধরনের বিকল্প মৌবাসায় তৈরী মৌচাকে মৌমাছির কোনরুপ ক্ষতি না করে সহজেই মধু আহরণ করা যায়।
বেড়া বিবি সরকারী পাইলট স্কুলের বিঞ্জান বিভাগের অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক আবু.ওহাব বলেন, বাংলা দেশে ৪টি প্রজাতির মৌমাছি রয়েছে এর মধ্যে এ,সি,ইন্ডিকা প্রজাতির মৌমাছি মৌচাষিরা কাঠের বাক্সে পালন করে থাকে। মৌমাছি একান্ত ভাবেই সামাজিক। একটি মৌচাকে তিন ধরনের মৌমাছি থাকে,একটি রানী,কয়েক শত পুরুষও হাজারহাজার শ্রমিক।
দেশে ব্যবসা ভিত্তিক মৌমাছি পালন এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। প্রচুর পরিমানের মধুর উৎসের উপযুক্ত নির্যাস পাওয়া যায় সরিষা ফুল থেকে, কারন বেশী সংখ্যক ফুল নিয়ে এত বিশাল এলাকা ব্যাপী অন্য কোন উদিÍদের চাষ হয়না। দেশের অনেক জেলাতেই সরিষার চাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলায় সরিষার চাষ হয়ে থাকে সর্বাধিক। মধু তৈরীর জন্য মৌমাছিদের প্রচুর পরিমান মিষ্টি নির্যাস জোগায় সরিষার ফুল। আম,কুল সজিনা ও তিলসহ বিভিন্ন ফসল,ফল ফুলের নির্যাস উৎকৃষ্ট মধুর উৎস। প্রত্যেটি ফুলের রং,ঘ্রাণ ও স্বাদ যেমন সতন্ত্র তেমনি ফুলের উপর নির্ভর করে মধুর স্বাদ,রং ও গন্ধ স্বতন্ত্র হয়ে থাকে ।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ,বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন ও বাংলাদেশ মৌমাছি পালন ইনস্টিটিউটের তত্তাবধনে মাঝে মধ্যে পেশাদার ও সৌখিন মৌ মাছি পালকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ মৌমাছি পালন ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষক মো. রহুল কবীর বলেন, মৌমাছি ফুল থেকে নির্যাস নিয়ে তাদের হানি স্টমাক বা মধু থলিতে সংগ্রহ করে এবং মধু থলিতে উৎসেচকের বিক্রিয়ায় তা ডেক্সটোজ ও লিভিউলোজে পরিনত হয়। পরিবর্তীত এই অশংটুকুই মধু।
বেড়ার খানপুর গ্রামের মৌ চাষি জুলহাসের সাথে কথা বলে জানা যায়, এবারই সে মৌবাক্স নিয়ে প্রথম মধু সংগ্রহে মাঠে নেমেছে। মৌসুমের শুরুতেই বিরুপ আবহায় মধু সংগ্রহ ক্ষতি গ্রস্থ হবে। কুয়াশা ও অতি ঠান্ডায় প্রচুর পরিমানে মৌমাছি মারা পড়ে। শাহজাদপুর উপজেলার জুগনিদহ গ্রামের মৌচাষি যুবক লিমন ৫৮টি মৌবাক্স নিয়ে এলাকার বিভিন্ন মাঠে সরিষার ক্ষেতের পাশে রেখে মধু সংগ্রহ করে থাকে। আগাম ও নাবী সরিষা চাষের ফলে প্রায় তিন মাস শুধু সরিষার ফুল থেকে সর্বাধিক পরিমান মধু সংগ্রহ হয়ে থাকে। সরিষার পর কুল,আম,লিচুর ফুল থেকেও মৌমাছি যথেষ্ট পরিমান নির্যাস নিয়ে মধু তৈরী করে থাকে। জ্যৈষ্ঠ মাসে তিল ও বাদাম ফুল থেকে শেষ মধু সংগ্রহ করা হয় বলে বেড়ার আমিন পুরের মৌচাষি হবিবুর জানায়, ৫০ টি মৌবাক্স নিয়ে তার একটি মৌমাছির খামার রয়েছে। ৫৮টি মৌবাক্স থেকে কতটুকু মধু পাওয়া যায় জানতে চাইলে,মৌচাষি লিমন জানায়,সে তিন জন সহকারী নিয়ে সপ্তাহে একদিন মৌবাক্স থেকে প্রায় ১২০ কেজি মধু সংগ্রহ করে, এই ৫৮ টি মৌবাক্স থেকে মধু সংগ্রহ করতে প্রায় ৫ ঘন্টা সময় লাগে। সরিষা ফুল থেকে সবচেয়ে বেশী মধু পাওয়া যায়। বাংলাদেশের এপি,স্কয়ার,ডাবর ও বিদেশে রপ্তানী কারক ডেকো সহ বিভিন্ন কোম্পানী এসব মৌচাষিদের থেকে মধু নিয়ে থাকে।
বছরের প্রায় ৬ মাস মধু সংগ্রহ করা গেলেও আষাঢ় থেকে অগ্রাহয়ন এই ৬ মাস মৌমাছিকে বিকল্প খাবারের যোগান দিতে হয়। ২ ভাগ চিনি ও ১ ভাগ পানি মিশিয়ে সিরাপ তৈরী করে মৌমাছির বিকল্প খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। ফাউল ব্রুড রোগ মৌমাছির একটি মারাত্মক ব্যাধি,এ ছাড়াও আরও কিছু সংক্রামক রোগে ও উপদ্রপের কারণে মৌচাক নষ্ট হয়ে যায়। প্রাকৃতিক বির্পযয় না হলে বছর শেষে খরচ বাদ দিয়ে ৫০ থেকে ৬০ টি মৌবাক্স থেকে প্রায় দু’ আড়্ইা লাখ টাকা আয় হয় বলে মৌ চাষিরা জানায়। সরকারী ভাবে মৌ চাষিদের আর্থিক ঋণ ও মধু বিপণনের ব্যবস্থা থাকলে দেশের বেকার যুবকেরা এ পেশায় আসতে ব্যাপক ভাবে আগ্রহী হয়ে উঠতো। উৎকৃষ্ট মানের বিশুদ্ধ মধু রপ্তানীর মাধ্যমে বিপুল পরিমান বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করাও সম্ভব হতো বলে মৌ চাষি ও সৌখিন মৌ চাষিরা মনে করেন।

এই সংবাদটি 1,231 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •